পবিত্র রমজান উপলক্ষে এবার পর্যাপ্ত আমদানি হয়েছে। সরবরাহও স্বাভাবিক। পাইকারি বাজারে পণ্য ঠাসা। তারপরও খুচরা বাজারে আগুন। রমজানের শুরুতেই প্রায় সব ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। শাক-সবজি, মাছ-মাংসের দামও চড়া। রোজাদারদের জন্য প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
অভিযোগ উঠেছে—সরকারি সংস্থার কার্যকর তদারকির অভাবে সিন্ডিকেটের কারসাজির কারণে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। প্রশ্ন হচ্ছে, যখন সরবরাহে ঘাটতি নেই, তখন এই মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা কোথায়? আর ব্যবসায়ীরা এ বিষয়ে কোনো নীরব?
ফ্যাসিবাদি আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দেশের ভোগ্যপণ্যের আমদানি একটি সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে ছিল—ঘুরে ফিরে তারাই আমদানি করত। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেই সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া হয়। এখন আমদানিকারকের সংখ্যা বেড়েছে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের রেকর্ড বলছে—গতবারের মতো এবারও রমজানের ভোগ্যপণ্য চাহিদার চেয়ে বেশি আমদানি হয়েছে। দেশের অন্যতম পাইকারি বাজার চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ ও আছদগঞ্জে সরবরাহ পর্যাপ্ত। প্রতিটি আড়ত পণ্যে ঠাসা। নগরীর বড় বড় বাজারেও পণ্যের অভাব নেই।
এবার চিনি আমদানি হয়েছে ৪ লাখ ৭৩ হাজার টন—গত বছরের তুলনায় ৩৯ শতাংশ বেশি।
মসুর ডাল আমদানি হয়েছে ২ লাখ ২৯ হাজার টন।
ছোলা আমদানি হয়েছে চাহিদার তুলনায় ২৮ দশমিক ২৯ শতাংশ বেশি। খেজুর, পেঁয়াজ, রসুন, ভোজ্যতেল, বেসনের আমদানিও গতবারের তুলনায় বেড়েছে কয়েকগুণ।
তারপরও খেজুর, ছোলা, ডাল, চিনি, পেঁয়াজে খুচরা পর্যায়ে দাম বেড়েছে বেশুমার। এক সপ্তাহের ব্যবধানে পেঁয়াজ, মসুর ডাল, খেজুর, বেগুনসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে।
যখন আমদানি বেশি এবং সরবরাহ দৃশ্যমান, তখন মূল্যবৃদ্ধির কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
ব্যবসায়ীদের একটি অংশ বলছেন—বন্দরে পণ্য খালাসে ধীরগতির কারণে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তাই দাম বেড়েছে। কিন্তু পাইকারি বাজারে পণ্য মজুদ থাকার পরও খুচরা বাজারে ‘সরবরাহ কম’ যুক্তি কতটা গ্রহণযোগ্য?
অভিযোগ আছে যে পণ্য খালাসে ধীরগতি দেখিয়ে বাজারে ঘাটতির ধারণা তৈরি করা হয়। এই মনস্তাত্ত্বিক সংকটের সুযোগে দাম বাড়ানো হয়। ফলে বাজারে কৃত্রিম চাপ সৃষ্টি হয়, যার বোঝা বহন করেন সাধারণ ক্রেতা।
সিন্ডিকেট কোনো গুজব নয় বরং এটি অর্থনীতির একটি সুপরিচিত ধারণা। যখন কয়েকটি প্রভাবশালী আমদানিকারক বা সরবরাহকারী সমন্বিতভাবে সরবরাহ সীমিত করেন, তখন বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়।
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে এ কৌশল বিশেষভাবে কার্যকর। অভিযোগ রয়েছে—কখনও আমদানিকৃত পণ্য বন্দরে এসে পৌঁছালেও ইচ্ছাকৃতভাবে খালাস বিলম্বিত করা হয়; কখনও জাহাজেই মাল রেখে দেওয়া হয়, কখনও গুদামে আটকে রাখা হয়। সরবরাহ কম দেখিয়ে বাজারে আতঙ্ক তৈরি করা হয়, এরপর উচ্চমূল্যে পণ্য ছাড়া হয়।
অর্থনীতিতে একে বলা হয় ‘withholding supply strategy’। উন্নত বিশ্বে এ ধরনের আচরণ প্রতিযোগিতা আইনে দণ্ডনীয়। যুক্তরাষ্ট্রে Federal Trade Commission এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে European Commission প্রতিযোগিতা কমিশনের মাধ্যমে কার্টেল বা সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়।
আমাদের দেশে অভিযোগ থাকলেও তদন্ত ও শাস্তির প্রক্রিয়া দীর্ঘ এবং প্রায়শই অকার্যকর। ফলে বাজারে একটি অদৃশ্য ক্ষমতাকাঠামো গড়ে ওঠে, যা নীরবতার সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করে।
দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ চাঁদাবাজি। পরিবহন, পাইকারি বাজার, গুদাম—প্রতিটি স্তরে অনানুষ্ঠানিক অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। একটি ট্রাক বন্দর থেকে রাজধানীতে পণ্য আনতে গিয়ে পথে পথে অনানুষ্ঠানিক খরচ যোগ হলে তা শেষ পর্যন্ত খুচরা দামের সঙ্গে যুক্ত হয়।
অর্থনীতির ভাষায় এটি ‘transaction cost distortion’—লেনদেন ব্যয়ের বিকৃতি। এই ব্যয় উৎপাদনশীলতা বাড়ায় না, বরং বাজারকে অদক্ষ করে তোলে।
কিন্তু ব্যবসায়ীরা কেন এ নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেন না? কারণ এতে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থ জড়িত থাকতে পারে। ফলে নীরবতাই হয়ে ওঠে নিরাপদ পথ।
অন্যদিকে ক্রেতারা বলছেন—রমজানে ইফতারের জন্য প্রয়োজনীয় খিরা, শসা, গাজর, বেগুন, লেবু, পুদিনা পাতার দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
এসব পণ্যের বেশিরভাগই দেশীয় উৎপাদিত। তাহলে সরবরাহ সংকটের যুক্তি কতটা বাস্তব?
যদি উৎপাদন খরচ বা খাদ্যের দাম হঠাৎ বেড়ে যেত, তাহলে অন্যের দামে তার প্রভাব পড়ার কথা ছিল। কিন্তু এখানে দেখা যাচ্ছে—নির্দিষ্ট পণ্যে দ্রুত মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে।
সুতরাং প্রাসঙ্গিকভাবেই প্রশ্ন তোলা যায় যে তাহলে ব্যবসায়ীরা নীরব কেন? এর পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে বলে ধারণা করা যায় যেমন-
১. সিন্ডিকেটের প্রভাব – আমদানিকারক সংখ্যা বাড়লেও পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ রয়ে গেলে প্রকাশ্যে কথা বলা ঝুঁকিপূর্ণ।
২. তদারকির ঘাটতি – কার্যকর নজরদারি না থাকলে বাজার নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়, আর নীরবতা নিরাপদ পথ হয়ে ওঠে।
৩. রমজানের মনস্তত্ত্ব – চাহিদা বাড়বে জেনেই দাম বাড়ানো সহজ; ক্রেতারা বিকল্প খুঁজে পান না।
৪. দায় এড়ানোর প্রবণতা – বিক্রেতারা বলেন সরবরাহ কম, আমদানিকারক বলেন খালাসে ধীরগতি—দায় একে অপরের ওপর চাপানো হয়।
ফলে প্রকৃত চিত্র সামনে আসে না।
এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য কিছু পদক্ষেপ নেয়া জরুরি যেমন-
১. আমদানি ও মজুদের তথ্য উন্মুক্ত করা – প্রতিদিনের সরবরাহ তথ্য প্রকাশ করা হলে কৃত্রিম সংকটের সুযোগ কমবে।
২. বন্দরে দ্রুত খালাস নিশ্চিত করা – ইচ্ছাকৃত বিলম্ব রোধে কঠোর নজরদারি।
৩. পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে সমন্বিত তদারকি – শুধু অভিযান নয়, ধারাবাহিক মনিটরিং।
৪. মূল্যতালিকা বাধ্যতামূলক ও ডিজিটাল ট্র্যাকিং – বাজারে স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে।
৫. প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা – আমদানিকারক বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতা কার্যকর করতে হবে।
বাজারে যদি সহমর্মিতার বদলে সুযোগসন্ধানী আচরণ প্রাধান্য পায়, তাহলে তা শুধু অর্থনীতির সমস্যা নয়—এটি নৈতিকতারও সংকট। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি যদি কেবল বৈশ্বিক প্রভাবের ফল হতো, তবে সেটি মোকাবিলা করা তুলনামূলক সহজ হতো। কিন্তু যখন এর সঙ্গে যুক্ত হয় সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজির মতো অভ্যন্তরীণ ব্যাধি, তখন সংকট গভীর হয়।
বাজার কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এটি জনগণের সম্মিলিত জীবনযাত্রার অংশ। ব্যবসা মুনাফাভিত্তিক হবে—এটি স্বাভাবিক। কিন্তু কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে মুনাফা অর্জন নৈতিক ও সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য।
সুতরাং সময় এসেছে নীরবতা ভাঙার। অন্যথায় দ্রব্যমূল্যের আগুনে সাধারণ মানুষের পকেট পুড়তেই থাকবে।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com
আজকালের খবর/ এমকে