‘এই যে দুনিয়া কিসেরও লাগিয়া’ অথবা ‘শুয়াচান পাখি আমি ডাকিতেছি তুমি ঘুমাইছো নাকি’র মতো আরো অনেক জনপ্রিয় গান লুট হয়ে গেছে বাউল কবি রশিদ উদ্দিনের। আর তার গানের লুটের কাহিনী নিয়ে কপালভাঁজ করা প্রশ্নে শেকড়সন্ধানী প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন লেখক, পর্যটক, নাট্যকার, পরিচালক ও স্থপতি শাকুর মজিদ।
আগামী ২১ জানুয়ারি রশিদ উদ্দিনের ১৩৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ১৬ জানুয়ারি সন্ধ্যায় ‘ভাটিবাংলার অধিরাজ’ নামে এ প্রামাণ্যচিত্রের উদ্বোধনী প্রদর্শনী হয় বনানীর ভিউ ফাইন্ডার কার্যালয়ে। এই বাউলকে তার গানের অধিকার ফিরিয়ে দিতেই তার এ প্রামাণ্যচিত্র, এমনটিই বলেছেন নির্মাতা।
বাংলার লোকসংগীতের ইতিহাসে এমন অনেক গান আছে, যেগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম গেয়ে এসেছে মানুষ; কিন্তু যারা এসব গানের প্রকৃত কারিগর, তাদের নাম থেকে গেছে অন্তরালে। দীর্ঘদিনের সেই অন্যায্য ও ভুল ইতিহাসের অনুসন্ধানেই নির্মিত হয়েছে শাকুর মজিদের প্রামাণ্যচিত্র ‘ভাটিবাংলার অধিরাজ: বাউলকবি রশিদ উদ্দিনের অধিকারহীনতার সন্ধানে’। ভাটিবাংলার লোকসংগীতের এক বিস্মৃতপ্রায় সাধক বাউল কবি রশিদ উদ্দিন। ১৮৮৯ সালের ২১ জানুয়ারি নেত্রকোণার বাহিরচাপড়া গ্রামে জন্ম নেওয়া এই সাধক ছিলেন ভাটিবাংলার বহু কিংবদন্তি বাউলের ওস্তাদ। শাহ আব্দুল করিম, উকীল মুন্সি, জালাল খাঁ-এমন অনেক বিখ্যাত শিল্পী ছিলেন তার প্রত্যক্ষ শিষ্য। অথচ কালের প্রবাহে এই সাধকের নাম ও অবদান রয়ে গেছে ইতিহাসের আড়ালে অগোচরেই। প্রামাণ্যচিত্রে অধিকারবঞ্চিত রশিদ উদ্দিনের পরিবারের বেদনার কথা তুলে ধরার প্রয়াস চালিয়েছেন তার তথ্যনির্ভরতার মধ্য দিয়ে।
ভাটিবাংলার অধিরাজ: বাউল কবি রশিদ উদ্দিনের ওপর নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র নিয়ে মতামত প্রকাশ করেছেন লেখক সাংবাদিক ইশতিয়াক রেজা।
তথ্যচিত্র সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর বাহিরচাপড়া গ্রামে বাউল রশিদ উদ্দিনের বাড়িতে গিয়ে তার হাতে লেখা পুরনো পাণ্ডুলিপি দেখার সুযোগ হয় নির্মাতা শাকুর মজিদের। সে সময় উত্তরাধিকারীরা জানান, রশিদ উদ্দিনের বহু গান বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তি নিয়ে গিয়ে নাম বদলে নিজেদের নামে প্রচার করেছেন। ফলে বহু জনপ্রিয় লোকগানের প্রকৃত রচয়িতা আজও সাধারণ মানুষের কাছে অজানা রয়ে গেছে। প্রামাণ্যচিত্রটি রশিদ উদ্দিনের জীবন, সাধনা, শিষ্য-পরম্পরা, হারিয়ে যাওয়া পাণ্ডুলিপি, গান বিকৃতি, ভ্রান্ত ক্রেডিট এবং উত্তরাধিকারীদের সংগ্রামের কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে তথ্যভিত্তিক ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে।
এই প্রামাণ্যচিত্র শুধু একজন সাধকের জীবনকথা নয়, এটি বাংলার লোকসংস্কৃতিতে স্রষ্টার অধিকার, স্মৃতি ও ন্যায্য স্বীকৃতির প্রশ্ন তুলে ধরে। নির্মাতা শাকুর মজিদ বলেন,‘যার গানে গড়ে উঠেছে প্রজন্মের পর প্রজন্মের ভাবজগৎ, সেই মানুষটি আজ ইতিহাসের আড়ালে। তাকে তার প্রাপ্য সম্মান ফিরিয়ে দেওয়াই এই প্রাণ্যচিত্রের মূল উদ্দেশ্য।’
এই তথ্যচিত্রে প্রমাণসহ তুলে ধরা হয়েছে বাংলা লোকসংগীতের একাধিক কালজয়ী গান, যেমন ‘এই যে দুনিয়া কিসেরও লাগিয়া’, ‘শুয়া চান পাখি’, ‘দেখবে কী শুনবে কী ওরে ও মন ধুন্দা’, ‘মা গো মা ঝি গো ঝি’ এসব গানের প্রকৃত রচয়িতা বাউলকবি রশিদ উদ্দিন। অথচ এসব গান আজও অন্যদের রচনা হিসেবে গণমাধ্যম ও প্রচলিত ধারায় চালু রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে প্রদর্শনীতে উপস্থিত সাংবাদিক ও লেখক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা বলেন, ‘এই প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের মধ্য দিয়ে শাকুর মজিদ ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছেন। এখন আমাদের গণমাধ্যমের দায়িত্ব এটি প্রচার করে প্রচলিত ভুলগুলো সংশোধন করা।’
ভাটিবাংলার অধিরাজ: বাউল কবি রশিদ উদ্দিনের ওপর নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র নিয়ে বলছেন শাবিপ্রবির নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এ কে এম মাজহারুল ইসলাম।
গবেষক ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এ কে এম মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘তথ্যচিত্রটি সরকারি উদ্যোগে সারা দেশে দেখানো উচিত। তাহলে আমরা এমন একজন বড় সাধকের পুনর্জন্ম প্রত্যক্ষ করতে পারব।’
প্রকৌশলী শাহাদাত খানের মতে, ‘এই তথ্যচিত্র শুধু দর্শকের মন জয় করবে না, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিও আকর্ষণ করবে। এর মাধ্যমে রশিদ উদ্দিনের সৃষ্টিকর্মের সঠিক স্বীকৃতি ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হলো। একই সঙ্গে বাংলার সমৃদ্ধ লোকসাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সঠিক তথ্যসহ সংরক্ষণের পথও উন্মোচিত হবে।’
উদ্বোধনী প্রদর্শনীতে সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মী, গবেষকসহ সবার উপস্থিতি এই উদ্যোগকে আরও অর্থবহ করবে বলে আয়োজকদের বিশ্বাস।