ক্ষমতার করিডোর সাধারণত মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়—নাগরিকের কাছ থেকে, বাস্তবতা থেকে, কখনো কখনো নিজের পরিবার থেকেও। রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যস্ততা, নিরাপত্তার বলয়, প্রটোকলের কঠোরতা—সব মিলিয়ে একজন সরকারপ্রধানকে ধীরে ধীরে এক অদৃশ্য দেয়ালের মধ্যে বন্দি করে ফেলা হয় । কিন্তু সময়ের ইতিহাসের কিছু মুহূর্তে এমন কিছু নেতা আবির্ভূত হন, যারা সেই দেয়াল ভেঙে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে প্রবেশ করতে সক্ষম হন তাদের আচরণ, মানবিকতা এবং জীবনযাপনের সরলতার মাধ্যমে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-কে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে যে দৃশ্যগুলো দেশের মানুষ প্রত্যক্ষ করছে, সেসব তেমনই এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইঙ্গিত বহন করছে।
সম্প্রতি সচিবালয় থেকে নিজেই গাড়ি চালিয়ে আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র-এ একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাওয়ার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। গাড়ির পাশে বসে ছিলেন তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান। একজন প্রধানমন্ত্রী নিজে ড্রাইভিং সিটে বসে স্ত্রীকে নিয়ে যানজটের ভেতর দিয়ে গন্তব্যে যাচ্ছেন—বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এটি একেবারেই ব্যতিক্রমী দৃশ্য।
আরও বিস্ময়কর ছিল, পথে তিনি ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে যানজটে আটকা পড়েন এবং আশপাশের সাধারণ মানুষকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। সেখানে কোনো ক্ষমতার অহংকার ছিল না, ছিল না কৃত্রিম দূরত্ব; ছিল এক স্বাভাবিক মানবিক আচরণ।
এই দৃশ্য যেন আরও গভীর অর্থ ধারণ করে যখন মনে পড়ে আরেকটি ঘটনার কথা। কারওয়ান বাজারের কাছে এক্সপ্রেসওয়েতে নিজের বহর থামিয়ে একটি রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সকে পথ করে দেওয়ার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশের মানুষ বহুবার দেখেছে—ভিআইপি চলাচলের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাধারণ মানুষকে আটকে থাকতে হয়েছে, এমনকি রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সও থেমে গেছে। সেই বাস্তবতায় একজন প্রধানমন্ত্রী যখন নিজের নিরাপত্তা বহর থামিয়ে বলেন, “আগে অ্যাম্বুলেন্স যাবে”—এটি শুধু প্রশাসনিক নির্দেশ নয়, এটি কার্যত রাষ্ট্রচিন্তার পরিবর্তনের প্রতীক।
তারেক রহমানের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে বারবার একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে—তিনি ক্ষমতাকে ভোগের বিষয় হিসেবে নয়, বরং দায়িত্ব হিসেবে দেখতে চাইছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের পর বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিজয়ী সরকারপ্রধান হিসেবে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের বাসায় গিয়ে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো এবং দেশ গঠনে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানানো ছিল এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা।
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে যেখানে নির্বাচন মানেই প্রতিহিংসা, বিভাজন ও প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার প্রবণতা, সেখানে তারেক রহমানের এই আচরণ রাজনৈতিক সৌজন্য ও গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার এক বিরল উদাহরণ।
শুধু রাজনৈতিক আচরণেই নয়, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেও তিনি ভিন্ন বার্তা দিয়েছেন। দীর্ঘদিনের বিতর্কিত সংস্কৃতি—শুল্কমুক্ত গাড়ি সুবিধা ও সরকারি প্লট বরাদ্দ—এক ঘোষণায় বন্ধ করে দেওয়া ছিল সাহসী পদক্ষেপ। রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বিশেষ সুবিধাভোগী সংস্কৃতিতে এটি ছিল বড় ধরনের ধাক্কা। তিনি যেন বোঝাতে চেয়েছেন, রাষ্ট্রের সম্পদ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ভোগের বস্তু নয়; এটি জনগণের আমানত।
