শনিবার ২৯ নভেম্বর ২০২৫
ইতিহাস তার নিজস্ব গতিতে চলে, রাজনীতির ইতিহাসের ফজলুর রহমান
মোঃ আব্দুল মতিন
প্রকাশ: বুধবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২৫, ১০:৪১ পিএম
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আদালতের কাঠগড়ায় জনাব ফজলুর রহমান। বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার কৃতি সন্তান জনাব ফজলুর রহমান বীর মুক্তিযোদ্ধা, বর্তমানে বিএনপি নেতা এবং বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী।

যারা ছাত্ররাজনীতি করেন, করেছেন এবং করছেন, তাদের প্রতি আমার রয়েছে বিশেষ আগ্রহ, রয়েছে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা।

জনাব ফজলুর রহমান একসময়ের তুখোড় ছাত্রনেতা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে নিজেকে গড়ে তোলে ছাত্রলীগের নেতা হিসেবে দেশের ছাত্রসমাজের খুবই জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর তিনি এক প্রতিবাদী তরুণ, তাঁর সুদক্ষ নেতৃত্বে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সুসংগঠিত হয়। 

১৯৮১ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি হয়ে শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তিনি শেখ হাসিনার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও প্রিয়ভাজন। শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রথম কেন্দ্রীয় সম্মেলনে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন করা হয় মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন ও আ.খ.ম. জাহাঙ্গীর হোসাইনকে, সেই সম্মেলনে জনাব ফজলুর রহমান সভাপতি প্রার্থী ছিলেন। কিন্তু, নেত্রী তাঁকে সভাপতির দায়িত্ব প্রদান না করায় তিনি ক্ষুব্ধ হন। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের বিভক্ত নেতৃত্বের একটি বিদ্রোহী কমিটি ঘোষণা করা হয়,  জনাব ফজলুর রহমান সভাপতি ও জনাব বাহালুল মজনুন চুন্নু সাধারণ সম্পাদক। 

পরবর্তীতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে গিয়ে জনাব মহিউদ্দিন আহমেদ ও আব্দুর রাজ্জাক বাকশাল সংগঠন গঠন করলে বাকশালের সহযোগী ছাত্র সংগঠনের স্বীকৃতি লাভ করে ফজলু-চুন্নুর কমিটি। ছাত্র সংগঠনের নাম জাতীয় ছাত্রলীগ। অর্থাৎ জনাব ফজলুর রহমান নবরূপে বাকশালের ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্রলীগের সভাপতি। তখন তিনি বিভিন্ন সভায় বক্তব্য রাখেন, “শেখ হাসিনার সাথে গৃহবধূ হিসেবে প্রেম করা যায়, রাজনীতি করা যায় না”। কিন্তু, উদার মননের শেখ হাসিনা ১৯৮৬ সালে ফজলুর রহমানকে আওয়ামী লীগে ফিরিয়ে আনেন। ১৯৮৬ সালের ৭ মে অনুষ্ঠিতব্য তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৬৭ কিশোরগঞ্জ-৩, সদর আসনে ফজলুর রহমানকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেন। 

যদিও তিনি কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের ভোটার। তখন শেখ হাসিনা তাঁকে বলেন, ‘তুমি জাতীয় নেতা, তোমাকে বাংলাদেশের যেকোনো আসনেই নির্বাচন করতে হতে পারে’। নৌকা প্রতীক নিয়ে জনাব ফজলুর রহমান কিশোরগঞ্জ শহরে গেলেন, উত্তাল কিশোরগঞ্জ, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা ফজলুর রহমানকে কোনভাবেই গ্রহণ করবেন না। চরম বিক্ষোভের মুখে পড়লেন তিনি। করজোড় করে অনুরোধ করে বললেন, “আপনারা গ্রহণ না করলে আমি চলে যাবো, মনোনয়ন পরিবর্তন করে অন্য কাউকে দেয়ার জন্য নেত্রীকে অনুরোধ করবো, কিন্তু আমি বাকী জীবন আওয়ামী লীগের পতাকাতলে থাকতে চাই, তাই আমার দুটি কথা শান্ত হয়ে শুনুন প্লিজ”। 

নীরবতা নেমে এলো, সবাই তাঁর বক্তব‍্য শুনলেন, ধীরস্থিরভাবে আবেগের কন্ঠে ফজলুর রহমান বললেন, “আমি ঘুমিয়ে ছিলাম, ঘুমের স্বপ্নে আমার সামনে আসলেন এক দরবেশ, তাঁর এক হাতে সমাজতন্ত্রের বাণী, অপর হাতে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, আমি ঘুমের ঘোরে তাঁর পিছনে ছুটে গেলাম, বহু পথ যাওয়ার পর আমার ঘোর কেটে গেলো, দেখলাম এই ব‍্যক্তি দরবেশ নয়, আব্দুর রাজ্জাক, ছদ্মবেশী, ষড়যন্ত্রকারী, সাম্রাজ্যবাদের দালাল। আমি ফিরে এলাম। আপনারা আমাকে ক্ষমা করুন, গ্রহণ করুন।” মুহূর্তের মধ্যেই আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মন গলে গেলো, সবাই তাঁর মনোনয়ন মেনে নিলেন, নির্বাচন করলেন, ২৫,৫৩৮ ভোট পেয়ে জয়ী হলেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী পেলেন ২৩,৫৭৫ ভোট। 

বিজয়ী হয়ে শেখ হাসিনার কাছে গেলেন, তাঁর জিজ্ঞাসা, “বাকশাল করাকালীন সময়ে অনেক সময়ই আপনার বিরুদ্ধে আপত্তিকর বক্তব্য দিয়েছি, আপনি কি আমাকে মন থেকে ক্ষমা করতে পারছেন?” আবেগঘন প্রশ্নের উত্তরে শেখ হাসিনা বললেন, “তুমি বলতে পারো, কথার মাধ্যমে মানুষের মন জয় করতে পারো, এটি তোমার বিশেষত্ব, আমি তোমাকে পছন্দ করি, তোমার বিশেষত্বকে কাজে লাগাতে চাই।” খুশীমনে আওয়ামী লীগের পতাকাতলে ফজলুর রহমানের পথচলা, আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হলেন, সারাদেশ সফর করেছেন, তাঁর শ্রুতিমধুর আলোচনা ও অনলবর্ষী বক্তৃতায় আওয়ামী লীগের কর্মী সমর্থকরাই শুধু নন, সর্বস্তরের মানুষ মুগ্ধ। ১৯৯১ সালের নির্বাচনেও তিনি একই আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেলেন, কিন্তু বিএনপির প্রার্থী জনাব আতাউর রহমান খানের কাছে পরাজিত হলেন। তিনি পেলেন ৪০,২০৫ ভোট, বিএনপির প্রার্থী পেলেন ৫৭,৬৭১ ভোট। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে তিনি শেখ হাসিনাকে সাফ জানিয়ে দিলেন, এ আসনে তিনি নির্বাচন করবেন না, তাঁকে কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে মনোনয়ন দিতে হবে। শেখ হাসিনা বিস্মিত হলেন। মনোনয়ন দিলেন না। 

তিনি কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করলেন এবং  নৌকার প্রার্থী জনাব আব্দুল হামিদের কাছে পরাজিত হলেন। তারপর আর আওয়ামী লীগে থাকলেন না, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর সান্নিধ্যে গেলেন, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ করলেন। কাদের সিদ্দিকী সভাপতি, তিনি সাধারণ সম্পাদক। সেখানেও বনিবনা হলো না, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ থেকে পদত্যাগ করলেন, বিএনপিতে যোগ দিলেন। বিএনপিতেও খুব একটা সুবিধা করতে পারছেন বলে মনে হচ্ছে না। ইতিমধ্যে বিএনপি তাঁকে শোকজ করেছে, দলের সব পদ-পদবী স্থগিত করেছে।
 
আজ বিএনপি নেতা ফজলুর রহমানের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন (রাষ্ট্রপক্ষ)। আজ বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এই অভিযোগ করেন প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম। ট্রাইব্যুনাল আগামী রোববার শুনানির দিন ধার্য করেছেন।

অভিযোগে প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার বলেন, একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের টক শোতে ফজলুর রহমান বলেছেন, তিনি এই ট্রাইব্যুনাল মানেন না। টক শোর অংশ তুলে ধরে প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার বলেন, ফজলুর রহমান বলেছেন, ‘এই কোর্টের গঠনপ্রক্রিয়া বলে—এই কোর্টে বিচার হইতে পারে না। এই কোর্টে যাঁরা বিচার করতেছেন, আমার ধারণা এঁদের মধ্যে ভেতরে একটা কথা আছে’। আজ এ অভিযোগ উপস্থাপনের সময় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর সদস্য-২ বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার ও সদস্য-১ বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ উপস্থিত ছিলেন না। প্রসিকিউশনকে শোনার পর আদেশে বিচারক মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী বলেন, এটি খুবই গুরুতর অভিযোগ। এ বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে আগামী রোববার আবার শুনানি হবে। বিধিবাম!

ট্রাইব্যুনালে আদালত অবমাননার অভিযোগে এটি দ্বিতীয় অভিযোগ। এর পূর্বে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগে মামলা হয় এবং তিনি এই ট্রাইব্যুনালের রায়ে সাজাপ্রাপ্ত হন। এখন জনাব ফজলুর রহমানের ভাগ্যে শেখ হাসিনার মতোই সাজা অপেক্ষমাণ। শেখ হাসিনার বদৌলতেই তিনি সাবেক সংসদ সদস্য। আওয়ামী লীগের পতাকার নীচেই বেড়ে ওঠে কিশোরগঞ্জের ফজলুর রহমান বাংলাদেশের ফজলুর রহমান হয়েছেন। আজ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সভাপতির ভাগ্যই যদি ফজলুর রহমানকে বরণ করতে হয়, তাতে একটি কথাই মনে পড়ছে, ‘ইতিহাস তার আপন গতিতে চলে।’ 

লেখক: মোঃ আব্দুল মতিন, অ‍্যাডভোকেট।

আজকালের খবর/ এমকে








http://ajkalerkhobor.net/ad/1751440178.gif
সর্বশেষ সংবাদ
খালেদা জিয়ার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত : আযম খান
বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক নয় : মির্জা আব্বাস
উপদেষ্টা পরিষদের বিশেষ সভায় খালেদা জিয়ার জন্য দোয়া
ফরিদপুরে ১৪৪ ধারা জারি
‘শেখ হাসিনার ফাঁসি দেখা পর্যন্ত আল্লাহ যেন খালেদা জিয়াকে বাঁচিয়ে রাখেন’
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
খালেদা জিয়ার অবস্থা অত্যন্ত সংকটময়: মির্জা ফখরুল
এবার রাশিয়ান ফিল্ম উৎসবে জুলফিকার জাহেদীর অনন্য অর্জন
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মধ্যরাতে ঘর থেকে ডেকে নিয়ে যুবককে গুলি করে হত্যা
প্রথম টি-টোয়েন্টিতে ৩৯ রানে হার বাংলাদেশের
বন্যা-ভূমিধসে শ্রীলঙ্কায় নিহত ৪৪
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : হাউস নং ৩৯ (৫ম তলা), রোড নং ১৭/এ, ব্লক: ই, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ফোন: +৮৮-০২-৪৮৮১১৮৩১-৪, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor@gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor@gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft