অপরিকল্পিত ও অতিরিক্ত মৎস্য আহরণ, নিষিদ্ধ জালের অবাধ ব্যবহার, সমুদ্র দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের যৌথ ধাক্কায় বঙ্গোপসাগরে মৎস্য উৎপাদন আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পেয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) এবং মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে সমুদ্রের এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে বঙ্গোপসাগর থেকে মাছ আহরণ হয়েছিল ৭ লাখ ,৬ হাজার টন। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ৬ লাখ ,২৮ হাজার টনে। অর্থাৎ, গত তিন বছরের ব্যবধানে সমুদ্র থেকে সার্বিক মাছ আহরণ প্রায় ২১ শতাংশ কমেছে। FAO-এর তথ্যমতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বঙ্গোপসাগরে মাছের মজুত আশঙ্কাজনকভাবে ৭৮.৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েছে জাতীয় মাছ ইলিশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সমুদ্র থেকে যেখানে ৮ হাজার ,১৩৮ টন ইলিশ আহরণ করা হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে তা মারাত্মকভাবে কমে মাত্র ১ হাজার ,৭৯০ টনে নেমে এসেছে। জেলেরা আশঙ্কা করছেন, বর্তমান ২০২৬ সালেও মৎস্য উৎপাদন আরও নিম্নমুখী হতে পারে।
উপকূলীয় প্রান্তিক জেলেদের অভিযোগ, সমুদ্রে মৎস্য সম্পদ ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের প্রধান কারণ কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ীর অবৈধ ট্রলিং বোটের দাপট। গত ২০২২ ও ২৩ সালে উপকূলীয় অঞ্চলের একশ্রেণির প্রভাবশালী ব্যবসায়ী কাঠের বডিকে রূপান্তরিত করে অবৈধভাবে লোহার যন্ত্রাংশ স্থাপন করে এসব ট্রলিং বোট তৈরি করেছে। প্রশাসন কোনো কার্যকর ভূমিকা না রাখায় এবং এই পদ্ধতিতে রাতারাতি কোটি টাকা আয় করা সম্ভব হওয়ায় বিভিন্ন পেশার ব্যবসায়ীরা নিত্যনতুন ট্রলিং বোট নির্মাণে মেতে উঠেছেন। বর্তমানে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপকূলে শুধুমাত্র শিববাড়িয়া চ্যানেলের আলীপুর-মহিপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রেই এই ধরনের ৬০টিরও বেশি কাঠের তৈরি অবৈধ ট্রলিং বোট রয়েছে। এসব বোট ফিশ ফাইন্ডার, জিপিএস ও রাডারের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সহজেই মাছের ঝাঁক শনাক্ত করে গণহারে মাছ ধরে নিয়ে আসছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ট্রলিং বোটে ব্যবহৃত ‘বটম ট্রলিং’ পদ্ধতি সমুদ্রের তলদেশের পরিবেশের জন্য এক মরণফাঁদ। এই পদ্ধতিতে ভারী জাল সমুদ্রের তলদেশ ঘষে ঘষে টেনে নেওয়া হয়, যা প্রবাল, সামুদ্রিক ঘাস, শামুক-ঝিনুকের আবাসস্থল এবং বিভিন্ন অণুজীবের বাস্তুতন্ত্রকে পুরোপুরি পিষে ধ্বংস করে দেয়। এছাড়া, আধা ইঞ্চি থেকে এক ইঞ্চি ফাঁসের ক্ষতিকর ‘বারি বেহুন্দি জাল’ ব্যবহারের ফলে জালে ছোট-বড় সব মাছ ও মাছের ডিম একসাথে ধরা পড়ে। জালের ভেতরে তুলনামূলক বড় মাছের চাপে ছোট মাছ ও জীববৈচিত্র্যগুলো পিষ্ট হয়ে খাবার অনুপযোগী হয়ে নষ্ট হয়ে যায়। কুয়াকাটা উপকূলের জেলেরা জানান, সরকারের মৎস্য নীতিমালা তোয়াক্কা না করে এসব ট্রলিং বোট সৈকত থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে অগভীর সমুদ্রে অবাধে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।
সরেজমিনে দেশের অন্যতম ব্যস্ততম মৎস্য বন্দর মহিপুর-আলীপুর আড়তগুলোতে গিয়ে দেখা গেছে, বিগত বছরগুলোর মতো সেই চেনা কর্মব্যস্ততা আর নেই। মৎস্য শ্রমিকদের অনেকেই অলস সময় পার করছেন। আড়তদার ও জেলেরা জানান, প্রজনন মৌসুমের জন্য ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত টানা ৫৮ দিনের দীর্ঘ সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষে জেলেরা বুকভরা আশা নিয়ে সমুদ্রে গিয়েছিলেন। কিন্তু আশানুরূপ মাছ না পেয়ে চরম হতাশা ও ঋণগ্রস্ততার বোঝা নিয়ে তারা কূলে ফিরেছেন। আলীপুর মৎস্য বন্দরের ব্যবসায়ী আঃ রহিম খাঁন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সমুদ্রে এখন আর আগের মতো মাছ নেই। অবৈধ ট্রলিং ও নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার বন্ধ করে সরকারের নীতিমালা কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে না পারলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সামুদ্রিক অর্থনীতি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে, যার প্রভাব উপকূলের প্রতিটি মানুষের ওপর পড়বে।
একই সুর ট্রলার মাঝি মোঃ হানিফ হাওলাদারের কণ্ঠে। তিনি বলেন, ট্রলিং যে পরিমাণ মৎস্য সম্পদ নষ্ট করতাছে তা চোখে না দেখলে বোঝানো যাবে না। এরা সমুদ্রের ডিম পর্যন্ত রক্ষা পেতে দিচ্ছে না। এভাবে চললে জেলে পেশা ত্যাগ করা ছাড়া উপায় থাকবে না। ট্রলার মালিক মোঃ সেলিম ফকিরও অভিযোগ করেন যে, মৎস্য কর্মকর্তারা মিটিংয়ে সুন্দর সুন্দর কথা বললেও মাঠপর্যায়ে অবৈধ ট্রলিং বন্ধে কোনো কার্যকর ভূমিকা নিচ্ছেন না।
ফিশারিজ কর্মকর্তা বখতিয়ার আহমেদ সতর্ক করে বলেন, এভাবে ক্রমাগত ইলিশসহ সামুদ্রিক মৎস্য উৎপাদন কমতে থাকলে উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনীতি তথা ‘ব্লু ইকোনমি’ বা সুনীল অর্থনীতি এবং মানুষের পুষ্টির জোগান মারাত্মক সংকটের মুখে পড়বে। FAO-এর তথ্য অনুযায়ী, উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের মোট প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৫০ শতাংশ বা তার বেশি পুষ্টির চাহিদা পূরণ হয় সামুদ্রিক মাছ ও জলজ প্রাণী থেকে। বিশেষ করে ভিটামিন বি১২, ক্যালসিয়াম এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের মতো অপরিহার্য পুষ্টির সিংহভাগই আসে সমুদ্র থেকে। বঙ্গোপসাগরের মৎস্য সম্পদই যেহেতু ব্লু ইকোনমির প্রধান ভিত্তি, তাই এটি ধ্বংস হলে দীর্ঘমেয়াদে এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত বিপর্যয় নেমে আসবে।
আইনগত পদক্ষেপের বিষয়ে পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী বলেন, ট্রলিং বোটের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং এ নিয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। কোস্টগার্ড, নৌ-পুলিশ, সংশ্লিষ্ট সংস্থা, জনপ্রতিনিধি ও জেলে প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে নজরদারি ও অভিযান আরও জোরদার করা হবে। কুয়াকাটা নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মনিরুজ্জামান জানান, তারা অবৈধ মৎস্য শিকার ও নিষিদ্ধ জালের বিরুদ্ধে সর্বদা তৎপর রয়েছেন, তবে গভীর সমুদ্রে বড় ধরনের অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে কিছু লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
সচেতন মহল ও সমুদ্র বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের সুনীল অর্থনীতি রক্ষা করতে হলে সময়ক্ষেপণ না করে আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগের মাধ্যমে সমুদ্রে মাছ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসকারী ট্রলিং এবং নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার এখনই সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। সেই সাথে জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্র দূষণের প্রভাব কাটিয়ে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে বঙ্গোপসাগরে গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা পরিচালনা করা জরুরি।
আজকালের খবর/রাশেদুল মিলন