শুক্রবার ২৪ এপ্রিল ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে রেকর্ডভাঙা ভোট
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২৬, ১২:০১ পিএম   (ভিজিট : ২০২)
রেকর্ডভাঙা ভোটদান এবং ভোটারের উপস্থিতির মধ্যে দিয়ে শেষ হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোট। নির্বাচনের কমিশনের বরাতে জানা গেছে, গতকাল ২৩ এপ্রিল প্রথম দফার ভোটগ্রহণের দিন প্রায় ৯৩ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন।

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় মোট আসনসংখ্যা ২৯৪টি। এবারের বিধানসভা নির্বাচনে ২ দফায় ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ২৩ এপ্রিল ছিল প্রথম দফা ভোটের দিন। এ দিন পশ্চিমবঙ্গের ১৬টি জেলার ১৫২টি আসনে নির্বাচন হয়েছে। দ্বিতীয় দফায় আগামী ২৯ এপ্রিল বাকি ৮ জেলার ১৪২টি আসনে ভোট হবে।

ভারতের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য শাখার তথ্য অনুযায়ী, ২৩ এপ্রিল প্রথম দফার ভোটে ১৫২টি আসনে মোট ভোট পড়েছে ৯২ দশমিক ৮৮ শতাংশ। ভোটদানের হার সবচেয়ে বেশি কোচবিহার জেলায়— ৯৬.০৪ শতাংশ। এ ছাড়া দক্ষিণ দিনাজপুরে ৯৫.৪৪ শতাংশ ভোট পড়েছে। ৯৪ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে জলপাইগুড়ি, মালদহ, বীরভূম এবং উত্তর দিনাজপুরে। দার্জিলিং ও কালিম্পঙে ভোটের হার ৯০ শতাংশের নীচে। বাকি জেলাগুলিতেও ভোটের হার ৯০-এর গণ্ডি পেরিয়ে গিয়েছে।

ভোটদানের এই পরিসংখ্যান পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের তো বটেই, ভারতের অন্য কোনো রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনেও বিরল। অনেকে ভোটের এ পরিস্থিতিকে নজিরবিহিনী বলেও দাবি করছেন।

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার গতকাল সাংবাদিকদের বলেছেন, ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের কবল থেকে স্বাধীনতা লাভের পর এখন পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে সর্বোচ্চ ভোটদানের রেকর্ড এটাই। এজন্য কমিশনের পক্ষ থেকে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যবাসীকে ‘স্যালুট’ জানিয়েছেন তিনি।

ভোটের হার

রাত ১২টা পর্যন্ত কমিশনের পরিসংখ্যান বলছে, প্রথম দফায় ভোট পড়েছে ৯২.৮৮ শতাংশ। ভোটদানের হার সবচেয়ে বেশি কোচবিহারে— ৯৬.০৪ শতাংশ। এ ছাড়া দক্ষিণ দিনাজপুরে ৯৫.৪৪ শতাংশ ভোট পড়েছে। ৯৪ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে জলপাইগুড়ি, মালদহ, বীরভূম এবং উত্তর দিনাজপুরে। দার্জিলিং ও কালিম্পঙে ভোটের হার ৯০ শতাংশের নীচে। বাকি জেলাগুলিতেও ভোটের হার ৯০-এর গণ্ডি পেরিয়ে গিয়েছে।

কী কারণে ভোটের জোয়ার

অনেকের মতে, ভোটদানের এই নজিরবিহীন পরিসংখ্যানের নেপথ্যে প্রধান কারণ ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)। প্রথম দফায় যে ১৫২টি আসনে ভোট হয়েছে, সেখানে ৪০,৪৬, ৭৫৩ জন ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে। মোট ভোটারের সংখ্যা কমে গেলে এবং ভোটদানের সংখ্যা মোটামুটি একই থাকলে সহজ অঙ্কেই ভোটের হার বেড়ে যাওয়ার কথা।

কিন্তু ভোটদানের সংখ্যাও এ বার বেড়ে গিয়েছে ২০২১ বা ২০২৪ সালের তুলনায়। তার কারণ কী? প্রথমত, ভোট না-দিলে তালিকা থেকে নাম কাটা যাবে, এই আতঙ্কে অনেকে ভোটকেন্দ্রমুখী হয়েছেন। দূরদূরান্ত থেকে কাজকর্ম, রুটিরুজি ফেলে ছুটে এসেছেন শুধু ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন বলে। তবে সেই ভোট কার পক্ষে বেশি গেলো, শাসক না বিরোধী— সেটি এখন বড় প্রশ্ন।

এই বিপুল ভোট কি স্থিতাবস্থা বা প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার পক্ষে পড়ল নাকি বাঙালি গরিমার পক্ষে? আগামী ৪ মে আগে তার হদিস পাওয়া সম্ভব নয়। কারণ সেদিনই ভোটের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করেবে নির্বাচন কমিশন।

প্রথম দফার ভোটের পরে মুখোমুখি দু’পক্ষ তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি উভয়েই দাবি করেছে, তারা ১২৫টি আসন পাচ্ছে প্রথম দফার ভোটেই। শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস যেমন দাবি করেছে, এই বিপুল ভোট পড়েছে এসআইআর-বিরোধিতার কারণে। আবার বিরোধী দল বিজেপি দাবি করেছে, এই ভোট পড়েছে রাজ্যে ক্ষমতার ‘পরিবর্তন’-এর পক্ষে।

দ্বিতীয়ত, রাজ্যের ১৬টি জেলার যে ১৫২টি আসনে বৃহস্পতিবার ভোটগ্রহণ হয়েছে, ২০২১ সালে সেই আসনগুলোতে মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল ৩ কোটি ৭৮ লাখ। সে বার ৮৩.২ শতাংশ ভোট পড়েছিল। ভোট দিয়েছিলেন ৩.১৪ কোটি মানুষ।

২০২৬ সালে এসআইআর-এর পর প্রথম দফার আসনগুলোতে মোট ভোটারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৬০ লাখ। ভোট দিয়েছেন প্রায় ৩ কোটি ২৪ লাখ ভোটার। অর্থাৎ, মোট ভোটারের সংখ্যা কমেছে। বেড়েছে ভোটদাতার সংখ্যা। ভোটার হিসাবে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার তাগিদে দলে দলে ভোট দিতে গিয়েছেন মানুষ। গত কয়েক দিন ধরেই হাওড়া, শিয়ালদহ স্টেশনে ভারতের অন্যান্য রাজ্য থেকে আসা শ্রমিকদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। 

সংখ্যালঘু পরিযায়ী শ্রমিক অধ্যুষিত মালদহ, মুর্শিদাবাদ, উত্তর দিনাজপুরের মতো জেলায় শুধু ভোট দেবেন বলে ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনেকে ফিরেছেন। নাম কাটার আতঙ্ক কিন্তু শুধু পরিযায়ী শ্রমিকদের মতো দরিদ্র অংশে নয়, উচ্চপদস্থ কর্তাব্যক্তিরাও চিন্তিত। সরকারি কর্তাব্যক্তিদের কাউকে কাউকে বলতে শোনা যাচ্ছে, “কোনও বার ভোট দিই না। এ বার দেব। না হলে শুনছি নাকি নাম বাদ চলে যাবে।”

যুক্তি এবং পাল্টাযুক্তি

প্রচলিত ধারণা বলে, প্রচুর পরিমাণে ভোট পড়লে তা সাধারণত প্রতিষ্ঠানবিরোধী হয়। অর্থাৎ, ক্ষমতাসীন সরকারের বিপক্ষে যায় জনতার রায়। তবে দীর্ঘলালিত এই ধারণার পাল্টা যুক্তিও রয়েছে। তৃণমূলের অনেকে এই প্রসঙ্গে গত লোকসভা এবং বিধানসভা নির্বাচনের দৃষ্টান্ত টানছেন। পশ্চিমবঙ্গে সে বারও অনেক ভোট পড়েছিল এবং ভোটের ফলাফল তৃণমূলের পক্ষে গিয়েছিল। পাশাপাশি প্রতিবেশী রাজ্য বিহারের দৃষ্টান্ত দিয়ে তারা দাবি করছেন, এসআইআর-এর পর ভোটের হার বৃদ্ধি স্বাভাবিক। তবে বিহারেও ভোটের হার বেড়ে যাওয়ার পর ক্ষমতাসীন সরকারের ‘প্রত্যাবর্তন’ হয়েছে।

বিরোধীদের তরফে অবশ্য ২০১১ সালের পরিসংখ্যান তুলে ধরা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে এত দিন সবচেয়ে বেশি ভোটদানের নজির ছিল ওই বছরেই। ভোট পড়েছিল ৮৪.৩৩ শতাংশ এবং সেই ভোটে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান হয়েছিল। পরিবর্তনের হাওয়ায় রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল।

এসআইআর

এ বার ভোটের প্রচারে তৃণমূল এবং বিজেপি— উভয়েরই অন্যতম ‘হাতিয়ার’ এসআইআর। বিজেপির দাবি, ভোটার তালিকার এই ‘শুদ্ধিকরণ’ অবৈধ ভোটারদের মুছে দেবে। স্বচ্ছ নির্বাচন নিশ্চিত করতে এই ছাঁকনির প্রয়োজন ছিল।

