শনিবার ১৮ এপ্রিল ২০২৬
ঈদের পূর্বেই গার্মেন্টস কর্মীদের বেতন-ভাতা নিশ্চিত করুন
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১১:১৪ পিএম   (ভিজিট : ৮২৫)
ঈদের চাঁদ যখন আকাশে ওঠে, তখন এটি কেবল একটি মাসের সমাপ্তি ঘোষণা করে না—এটি নতুন আশার আলো জ্বালায়। শহরের ব্যস্ত রাস্তায়, গ্রামবাংলার মেঠোপথে, বাজারের ভিড়ে, স্টেশন আর লঞ্চঘাটে—সবখানেই এক অদৃশ্য আনন্দের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে। শিশুরা নতুন জামার স্বপ্ন দেখে, মায়েরা রান্নাঘরের হিসাব কষেন, বাবারা দূর শহর থেকে বাড়ি ফেরার পরিকল্পনা করেন। 

কিন্তু এই উৎসবের উচ্ছ্বাসের ভেতরেও একদল মানুষ নীরবে অপেক্ষায় থাকেন—তারা হলেন আমাদের গার্মেন্টস কর্মীরা। তাদের ঈদের আনন্দ নির্ভর করে একটি নির্দিষ্ট দিনে বেতন ও বোনাস হাতে পাওয়ার ওপর। সেই টাকা না এলে উৎসবের আলো নিভে যায়, হাসির জায়গায় ভর করে দুশ্চিন্তা।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প আমাদের অর্থনীতির প্রাণভোমরা। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস, লাখো পরিবারের জীবিকার ভিত্তি। এই শিল্পের প্রতিনিধিত্ব করে Bangladesh Garment Manufacturers and Exporters Association (বিজিএমইএ)। কিন্তু প্রতি বছর ঈদের প্রাক্কালে আমরা একটি পুনরাবৃত্ত দৃশ্য দেখি—বেতন-ভাতা ও ঈদ বোনাস ঘিরে অনিশ্চয়তা, কোথাও উত্তেজনা, কোথাও বিক্ষোভ। আনন্দের সময়ে কেন এই উদ্বেগ? কেন শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে?

সম্প্রতি বিজিএমইএর নেতারা বাংলাদেশ ব্যাংক এর গভর্নরের কাছে ঈদের আগে দুই মাসের সমপরিমাণ অর্থ সহজ শর্তে ঋণ হিসেবে চেয়ে চিঠি দিয়েছেন। সংগঠনের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি  বৈঠকে জানান, মাসিক বেতন-ভাতা বাবদ প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হয়; ঈদের আগে সেই অঙ্ক দাঁড়ায় ১৩–১৪ হাজার কোটি। 

রপ্তানি কমে যাওয়া, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম হ্রাস, ক্রয়াদেশ পিছিয়ে যাওয়া এবং ব্যয় বৃদ্ধি—এসব কারণ দেখিয়ে তারা তারল্যসংকটের কথা বলেছেন।

শিল্পের বাস্তব চ্যালেঞ্জ যে নেই, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু ঈদ তো অপ্রত্যাশিত কোনো ঘটনা নয়। এটি প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময়ে আসে। তাহলে কেন প্রতি বছরই বেতন-ভাতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়? কেন শ্রমিকদের প্রাপ্য নিশ্চিত করতে শেষ মুহূর্তে ব্যাংকের দ্বারস্থ হতে হয়? 
এই প্রশ্ন কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং এটি নৈতিকতার সবচেয়ে বড়  প্রশ্ন। 

সমাজে একটি তীব্র বৈপরীত্য চোখে পড়ে। গার্মেন্টস মালিকদের একটি অংশ বিলাসবহুল জীবনযাপন করেন—দামী গাড়ি, অভিজাত বাড়ি, বিদেশ ভ্রমণ, বিদেশে চিকিৎসা। অর্থ পাচার,ব্যাংকঋণ খেলাপি বা অনিয়মের অভিযোগও মাঝেমধ্যেই শোনা যায়। তবে সব মালিক এক নন; অনেকেই দায়িত্বশীল ও মানবিক। কিন্তু যখন শ্রমিকের ঈদ নির্ভর করে অনিশ্চিত বেতনের ওপর, তখন এই বৈষম্য প্রশ্ন তোলে—অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রকৃত ভাগীদার কে?

ঈদের আগে বেতন না পেলে একজন শ্রমিকের সংসারে কী ঘটে, তা আমরা কল্পনাও করি না। সন্তানের নতুন জামা কেনা হয়তো পিছিয়ে যায়, গ্রামে যাওয়ার ভাড়া জোগাড় করতে হয় ধার করে, সংসারের বকেয়া মেটাতে হয় কষ্টে। সেই দুশ্চিন্তা জমতে জমতে একসময় তা ক্ষোভে রূপ নেয়। শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি হলে ক্ষতি হয় সবার—মালিকের, শ্রমিকের, এমনকি দেশেরও।

রাষ্ট্রের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিসহায়তা দিতে পারে, প্রণোদনা ছাড় করতে পারে, ঋণের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু সেই সহায়তা যেন সাময়িক সমাধান হয়ে না থাকে; বরং শিল্পে আর্থিক শৃঙ্খলা ও আগাম পরিকল্পনার সংস্কৃতি গড়ে তোলে।
 
ঈদের মতো পূর্বানুমেয় ব্যয়ের জন্য বছরের শুরু থেকেই সংরক্ষণ রাখা কি অসম্ভব? লাভের একটি অংশ কি বিশেষ তহবিলে রাখা যায় না, যাতে শ্রমিকের বেতন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি না হয়?

এখানে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা জরুরি—ঈদের আগে বেতন দেওয়া কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি শ্রমিকের অধিকার। শ্রমিক তার শ্রম দিয়েছেন, উৎপাদন বাড়িয়েছেন, রপ্তানি আয় নিশ্চিত করেছেন। সেই শ্রমের ন্যায্য মূল্য সময়মতো পরিশোধ করা হবে—এটাই স্বাভাবিক। যদি একটি শিল্প খাত বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা লেনদেন করতে পারে, তবে ঈদের মতো নির্ধারিত সময়ের ব্যয়ের জন্য পরিকল্পনা করতে না পারা অজুহাত হতে পারে না।

প্রতিবার যদি একই চিত্র দেখা যায়—ঈদের আগে ঋণের আবেদন, বেতন নিয়ে অনিশ্চয়তা, শ্রম অস্থিরতার আশঙ্কা—তবে বুঝতে হবে সমস্যা সাময়িক নয়, কাঠামোগত।

শিল্পের টেকসই ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ হিসাবব্যবস্থা, দায়িত্বশীল আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহি। সরকারের সহায়তা অবশ্যই দরকার হতে পারে, কিন্তু সেটি যেন শর্তহীন নির্ভরতার সংস্কৃতি তৈরি না করে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, গার্মেন্টস শিল্প শুধু কারখানার দেয়ালের ভেতরের উৎপাদন নয়; এটি লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনসংগ্রামের গল্প। সেই গল্পে যদি ঈদের আগে অনিশ্চয়তার ছায়া পড়ে, তবে তা কেবল অর্থনীতির ব্যর্থতা নয়, নৈতিক ব্যর্থতাও।

গার্মেন্টস শিল্প আমাদের জাতীয় গর্ব। এই শিল্প বিশ্ববাজারে টিকে আছে শ্রমিকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে। তাই তাদের ন্যায্য পাওনা সময়মতো পরিশোধ করা কেবল আইনি বাধ্যবাধকতা নয়; এটি মানবিক দায়িত্ব। ঈদের আনন্দ সবার ঘরে পৌঁছাতে হবে—শুধু মালিকের প্রাসাদে নয়, শ্রমিকের ছোট্ট ঘরেও।

সুতরাং প্রয়োজন দায়িত্বশীলতা, স্বচ্ছতা এবং ন্যায়ভিত্তিক সিদ্ধান্তের। ঈদ যেন উদ্বেগের কারণ না হয়ে ওঠে। যে শ্রমিক সারা বছর দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরান, তাঁর মুখে হাসি ফুটানোই হোক আমাদের প্রথম অঙ্গীকার। 

লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট  ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক,ঢাকা।

আজকালের খবর/ এমকে









Advertisement
সর্বশেষ সংবাদ
বৈরি আবহাওয়ায় বিপর্যস্ত বাংলাদেশের কৃষি
মালয়েশিয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশির মৃত্যু
সাংবাদিকদের অবসর ভাতা বাস্তবায়নে কাজ করছে সরকার: তথ্যমন্ত্রী
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
মিরপুরে কিউইদের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডে শুক্রবার
জ্বালানি সংকটে কুমিল্লা অচল: ৮১টির মধ্যে ৪৯ ফিলিং স্টেশন বন্ধ
নরসিংদীতে তিন দিনব্যাপী জাতীয় বিজ্ঞান মেলার উদ্বোধন
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor@gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor@gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft