গাজীপুরের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ইতিহাসে অধ্যাপক এম এ মান্নান ছিলেন এক বহুমাত্রিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। শিক্ষকতা পেশা থেকে শুরু করে তৃণমূল রাজনীতি, পরে জাতীয় সংসদ সদস্য এবং সরকারের প্রতিমন্ত্রী-সব মিলিয়ে তার জীবন ছিল দীর্ঘ, ধারাবাহিক ও জনসম্পৃক্ত রাজনৈতিক যাত্রার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
১৯৫০ সালে গাজীপুরের দক্ষিণ সালনায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি জয়দেবপুর রানী বিলাসমণি স্কুল, ময়মনসিংহ মুসলিম হাই স্কুল ও ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে অধ্যয়ন করেন। পরবর্তীতে আনন্দমোহন কলেজ থেকে এইচএসসি ও স্নাতক সম্পন্ন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফলিত রসায়নে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
শিক্ষাজীবন শেষে তিনি শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হন। টঙ্গী কলেজে কর্মজীবন শুরু করে পরবর্তীতে গাজীপুর কাজী আজিমউদ্দিন কলেজে অধ্যাপনা করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি শিক্ষা বিস্তার, সামাজিক উন্নয়ন এবং বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।
১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-তে যোগদানের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন শক্তিশালী করার মধ্য দিয়ে তিনি ধীরে ধীরে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এবং ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৮৪ সালে কাউলতিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে তার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে পথচলা শুরু হয়। পরবর্তীতে তিনি একাধিকবার এই দায়িত্বে নির্বাচিত হয়ে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গাজীপুর-২ আসন থেকে তিনি বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে জাতীয় সংসদ সদস্য হন। ওই নির্বাচনে তিনি সারা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত প্রার্থীদের একজন হিসেবে আলোচনায় আসেন, যা তার জনপ্রিয়তা ও জনসমর্থনের প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হয়।
পরে তিনি সরকারের ধর্ম প্রতিমন্ত্রী এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি প্রশাসনিক দক্ষতা, নীতিনির্ধারণী ভূমিকা এবং উন্নয়নমুখী বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
তার দায়িত্বকালে গাজীপুর অঞ্চলের শিক্ষা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটে। স্থানীয়ভাবে তিনি গাজীপুরের উন্নয়নের রূপকার হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করছেন তার ছেলে এম. মঞ্জুরুল করিম রনি, যিনি গাজীপুর-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জীবনের পর ২০২২ সালের ২৮ এপ্রিল রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অধ্যাপক এম এ মান্নান মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যু গাজীপুরের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
শিক্ষকতা থেকে জাতীয় রাজনীতি এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন পর্যন্ত অধ্যাপক এম এ মান্নানের জীবন ছিল জনসেবা, সংগঠন ও উন্নয়নচিন্তার এক ধারাবাহিক প্রতিফলন। গাজীপুরের আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসে তিনি একজন অভিজ্ঞ সংগঠক ও নীতিনির্ধারক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
আজকালের খবর/ এমকে