আজ ৬ জানুয়ারি ইন্ডাস্ট্রির ‘ফার্স্ট লেডি’ সুমিতা দেবীর মৃত্যুবাষিকী। ২০০৪ সালের এই দিনে তিনি না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। সুমিতা দেবী কেবল একজন অভিনয় শিল্পী ছিলেন না, সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র গবেষক মাহফুজুর রহমান তাকে ‘বীরমুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে জীবনের অনেক না জানা বাঁক তুলে ধরেছেন তার বিশ্লেষনাত্মক লিখনিতে। পাশাপাশি সদ্য প্রয়াত বরেণ্য চিত্রগ্রাহক আব্দুল লতিফ বাচ্চুর ক্যামেরাম্যান হয়ে ওঠার নেপথ্যে একজন ‘প্রযোজক’ সুমিতা দেবী কতটুকু ভূমিকা রেখেছিলেন সুন্দর বিশ্লেষণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্টও করেন। আজকালের খবর তা অবিকৃত অবস্থায় পাঠকদের জন্য প্রকাশ করে।
লেখার শুরুতেই মাহফুজ দর্শক-শ্রোতা ও চলচ্চিত্র সাংবাদিকদের প্রতি প্রশ্ন ছুঁড়ে লিখেন - সুমিতা দেবীকে দর্শকরা চেনেন একজন শক্তিমান চলচ্চিত্র অভিনেত্রী হিসেবে। কিন্তু তিনি যে আমাদের সিনেমার ইতিহাসেরও একটি শক্তিশালী চরিত্র, তা কি তারা জানেন?
সেলুলয়েডের প্রাথমিক যুগের জনপ্রিয় নায়িকা হিসেবে তার ভূমিকাকে বাদ দেয়া যাক। জহির রায়হানের স্ত্রী পরিচয়ও যদি তার না থাকে, তবুও সুমিতার অন্য ভূমিকা তাকে অনন্য করে রাখবে।
আর তার সেই পরিচয়টি হচ্ছে, তিনি ছিলেন প্রথম নারী প্রযোজক। এই ভূমিকায়ও তিনি পর্দার মতোই সফল ও সাহসী।
‘বেহুলা’ ও ‘আনোয়ারা’ নির্মাণের পর জহির রায়হান চেয়েছিলেন সুচন্দাই হবেন ‘আগুন নিয়ে খেলা’র নায়িকা। কিন্তু সুমিতা তার প্রথম প্রযোজনায় সুচন্দাকে নিতে চাননি। ‘দুই দিগন্ত’ নির্মাণের সময় তিনি সুজাতাকে কথা দিয়েছিলেন। সুমিতা ছবি প্রযোজনা করলে রুপবান-কন্যাকেই নেবেন। জহির রায়হান মনখারাপ করেছিলেন। কিন্তু সুমিতা তার পরোয়া করেননি।
যদিও তার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘মিতা ফিল্মস-এর নামটি এসেছে ‘সুমিতা’ থেকে। এই নামেই স্ত্রীকে ডাকতেন জহির। কিন্তু সেসব তো সুমিতার সুসময়ের কথা। ততদিনে জহির-সুচন্দার মন দেওয়া-নেওয়ার গল্প ‘মিতা’র কানেও এসে গেছে। তাই শেষ পর্যন্ত ‘আগুন নিয়ে খেলা’র নায়িকা হলেন সুজাতা, আর নায়ক যথারীতি তাদের ঘরের ছেলে, রাজ্জাক।
‘আগুন নিয়ে খেলা’ মুক্তি পায় ১৯৬৭ সালে। ছবিটির পরিচালক ছিলেন নুরুল হক বাচ্চু ও আমজাদ হোসেন। এই ছবির মধ্য দিয়ে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন সাহিত্যিক, চিত্রনাট্যকার, অভিনেতা আমজাদ হোসেন। সামনে গিয়ে প্রযোজক সুমিতা দেবী তার ব্যানার থেকে আরও প্রতিভা বিকাশের সুযোগ করে দেবেন, আসব সেই গল্পেও।
সুমিতা তার প্রডাকশন হাউজ থেকে দ্বিতীয় ছবি তৈরি করেন ’মোমের আলো’। ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৬৮ সালে। ‘মোমের আলো’র পরিচালক মোস্তফা মাহমুদ (একক পরিচালক হিসেবে প্রথম ছবি)। এই ছবিতে অভিনয় করেন তার প্রিয় অভিনেত্রী সুজাতা। তখন ফোক ছবির বাড়াবাড়ি চলছে। সুজাতার ‘রূপবান’ দিয়েই যে মাতামাতির শুরু। ‘মোমের আলো ছিল গড্ডলিকা প্রবাহ থেকে ব্যতিক্রম। সুস্থ, সুন্দর, সামাজিক ছবি র্নিমাণের কারণে প্রশংসিত হোন সুমিতা দেবী।
তার ব্যানার থেকে ১৯৬৯ সালে ‘মায়ার সংসার’ আর ১৯৭০ সালে ‘আদর্শ ছাপাখানা’ মুক্তি পায়। যথারীতি পরিচালক মোস্তফা মেহমুদ আর নায়িকা সুজাতা।
১৯৭০ সালে সুমিতা আরো একটি ছবি প্রযোজনা করেন। ছবির নাম ‘নতুন প্রভাত’। সেই ছবিতে পরিচালক হিসেবে তার পছন্দের নির্মাতা মোস্তফা মেহমুদ থাকলেও প্রথমবারের মতো সুজাতার জায়গায় আসেন নতুন মুখ। ‘নতুন প্রভাত’ ছবিতে ‘রত্না’ নামের এক তরুণীকে নায়িকা হিসেবে প্রতিভা বিকাশের সুযোগ করে দেন সুমিতা। সেই নায়িকাটি পরে গ্ল্যামার দিয়ে ঢালিউডের ঝলমলে জগতে বিপুল নামধাম কামান। এখন তাকে আমরা চিনি ‘নূতন’ নামে।
সুমিতার প্রযোজনায় পরিচালক হিসেবে মোস্তফা মেহমুদের উত্থান। সামাজিক ছবির নিপুণ নির্মাতা হিসেবে তিনি তার ছাপ রেখে গেছেন এই দেশের চলচ্চিত্রের আঙিনায়। সুমিতা প্রযোজিত প্রায় প্রতিটি ছবিরই চিত্রগ্রাহক ছিলেন সদ্যপ্রয়াত আব্দুল লতিফ বাচ্চু। তিনি প্রথম জীবনে সুমিতার ছবিগুলোতে স্বতন্ত্র চিহ্ন রেখেছেন এবং পরবর্তী জীবনে আপন উঠানে বটবৃক্ষে পরিণত হয়েছেন।
সুমিতা দেবী এভাবেই তার ‘ফার্স্ট লেডি’ তকমাটিকে সার্থক করেছেন। জহির রায়হানের মতো উদ্দীপ্ত প্রদীপের নিচে তিনি নিষ্প্রভ হয়ে হারিয়ে যাননি। সিনেমার নারীদের জন্য অতীতেও তিনি তার সংগ্রামী জীবনের জন্য অনুপ্রেরণা হয়েছেন এবং ভবিষ্যতেও একজন বলিষ্ঠ অভিনেত্রী ও সাহসী প্রযোজক হিসেবে তিনি প্রেরণার উৎসব হয়ে থাকবেন।
আজকালের খবর/আতে