এমনকি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ব্যয়সংকোচনেও এসেছে দৃশ্যমান পরিবর্তন। যেখানে অতীতে মধ্যাহ্নভোজে মাথাপিছু ব্যয় ছিল ৮০০ টাকা, সেখানে সেটিকে মাত্র দেড়শ টাকায় কমিয়ে এনে সাদামাটা ও বাস্তবসম্মত পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়েছে। এটি কেবল অর্থ সাশ্রয়ের বিষয় নয়; বরং এটি প্রতীকীভাবে জনগণকে জানিয়ে দেয় যে,রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল ব্যক্তিও মিতব্যয়িতা চর্চা করতে পারেন।
তারেক রহমানের ব্যক্তিজীবনের দিকটিও সমানভাবে মানুষের মন ছুঁয়েছে। স্ত্রী ও কন্যা জাইমা রহমান-এর প্রতি তাঁর আন্তরিকতা ও দায়িত্ববোধ জনমনে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। সিলেটে বৃষ্টির মধ্যে এক হাতে স্ত্রীকে আগলে রাখা আর অন্য হাতে ছাতা ধরে হাঁটার দৃশ্যটি যেন কেবল একটি পারিবারিক মুহূর্ত ছিল না; এটি ছিল সম্মান, ভালোবাসা ও সহমর্মিতার প্রতীক। একজন রাষ্ট্রনায়ক যখন প্রকাশ্যে তাঁর পরিবারের প্রতি দায়িত্ব ও ভালোবাসা দেখান, তখন তা সমাজেও ইতিবাচক বার্তা দেয়—পরিবারের প্রতি যত্নশীল হওয়া দুর্বলতা নয়, বরং মানবিক শক্তির প্রকাশ।
বিশ্ব রাজনীতিতে আমরা এমন কিছু নেতাকে দেখেছি, যারা পারিবারিক মূল্যবোধের জন্য আলাদা মর্যাদা পেয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাঁর পরিবারকেন্দ্রিক জীবনধারার জন্য বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। কানাডার সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো কিংবা যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরুন-এর ক্ষেত্রেও আমরা একই চিত্র দেখেছি। তারা দেখিয়েছেন, একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক একই সঙ্গে একজন যত্নশীল পিতা ও দায়িত্বশীল স্বামীও হতে পারেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের উত্থান সেই ধারার সঙ্গেই যেন নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাঁর জীবনযাপনে কৃত্রিম জাঁকজমকের পরিবর্তে সরলতার প্রকাশ ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। সাধারণ পোশাক, নির্ধারিত সময়ের আগেই অফিসে প্রবেশ, ছুটির দিনেও কাজ করা—এসব বিষয় মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, নেতৃত্ব মানে শুধু ভাষণ নয়; নেতৃত্ব মানে আচরণ দিয়েও উদাহরণ তৈরি করা।
বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এমন নেতৃত্বের প্রত্যাশা করেছে, যেখানে ক্ষমতার চেয়ে মানবিকতা বড় হয়ে উঠবে। তারেক রহমানের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড সেই প্রত্যাশাকে নতুনভাবে জাগিয়ে তুলেছে। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ—অ্যাম্বুলেন্সকে পথ ছেড়ে দেওয়া, নিজে গাড়ি চালানো, বিরোধীদের বাড়িতে যাওয়া, ব্যয়সংকোচন, পরিবারের প্রতি আন্তরিকতা—সবকিছু মিলিয়ে তিনি এক ভিন্নধর্মী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছেন।
রাজনীতিতে জনপ্রিয়তা ক্ষণস্থায়ী হতে পারে, কিন্তু মানবিকতা মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলে। হয়তো এ কারণেই সাধারণ মানুষ এখন তারেক রহমানকে শুধু একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বরং একজন সহানুভূতিশীল মানুষ, একজন আধুনিক রাষ্ট্রনায়ক এবং একজন দায়িত্বশীল অভিভাবক হিসেবেও দেখতে শুরু করেছে।
তাই ওবামা, ট্রুডো কিংবা ক্যামেরুনের মতো বিশ্বনেতাদের পাশে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নামও উচ্চারিত হচ্ছে, যেখানে—ক্ষমতার অহংকার নয়, মানবিক নেতৃত্বের প্রতীক উঠেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com