১৯৭৮সালের দিকে ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত কাজে বহুবার ট্রেনে ভ্রমণ করতেন মো: মফিজুল ইসলাম (৬০)। যেতেন বিনা টিকেটে ফিরতেনও বিনা টিকেটেই। প্রায় অর্ধ শতাব্দী পর তাঁর অনুশোচনা শুরু হয় বিনা টিকেটে ভ্রমণ নিয়ে, তিনি বিনা টিকেটে ভ্রমণ করার সেই টাকা পরিশোধ করতে চান, তিনি উপায় খুঁজছিলেন। অবশেষে বুধবার (৮ এপ্রিল) গাজীপুরের শ্রীপুর রেলওয়ে স্টেশন মাস্টারের কাছে সেই রেল ভ্রমণের ২০হাজার টাকা পরিশোধ করে দীর্ঘ দিনের অনুশোচনা ঘোচালেন।
মো: মফিজুল ইসলাম গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার চন্নাপাড়া গ্রামের মো: আব্দুল মান্নান বেপারির ছেলে। বর্তমানে তিনি বেপারিবাড়ী ফাতেমাতুজ যাহ্রা (রাঃ) মহিলা মাদরাসা নামে প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে পরিচালনা করছেন। দীর্ঘ দিন ধরে তাকে বিষয়টি পীড়া দিচ্ছিল। এখন রেলের টাকা পরিশোধ করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন।
মফিজুল ইসলাম জানান, ১৯৭৬ সালের দিকে তিনি জীবিকার তাগিদে ব্যবসা শুরু করেন। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল না থাকায় শ্রীপুরে উৎপাদিত কাঁঠাল ট্রেনের ছাদে পরিবহন করে নিয়ে তিনি ঢাকায় বিক্রি করতেন। ঢাকায় যাতায়াতের জন্য তিনি কোন টিকিট কেটে দায়িত্বরতদের ১টাকা দিয়ে দিতেন। এভাবেই বছর কয়েক নিয়মিত যাতায়াত করেছেন। সেই টাকাতো সরকারের কোষাগারে জমা হতো না। অর্ধশতাব্দী পর মফিজুল ইসলাম এমন চিন্তা থেকে অনুভব করেন। সেই সময় দেয়া ১ টাকা দায়িত্বরতদের পকেটে গেলেও রেলওয়ে তাদের পাওনা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
তিনি বলেন, ২ থেকে ৩বছর টিকিট ছাড়াই যাতায়াত করেছি। দায়িত্বরতদের হাতে টাকা দিয়েছি ঠিকই, কিন্তু রেল কর্তৃপক্ষ তো আমার কাছে টাকা পায়। অনেকদিন ধরেই মনে হচ্ছিল, এই টাকাটা আমার পরিশোধ করা দরকার। বিবেকের কাছে আমি দায়বদ্ধ ছিলাম। কিন্তু কত টাকা পরিশোধ করবেন? বুঝে উঠতে পারছিলেন না। তিনি নিজে নিজেই হিসেব কষে ২০হাজার টাকার কম হবে বলে ধারণা করেন। সবশেষ তিনি ২০হাজার টাকা পরিশোধ করেছেন।
এমন দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি ছুটে যান শ্রীপুর রেলওয়ে স্টেশনে। স্টেশন মাস্টারকে অনুরোধ করেন তাকে ২০ হাজার টাকার টিকিট দেওয়ার জন্য। তবে একসঙ্গে এত টাকার টিকিট না থাকায় বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানান হয়। এর এক সপ্তাহ অপেক্ষার পর মফিজুল ইসলাম আবারও শ্রীপুর রেলওয়ে স্টেশনে যান। অবশেষে গত ১লা এপ্রিল রেলওয়ের বিশেষ রশিদের (মানি রিসিট) মাধ্যমে তিনি ২০ হাজার টাকা জমা দিয়ে দায়মুক্ত হন।
শ্রীপুর রেলস্টেশন মাস্টার মো. সাইদুর রহমান ২০হাজার টাকা পরিশোধের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, গত ১লা এপ্রিল তিনি স্টেশনে এসে টাকা পরিশোধ করেন। তা ৬ এপ্রিল রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয়া হয়। রেলওয়েতে এভাবে পুরনো বকেয়া বা দায়মুক্তির টাকা পরিশোধের আইনি বিধান রয়েছে। মফিজুল সাহেব এসে যখন বিষয়টি খুলে বললেন, আমরা তার মানসিকতায় মুগ্ধ হয়েছি। মানুষের সব সময় একরকম বোধোদয় থাকে না। জীবনের এক পর্যায়ে যখন তিনি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন এবং দায়মুক্ত হতে চেয়েছেন, তা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। তিনি আরো বলেন, যে সকল মানুষ বিনা টিকেটে ভ্রমণ করেন তাদের জন্য মফিজ সাহেবের এ কাজটি বড় একটি বার্তা। কেউ যদি এমন অনুশোচনা থেকে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে টাকা জমা দিতে চান, তাহলে যেকোন রেল স্টেশনে গিয়ে জমা দিতে পারবেন বলে তিনি জানান।
আজকালের খবর/রাশেদুল মিলন