শনিবার ২৭ জুন ২০২৬
দাবি আদায়ের এই আন্দোলনের শেষ কোথায়?
প্রকাশ: বুধবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৫, ৭:৫৩ পিএম   (ভিজিট : ১১৪৮)
গত ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। পরবর্তীতে ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী ড. মোহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। একটি ভগ্ন দেশের দায়িত্ব পায় বর্তমান সরকার। তারপর থেকে নানা সময় আন্দোলনে নামে নানা গোষ্ঠী। এর কতক অন্দোলন সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে। আবার কিছু আন্দোলন যৌক্তিক। বিগত অনেকটা সময় দাবি আদায় না হওয়ায় বাধ্য হয়ে অনেকে রাস্তায় নামেন। কিন্তু যতই প্রয়োজনীয় হোক সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়েন এসব আন্দোলনে। 

কিছুদিন আগে বাড়ি ভাড়া ভাতাসহ আরো কিছু দাবিতে রাজধানীসহ সারাদেশে আন্দোলন করেন বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারিরা। তাদের দাবি অনেকটা পূরণ হয়। শ্রেণিকক্ষে ফিরে যান সবাই। এবার পথে নামেন এবতেদায়ী মাদ্রাসার শিক্ষকরা। জানা যায়, দেশের স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসা জাতীয়করণ প্রসঙ্গে সরকারি সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন না হওয়ায় রাজপথে শিক্ষকরা। নয় মাস পার হলেও গেজেট প্রকাশ না হওয়ায় আন্দোলন চলছে তাদের। 

শিক্ষকরা বলেন, সরকারের ঘোষিত পর্যায়ক্রমে জাতীয়করণ প্রক্রিয়া দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে হাজারো শিক্ষক পরিবার নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকবেন। তারা দাবি করেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ অনেক প্রতিষ্ঠানের ফাইল যাচাই-বাছাই করে পাঠিয়েছে, তা দ্রুত অনুমোদন দিয়ে প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করতে হবে। 

বেশকিছু দিন ধরে অবস্থান ধর্মঘটে অংশ নেওয়া শিক্ষকরা বলেন, স্বীকৃতিপ্রাপ্ত অনুদানবিহীন সব স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসার এমপিও আবেদন গ্রহণের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হবে। পাশাপাশি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো প্রাক-প্রাথমিক পদ সৃষ্টি এবং এবতেদায়ী মাদ্রাসার জন্য আলাদা একটি অধিদফতর স্থাপন করারও দাবি জানান তারা।

এবতেদায়ী মাদ্রাসার শিক্ষকরা বলেন, তারা সরকারের প্রতিশ্রুতির অপেক্ষায় আছেন। তাদের ভাষ্য, বছরের পর বছর ধরে শুনছেন জাতীয়করণ হবে, কিন্তু সেই কথাগুলো কেবল কাগজে-কলমেই রয়ে গেছে। তারা জানান, সরকারের প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন ছাড়া তারা ঘরে ফিরবেন না। আন্দোলন বাস্তবায়ন কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, অবস্থান ধর্মঘট, লং মার্চ এবং ভবিষ্যতে আরও কঠোর কর্মসূচির মাধ্যমে তারা দাবি আদায়ে চাপ বজায় রাখবেন।

তাদের মতে, জাতীয়করণের এ প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়ায় দেশের স্বতন্ত্র এবতেদায়ী শিক্ষা ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়ছে। শিক্ষকরা বিনা বেতনে বছরের পর বছর শিক্ষাদান করছেন, অথচ জীবিকা নির্বাহের নিশ্চয়তা নেই। 

শিক্ষকদের ভাষায়, এটি কেবল এমপিওভুক্তির দাবি নয়, এটি তাদের বেঁচে থাকার সংগ্রাম। তাদের সন্তানদের মুখে হাসি ফোটানোর একমাত্র উপায় হলো জাতীয়করণ বাস্তবায়ন। সরকার যদি দ্রুত সিদ্ধান্ত না নেয়, তাহলে এই আন্দোলন আরো ব্যাপক আকার ধারণ করবে বলে জানান তারা। 

যতই সঠিক দাবি হোক মানুষের মাঝে প্রশ্ন জাগছে অন্তর্বর্তী সরকার কি দাবি আদায়ের সরকার? আর আরো ভয় জাগছে এবতেদায়ী মাদ্রাসার শিক্ষকদের দাবি পূরণ করে বা যেকোনো উপায়ে সুরাহা হলে তারপর আর কারা আন্দোলনে নামবেন। অতীত অভিজ্ঞতা বলে কোনো না কোনো শাখার মানুষরা রাজপথে নামবেন। আগের অভিজ্ঞতা তাই বলে। অনেকে বলেন এভাবে কি আন্দোলন চলতে থাকবে? সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কি লাঘব হবে না?