আবার, এসআইআর-এর কারণে সাধারণ মানুষের হয়রানিকে হাতিয়ার করে ঢালাও বিজেপি-বিরোধী প্রচার চালাচ্ছে তৃণমূল। তাদের একাংশের মূল্যায়ন, রাজ্যে যারা আছেন, তারা তো বটেই, অন্য রাজ্য থেকে গাঁটের অর্থ ব্যয় করে নাম কাটার ভয়ে যারা ভোট দিতে আসতে বাধ্য হলেন, তারাও বিজেপির বিরুদ্ধে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। এ ভাবে পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর আসলে বিজেপির কবর খুঁড়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন তৃণমূলের কেউ কেউ।

তবে ভিন্নমতও রয়েছে। বিজেপির যুক্তি, দূরদূরান্ত থেকে রাজ্যে ফিরে মানুষ ভোট দিচ্ছেন পরিবর্তন সুনিশ্চিত করার জন্যই। যাতে কাজের অভাবে আর তাদের বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র যেতে না-হয়। 

কোথাও কোথাও পরিযায়ী শ্রমিকদের ভয় দেখানোর অভিযোগও রয়েছে। এই সমস্ত ভোট আদৌ তৃণমূলের বিরুদ্ধে যাবে কি না, সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় পরিযায়ী শ্রমিকদের ভোট বাম ও কংগ্রেসের মধ্যে ভাগ হয়ে যাবে কি না, সে ক্ষেত্রে কার লাভ এবং কার ক্ষতি, তা নিয়েও কৌতূহল রয়েছে।

বিক্ষিপ্ত অশান্তি

রাজ্যে প্রথম দফার ভোটকে মোটের উপর শান্তিপূর্ণই বলা যায়, অন্তত পশ্চিমবঙ্গে ভোটের অতীত ইতিহাসের নিরিখে। ২৩ এপ্রিল সকাল থেকে বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা ছাড়া বড়সড় অশান্তির খবর আসেনি। সিপিএম বনাম তৃণমূল সংঘর্ষে মুর্শিদাবাদের ডোমকল দফায় দফায় উত্তপ্ত হয়েছে। 
সকালে সেখানে সিপিএম সমর্থকদের ভোট দিতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল তৃণমূলের বিরুদ্ধে। কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং পুলিশ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেন। দক্ষিণ দিনাজপুরের কুমারগঞ্জে বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু সরকার এবং আসানসোল দক্ষিণের বিজেপি প্রার্থী অগ্নিমিত্রা পালের উপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। 

দাবি, একটি বুথে বিজেপির পোলিং এজেন্টকে বসতে বাধা দেওয়া হলে শুভেন্দু নিজে ধাওয়া করে দুষ্কৃতীদের তাড়ান। তার পরে তার উপর হামলা হয়। তৃণমূলের হামলায় অগ্নিমিত্রার গাড়ির পিছন দিকের কাচ ভেঙে গিয়েছে বলে অভিযোগ। ওই ঘটনায় হিরাপুর থানায় লিখিত অভিযোগ জানিয়েছে বিজেপি। ভোটগ্রহণ পর্বের প্রায় শেষ দিকে বীরভূমের খয়রাশোলে কেন্দ্রীয় বাহিনীর সঙ্গে ভোটারদের একাংশ বচসায় জড়িয়ে পড়েন। 

একটি বুথে ইভিএম-এ গোলমালের কারণে দীর্ঘ ক্ষণ ভোটগ্রহণ থমকে ছিল। বিরক্ত ভোটারেরা এক পর্যায়ে বাহিনীর দিকে তেড়ে যান। ভাঙচুর করা হয় পুলিশের গাড়ি। কয়েক জন জওয়ান সেখানে আহত হয়েছেন। এ ছাড়া, নওদায় বুথ পরিদর্শনে গিয়ে বাধা পান আম জনতা উন্নয়ন পার্টির (এজেইউপি) প্রধান হুমায়ুন কবীর। অভিযোগ, তার গাড়ি বহরে হামলা হয়েছে। দফায় দফায় পুলিশের সঙ্গে বচসায় জড়িয়ে পড়েন তিনি। নির্বাচন কমিশন এই ঘটনায় রিপোর্ট তলব করেছে।

সূত্র : আনন্দবাজার

আজকালের খবর/ এমকে







আরও খবর


Advertisement
সর্বশেষ সংবাদ
বিরোধীরা অরাজকতা করলে রাজপথে মোকাবিলার হুঁশিয়ারি বিএনপির
মালয়েশিয়ায় ইমিগ্রেশনের সাঁড়াশি তৎপরতা
ফ্রাঙ্কফুর্টে বিশ্ব টেক্সটাইল মেশিনারিজ মেলায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়ানোর দাবি
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
গাজীপুরে সাবেক ছাত্রদল নেতা হাবিবুর রহমান রিপন মারা গেছেন
দুই প্রজন্মের কন্ঠে ‘বাবা ছেলের গান’
পঞ্চগড়ে জাতীয় পুষ্টি সপ্তাহে উদ্বোধন করলেন জেলা প্রশাসক
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor@gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor@gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft