মো. আলী হোসেন খান, জগন্নাথপুর

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সুনামগঞ্জের প্রবাসী অধ্যুষিত গুরুত্বপূর্ণ আসন সুনামগঞ্জ ৩ ঘিরে জমে উঠেছে রাজনৈতিক মাঠ। বিএনপি,এবি পার্টি ও খেলাফত মজলিস এই তিন দলের প্রার্থীরা নিয়মিত গণসংযোগ, উঠান বৈঠক ও মতবিনিময় সভার মাধ্যমে ভোটারদের কাছে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছেন। প্রতীক বরাদ্দের আগেই এলাকাজুড়ে প্রচার তৎপরতা তুঙ্গে উঠেছে। কে জিতবে এই আসনে—ধানের শীষ, ঈগল পাকি, নাকি ফুটবল—তা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা।
জগন্নাথপুর- শান্তিগঞ্জ নিয়ে গঠিত সুনামগঞ্জ -৩ আসন। জগন্নাথপুর শান্তিগঞ্জ এলাকা নিয়ে এই আসনটি সুনামগঞ্জের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। এখানে শ্রমজীবী মানুষ, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাস বেশি। দীর্ঘদিন ধরে, বন্যা, জলাবদ্ধতা, ভাঙা সড়ক, মাদক ও মশার উপদ্রব এই এলাকার প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত।
এই আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন কয়ছর এম আহমদ । তিনি যুক্তরাজ্য বিএনপির তিনবারের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কেন্দ্রীয় বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য কয়ছর এম আহমদ। প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন তিনি।
রাজনৈতিক পরিচিতির পাশাপাশি নিজ দলের সাংগঠনিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ভোটের মাঠে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন কয়ছর এম আহমদ ।
তফসিল ঘোষণার আগেই তিনি নিয়মিত বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। দোয়া মাহফিল, মতবিনিময় সভা ও গণসংযোগের মাধ্যমে এলাকার মানুষের সমস্যা শুনছেন এবং সমাধানের আশ্বাস দিচ্ছেন। স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের দাবি, এই আসনে বিএনপির ভোটব্যাংক শক্তিশালী। পাশাপাশি নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কিছু ভোটও ধানের শীষের দিকে ঝুঁকতে পারে বলে তারা আশা করছেন।
কয়ছর এম আহমদ বলেন, সুনামগঞ্জ -৩ আসনের মানুষ শান্তি ও নিরাপদ জীবন চায়। তিনি রাস্তা-ঘাট উন্নয়ন, ড্রেনেজ ব্যবস্থা সংস্কার, জলাবদ্ধতা,বন্যা নিরসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেবেন বলে জানিয়েছেন। বিএনপি ঘোষিত রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফার আলোকে এলাকার উন্নয়নে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। তার বিশ্বাস, জনগণ সুযোগ দিলে তিনি সর্বোচ্চটা দিয়ে এই এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারবেন।
আমার বাংলাদেশ (এবিপার্টি)ঈগল প্রতীক নিয়ে লড়ছেন সৈয়দ তালহা আলম ।
তিনি ওয়াক্কস গ্রুপের জমিয়ত ছেড়ে আমার দেশ পার্টিতে যোগ দেন, পেশায় একজন ব্যবসায়ী হলেও দীর্ঘদিন ধরে সাংগঠনিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। সূত্রে জানায়, সুনামগঞ্জ ৩ আসনে এবি পার্টি নয় সৈয়দ তালহা আলম ব্যক্তি হিসাবে সাংগঠনিক ভিত্তি তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। এই এলাকায় সক্রিয়ভাবে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে আসছে সৈয়দ তালহা আলম নিয়মিত মাঠে নেমে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলছেন। তার দাবি, নারী-পুরুষ, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার কাছ থেকেই ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছেন । তিনি বলেন, মানুষ পরিবর্তন চায় এবং এবার ঈগলের পক্ষে ভোট দিতে আগ্রহী।
সৈয়দ তালহা আলম আরও বলেন, শান্তিগঞ্জ জগন্নাথপুর এই দুই উপজেলার প্রতিটি এলাকা আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এখানে তাদের বড় একটি ভোটব্যাংক রয়েছে। তিনি আশাবাদী, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে এই আসনে এবিপার্টি ভালো ফল করবে।
অন্যদিকে বিএনপির বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেন তালা প্রতীক নিয়ে মাঠে শক্ত অবস্থানে আছেন।
ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেন বলেন, এবার সব জায়গায় তালা প্রতীকের রব উঠেছে। মানুষ ধান, নৌকা, লাঙ্গলসহ বিভিন্ন প্রতীকের রাজনীতি দেখেছে। এবার তারা এই আসনে বিকল্প চায়। ইনসাফভিত্তিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে তালা প্রীতিকে কাজ করছে বলে তিনি দাবি করেন।
নির্বাচিত হলে মাদক, গ্যাস সংকট, মশা ও জলাবদ্ধতার মতো সমস্যাগুলো নিরসনে কাজ করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
এদিকে তলে তলে মাঠ চসে বেড়াচ্ছেন জামায়াত ইসলামীর ১০ দলীয় জোটের খেলাফত মজলিসের রিকশা প্রতীকে সাবেক সংসদ সদস্য এডভোকেট শাহিনুর পাশা চৌধুরী। সাবেক সংসদ সদস্য আইনজীবী শাহীনূর পাশা চৌধুরী গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর তৃণমূল বিএনপি ছেড়ে খেলাফত মজলিসে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি ওই দলের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির। এর আগে তিনি প্রায় তিন দশক জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ওই দলে তাঁর সর্বশেষ পদ ছিল কেন্দ্রীয় সহসভাপতি।
শাহীনূর পাশা চৌধুরী গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই আসনে তৃণমূল বিএনপির প্রার্থী হিসেবে অংশ নেন। এর আগে ২০০১ সাল থেকে অনুষ্ঠিত পাঁচটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন। একবার সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হন।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তোড়জোড় শুরু হলে ২০২৩ সালের ২৩ নভেম্বর গণভবনে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি শাহীনূর পাশা চৌধুরী। সঙ্গে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের আরও কয়েকজন নেতা ছিলেন। শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করার পর দিনে দলীয় পদ স্থগিত করে তাঁর দল। ওই দিনই জমিয়ত থেকে পদত্যাগ করে তৃণমূল বিএনপিতে যোগ দেন তিনি। এরপর ‘নিশ্চিত পাস’ ঘোষণা দিয়ে তৃণমূল বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে ‘ধরা খান’। জামানত যায় তাঁর। তবে ২০০৫ সালে এই আসনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য দলের কেন্দ্রীয় নেতা আবদুস সামাদ আজাদের মৃত্যুর পর উপনির্বাচনে শাহীনূর পাশা চৌধুরী চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
শাহীনূর পাশা চৌধুরী বলেন বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমি অনেকটা বাধ্য হয়ে সরকারের ছাপে প্রার্থী হয়েছিলাম। আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে আমি সক্রিয় ভূমিকা পালন করে জেল–জুলুম ও নির্যাতন সহ্য করেছি। অনেকে আমাকে ভুল বুঝে আওয়ামী লীগের দোসর বলে অপপ্রচার চালান। আমি আওয়ামী লীগের দোসর নই, আওয়ামী লীগের যম। আওয়ামী লীগের আমলে আমাকে পুলিশ ইতিকাফ থেকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করে। তরুণ ভোটার, যা এই আসনের নির্বাচনী সমীকরণে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
স্থানীয় ভোটাররা বলছেন, তারা সৎ, যোগ্য ও কর্মক্ষম জনপ্রতিনিধি চান। দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে যিনি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা দেখাতে পারবেন, তাকেই ভোট দেওয়ার কথা ভাবছেন তারা। শান্তি, নিরাপত্তা ও দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশই তাদের প্রধান চাওয়া।
এই নির্বাচনে সুনামগঞ্জ-৩ আসনে ৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বীতা করবেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদ ধানের শীষ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস মনোনীত প্রার্থী মোহাম্মদ শাহীনূর পাশা চৌধুরী রিক্সা, স্বতন্ত্র (মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে বিএনপি বিদ্রোহী) মো. আনোয়ার হোসেন তালা, স্বতন্ত্র মোঃ মাহফুজুর রহমান খালেদ (তুষার) টেবিল ঘড়ি, খেলাফত মজলিস মনোনীত প্রার্থী শেখ মুশতাক আহমদ দেওয়াল ঘড়ি, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) মনোনীত প্রার্থী সৈয়দ তালহা আলম ঈগল ও স্বতন্ত্র হুসাইন আহমেদ ফুটবল প্রতীক পেয়েছেন।
এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা
৩,৪৪,৬৫৩ জন। পুরুষ ভোটার ১,৭৩,৭২৮ জন।নারী ভোটার ১,৭০,৯২১ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৪ জন।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে ভোটগ্রহণ। আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হয়েছে ২২ জানুয়ারি থেকে। এখন দেখার বিষয়, শেষ পর্যন্ত সুনামগঞ্জ -৩ আসনে ভোটারদের মন জয় করতে পারে কে—ধানের শীষ, ঈগল নাকি, তালা।
আজকালের খবর/বিএস