সমাজ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, বাংলাদেশে দাবি আদায়ে আন্দোলন বড় অস্ত্র। স্বাধীনতার পর থেকে দেশে অধিকার আদায়ের ইতিহাসের প্রতিটি অংশে আন্দোলনের প্রেক্ষাপট আছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে যে ধারায় আন্দোলন চলছে, তা অনেকের মধ্যেই উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের আন্দোলন শেষ না হতেই এবতেদায়ী মাদ্রাসার শিক্ষকরা আন্দোলনে নেমেছেন। রাজধানী ঢাকা এখন প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো দাবি-দাওয়ার মিছিল, অবস্থান বা মানববন্ধনের কারণে স্থবির হয়ে পড়ে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এই আন্দোলনের বহর যেন আরো বেড়েছে। প্রশ্ন উঠছেÑ কেন এই সময়ে আন্দোলনের ঢেউ এত প্রবল হচ্ছে? এর প্রভাব কী? এবং ভবিষ্যতে এ থেকে উত্তরণের পথ কী হতে পারে?

এদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রশাসনিক রূপান্তর ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বেশি আছে। এ সময় সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে সরকারি ও বেসরকারি খাতের কর্মীরা মনে করেনÑ এটাই দাবি আদায়ের উপযুক্ত সময়, কারণ সরকার পরিবর্তনের আগে বা নির্বাচনের আগে দাবিগুলো তুলে ধরলে তা বাস্তবায়নের সম্ভাবনা বেশি থাকে। ফলে বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন, শিক্ষক সমাজ, শ্রমিক ইউনিয়নÑ সবাই একে একে মাঠে নামছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আন্দোলন বেড়ে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি সুস্পষ্ট কারণ রয়েছে। প্রথমত, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ঘাটতি। অন্তর্বর্তী সরকার সাধারণত একটি অস্থায়ী প্রশাসনিক কাঠামো, যার প্রধান কাজ নির্বাচন পরিচালনা ও শাসনযন্ত্র সচল রাখা। তবে এ সময় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অনিশ্চয়তা, প্রভাব বিস্তার এবং অবস্থান দৃঢ় করার প্রতিযোগিতা থাকে। ফলে নানা পেশাজীবী গোষ্ঠী এই সুযোগকে কাজে লাগাতে চায়।

দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক চাপ। দেশে মুদ্রাস্ফীতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং বেকারত্বের কারণে মানুষ ক্রমেই আর্থিক সংকটে পড়ছে। শিক্ষক সমাজও এর বাইরে নয়। তাদের আয় ও বাজারদরের মধ্যে বৈষম্য এতটাই বেড়ে গেছে যে, বাস্তব জীবনে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। তাই আন্দোলন তাদের কাছে একমাত্র আশ্রয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তৃতীয়ত, দীর্ঘদিনের অবহেলা ও প্রশাসনিক উদাসীনতা। শিক্ষা খাতের অনেক সমস্যা বছরের পর বছর ধরে অমীমাংসিত। কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। ফলে ক্ষোভ জমে জমে এখন বিস্ফোরণ ঘটছে। চতুর্থত, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা। এখন আন্দোলন মানেই প্রচার। ফেসবুক, ইউটিউব বা সংবাদমাধ্যমে দাবিগুলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এতে আন্দোলনের পরিধি ও প্রভাব বেড়ে যায়। মানুষও সহজে একত্রিত হতে পারে।

এই ধারাবাহিক আন্দোলনগুলো নিঃসন্দেহে সমাজে কিছু ইতিবাচক বার্তা দেয়Ñ যেমন দাবি আদায়ের চেতনা, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ ইত্যাদি। তবে বাস্তবিক প্রভাবের দিক থেকে এর নেতিবাচক দিক দৃশ্যমান। প্রথমত, জনদুর্ভোগ। রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন কোনো না কোনো স্থানে সড়ক অবরোধ, অবস্থান কর্মসূচি বা মিছিল হয়। এতে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগীÑ সবাই ভোগান্তিতে পড়েন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রাফিক জ্যামে আটকে থাকতে হয়। সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ জন্ম নেয়, যা আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতির পরিবর্তে বিরূপতা সৃষ্টি করে। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক ক্ষতি। একদিনের রাজধানীর স্থবিরতা মানে কোটি কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি। যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়, ব্যবসায়িক কার্যক্রম থেমে যায়। তৃতীয়ত, শিক্ষাক্ষেত্রে অস্থিরতা। যখন শিক্ষক সমাজ আন্দোলনে নামে, তখন শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্লাস বন্ধ থাকে, পরীক্ষা স্থগিত হয়, পাঠদান ব্যাহত হয়। এতে শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমে। অন্য যেকোনো পেশার ক্ষেত্রেও সমভাবে তা খাটে। চতুর্থত, রাজনৈতিক উত্তেজনা। আন্দোলনের সুযোগে বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ নিজেদের স্বার্থে ইস্যুগুলো ব্যবহার করতে চায়। ফলে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনও কখনো কখনো সহিংসতায় রূপ নেয়।

বোদ্ধা মহল মনে করেন, শুধু আন্দোলন দমন নয়, মূল সমস্যার সমাধান করাই এখন সবচেয়ে জরুরি। প্রথমত, সরকারের উচিত একটি স্থায়ী দাবি-নিষ্পত্তি কাঠামো গঠন করাÑ যেখানে শিক্ষক, কর্মচারী ও শ্রমিকদের দাবিগুলো নিয়মিত পর্যালোচনা ও বাস্তবায়ন হবে। দ্বিতীয়ত, বাজেট পরিকল্পনায় শিক্ষা ও মানবসম্পদ খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। শিক্ষকদের ন্যূনতম জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত না হলে শিক্ষা ব্যবস্থায় গুণগত উন্নয়ন সম্ভব নয়। তৃতীয়ত, আন্দোলনকে দমন নয়, সংলাপের মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ শুধু নির্বাচন নয়, জনজীবনে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। চতুর্থত, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। আন্দোলন যেন সহিংসতা বা জনদুর্ভোগে না রূপ নেয়, সে বিষয়ে সজাগ থাকা জরুরি।

বাংলাদেশের ইতিহাসে আন্দোলন যেমন অগ্রগতির সূতিকাগার, তেমনি অনিয়ন্ত্রিত আন্দোলন জনদুর্ভোগ ও অস্থিতিশীলতার কারণও হতে পারে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আন্দোলনের এই প্রবণতা একদিকে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে দুর্বলতা প্রকাশ করছে, অন্যদিকে জনগণের অধিকারচেতনার বিকাশও নির্দেশ করছে। কিন্তু যদি প্রতিটি দাবি রাজপথে না গিয়ে সংলাপ ও নীতিনির্ধারণের মাধ্যমে সমাধান হয়, তবে দেশ যেমন স্থিতিশীল হবে, তেমনি জনজীবনও সহজ হবে।

ঢাকা আজ ‘আন্দোলনের নগরী’ হয়ে উঠেছেÑ এটা আমাদের গৌরব নয়, বরং আত্মসমালোচনার সময়। দাবি ও অধিকার গণতান্ত্রিক পথেই প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেন আন্দোলনের শোরগোল নয়, উন্নয়নের পদধ্বনি শোনা যায়।
 
পরিশেষে বলা যায়, সরকার আর স্বল্প সময় আছে। একটি নির্বাচিত সরকার জনগুরুত্বপূর্ণ দাবি পূরণে এগিয়ে আসবে। সব শ্রেণি-পেশার মানুষের উচিৎ বিষয়টি অনুধাবন করা। নতুন করে আন্দোলনে না যাওয়া। যত প্রয়োজনীয়ই হোক জনবহুল ও ঘনবসতির এ ঢাকা সিটিতে রোড ব্লকের মাধ্যমে জনগণের দুর্ভোগ বৃদ্ধি করে আর কোন আন্দোলন কাম্য নয়। 

এম রায়হান উল্লাহ 
লেখক : কবি ও সাংবাদিক

আজকালের খবর/









Advertisement
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor$gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor$gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor$gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor$gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft