বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং শিল্পায়নের চাকা সচল রাখার ইতিহাসে বাগেরহাটের রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এখন এক অবিস্মরণীয় নাম যা সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন এক বৈশ্বিক মানদণ্ড স্থাপন করেছে। বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (বিআইএফপিসিএল) পরিচালিত এই মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট গত এপ্রিল মাসে রেকর্ড ৭৬০ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করার মধ্য দিয়ে দেশীয় জ্বালানি খাতের এক বিশাল মাইলফলক স্পর্শ করেছে। এই সাফল্যের গুরুত্ব অনুধাবন করতে হলে আমাদের তাকাতে হবে দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদার দিকে। গত এপ্রিলের প্রচণ্ড দাবদাহে যখন জনজীবন ও শিল্প উৎপাদন স্থবির হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, তখন রামপালের এই নিরবচ্ছিন্ন জোগান জাতীয় গ্রিডকে এক অভাবনীয় স্থিতিশীলতা দান করেছে।
বিআইএফপিসিএলের উপ-মহাব্যবস্থাপক আনোয়ারুল আজিম গত ৩ মে এক আনুষ্ঠানিক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই অভাবনীয় রেকর্ডের তথ্য নিশ্চিত করেছেন, যা আমাদের বিদ্যুৎ খাতের সক্ষমতাকে বিশ্ব দরবারে নতুন করে তুলে ধরেছে। এই উৎপাদনের পরিমাণ দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৯ শতাংশেরও বেশি অংশ পূরণ করেছে, যা মূলত একটি মেগা প্রকল্পের উপযোগিতার শ্রেষ্ঠ প্রমাণ। বিআইএফপিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রমানাথ পূজারী এই অর্জনকে কেবল যান্ত্রিক সাফল্য হিসেবে দেখেননি বরং একে শক্তিশালী ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন এবং দুই দেশের প্রকৌশলীদের নিরলস প্রচেষ্টার ফসল হিসেবে অভিহিত করেছেন।
রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের এই অগ্রযাত্রা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে এটি কেবল কয়লাভিত্তিক একটি কেন্দ্র নয় বরং এটি আধুনিক প্রযুক্তির এক অনন্য মিশেল যা ‘আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল’ প্রযুক্তিতে সজ্জিত। এই প্রযুক্তির বিশেষত্ব হলো এটি প্রচলিত কেন্দ্রের তুলনায় অনেক কম কয়লা পুড়িয়ে অনেক বেশি উচ্চচাপ ও উচ্চতাপের বাষ্প তৈরি করতে সক্ষম, যা শেষ পর্যন্ত পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব কমিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের এই যুগে যখন উন্নত বিশ্বও তাদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই কেন্দ্রটি দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
১.৬ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ব্যয়ে নির্মিত ১৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার এই প্রকল্পটি মূলত ২০১০ সালের একটি ঐতিহাসিক দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ফসল, যা ভারত ও বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের এক দৃশ্যমান স্তম্ভ। এনটিপিসি এবং পিডিবি’র ৫০-৫০ শতাংশ অংশীদারিত্বের এই মডেলে আজ কেবল বিদ্যুৎ উৎপন্ন হচ্ছে না বরং এখানে তৈরি হচ্ছে একদল আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ জনশক্তি। বর্তমানে ভারতের এনটিপিসি বিশেষজ্ঞদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে একদল বাংলাদেশি প্রকৌশলী এই জটিল মেগা প্ল্যান্টটি সফলভাবে পরিচালনা করছেন, যা ভবিষ্যতে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা বড় থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট পরিচালনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আত্মনির্ভরশীলতা নিশ্চিত করবে।
বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির এই রেকর্ড উৎপাদন এমন এক সময়ে এসেছে যখন মোংলা বন্দর, খুলনা ও যশোরের শিল্পাঞ্চলগুলোতে লো-ভোল্টেজ এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাব একটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত ছিল। রামপালের বিদ্যুৎ এখন সেই শিল্পাঞ্চলগুলোর গতি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে, যা প্রকারান্তরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুসারে, বিদ্যুৎ সরবরাহের স্থিতিশীলতা শিল্প উৎপাদনকে ৮-১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে পারে। রামপাল এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিচ্ছে।
তবে এই দীর্ঘ পথ চলায় পরিবেশগত উদ্বেগের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়েছে। ইউনেস্কো এবং বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনের উদ্বেগকে সম্মান জানিয়ে এই কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ‘ফ্লু গ্যাস ডিসালফারাইজেশন’ এবং ‘ইলেক্ট্রোস্ট্যাটিক প্রেসিপিটেটর’ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, যা ধোঁয়া থেকে ক্ষতিকারক সালফার ও ছাই কণা আলাদা করে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যকে সুরক্ষা প্রদান করছে। কয়লা পরিবহনের ক্ষেত্রে উন্নতমানের কার্গো ও আধুনিক লজিস্টিক ম্যানেজমেন্ট নিশ্চিত করার ফলে নদী বা বনাঞ্চলের পরিবেশের কোনো ক্ষতি হচ্ছে না, যা টেকসই উন্নয়নের এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে রামপাল কেন্দ্রটি পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হওয়ার এই ধারা যদি অব্যাহত থাকে তবে বাংলাদেশ অদূর ভবিষ্যতে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব সক্ষমতায় লোডশেডিংমুক্ত একটি দেশ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ২৫-২৮ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি, কিন্তু চাহিদা আরও বেশি। রামপালের মতো প্রকল্পগুলো এই ব্যবধান কমাতে সহায়ক।
রামপালের সাফল্য আমাদেরকে আরও বড় চিন্তা করতে উৎসাহিত করে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাফল্য বাংলাদেশের জন্য অনুকরণীয়। ফ্রান্স তার বিদ্যুতের প্রায় ৭০ শতাংশ পারমাণবিক উৎস থেকে উৎপাদন করে, যা দেশটিকে জ্বালানিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছে এবং কার্বন নির্গমন কমিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদক, যেখানে ৯০টির বেশি রিয়্যাক্টর চলছে। চীন দ্রুততম গতিতে পারমাণবিক ক্ষমতা বাড়াচ্ছে এবং ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বের শীর্ষস্থানে উঠতে পারে। ভারতও রূপপুরের মতো প্রকল্প থেকে শিক্ষা নিয়ে এগোচ্ছে।
বাংলাদেশে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র (২৪০০ মেগাওয়াট) নির্মাণাধীন। এটি চালু হলে দেশের জ্বালানি মিশ্রণে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। রামপালের অভিজ্ঞতা রূপপুরের নিরাপদ ও দক্ষ পরিচালনায় সহায়ক হবে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কম খরচে বেসলোড বিদ্যুৎ সরবরাহ করে, যা শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করবে। তবে নিরাপত্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জনসচেতনতা নিশ্চিত করতে হবে।
আগামীর স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের যে লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে তার অন্যতম ভিত্তি হলো নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি। সেই জ্বালানি যুদ্ধের প্রথম সারির যোদ্ধা হিসেবে রামপাল আজ নিজেকে প্রমাণ করেছে। কয়লা আমদানির লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ এবং বৈশ্বিক ডলার সংকটের প্রতিকূলতা কাটিয়ে বিআইএফপিসিএল যেভাবে এপ্রিল মাসে এই রেকর্ড উৎপাদন নিশ্চিত করেছে তা দেশের অন্যান্য মেগা প্রকল্পের জন্যও একটি অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।
রামপাল কেবল অন্ধকার দূর করার গল্প নয় বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ার এনার্জি কানেক্টিভিটি এবং দ্বিপাক্ষিক সফল সহযোগিতার এক বিশাল মহাকাব্য, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে এক সমৃদ্ধ বাংলাদেশের বার্তা পৌঁছে দিবে। এই মাইলফলক স্পর্শ করার মধ্য দিয়ে আমরা বুঝতে পারি যে সঠিক পরিকল্পনা ও উন্নত প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটলে যেকোনো অসাধ্য সাধন করা সম্ভব। ৭৬০ মিলিয়ন ইউনিটের উৎপাদন রেকর্ড আসলে সেই আলোকোজ্জ্বল ভবিষ্যতের কেবল একটি শুরু মাত্র, যা ২০৪১ সালের উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভিত গড়ে দিচ্ছে।
এনটিপিসি এবং বাংলাদেশি কর্মীদের এই পেশাদারিত্ব ও কারিগরি উৎকর্ষ আগামী দিনের জ্বালানি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের প্রধান শক্তির উৎস হয়ে থাকবে। সুন্দরবনকে অক্ষুণ্ন রেখেই শিল্পায়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে - এই আশাবাদ আজ প্রতিটি নাগরিকের মনে বদ্ধমূল হয়েছে। এই রেকর্ড উৎপাদনের ধারা অব্যাহত রেখে রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র হয়ে উঠুক আমাদের জাতীয় সমৃদ্ধির অবিরাম চালিকাশক্তি, যা প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে দিবে আধুনিক সভ্যতার আলোকবর্তিকা।
রামপালের সাফল্য থেকে আমরা আরও কিছু শিক্ষা নিতে পারি। প্রথমত, আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে প্রযুক্তি ও দক্ষতা অর্জন সম্ভব। দ্বিতীয়ত, পরিবেশ সুরক্ষা ও উন্নয়ন একসঙ্গে চলতে পারে যদি সঠিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। তৃতীয়ত, স্থানীয় অর্থনীতির উন্নয়নের জন্য মেগা প্রকল্পগুলোকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করা দরকার। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই মডেল অনুসরণযোগ্য।
সরকারের উচিত এই সাফল্যকে ধরে রেখে আরও বেশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে বিনিয়োগ করা। সৌর, বায়ু এবং হাইড্রো পাওয়ারের সঙ্গে থার্মাল প্ল্যান্টের সমন্বয় করে একটি ব্যালেন্সড এনার্জি মিক্স তৈরি করা সম্ভব। রামপাল এই যাত্রার শুরু মাত্র। আগামীর বাংলাদেশ হবে বিদ্যুতের আলোয় উদ্ভাসিত, শিল্পে সমৃদ্ধ এবং পরিবেশে সুরক্ষিত। এই মাইলফলক সেই স্বপ্নকে আরও কাছে নিয়ে আসবে। (তথ্যসূত্র: বিআইএফপিসিএল, জ্বালানি মন্ত্রণালয়, এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন।)
লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক
আজকালের খবর/বিএস