
কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলা একটি দুর্যোগ প্রবণ এলাকা। প্রতিবছরের বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় এই উপজেলার মানুষজনের। পানির এক নাম জীবন হলেও অন্য নাম যে মরণ তা হাড়ে হাড়ে টের পায় চিলমারীর মানুষ।
বন্যাকে আশীর্বাদও বলা হয়ে থাকে। বন্যার পানি পলি মাটি বয়ে আনে। বন্যা হলে ব্যাপক চাষাবাদ হয় চরাঞ্চলে। কিন্তু, বন্যায় নদী তীরবর্তী অনেক মানুষ হয়ে যায় আশ্রয়হীন। ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে গৃহহীনদের নানা কষ্ট সহ্য করতে হয়।
প্রতিবছর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গৃহহীনদের একটা দীর্ঘ তালিকা তৈরি হয়। চলতি বছরে নয়ারহাট ইউনিয়নের বজরাদিয়ারখাতা, রাণীগঞ্জ ইউনিয়নেরর চর বড়ভিটা, চিলমারী ইউনিয়নের চর শাখাহাতি, কড়াই বরিশাল, বৈলমনদিয়ার খাতা এলাকার কয়েক শ’ পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে।
সরেজমিনে থানাহাট ইউনিয়নের ব্রহ্মপুত্র নদ তীরবর্তী পুটিমারী, রাজারভিটা ও রমনা ইউনয়নে গেলে দেখা মেলে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা লাইট হাউজের কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবীর সঙ্গে। স্বেচ্ছাসেবী নাফিসা তাসনিম সরকার নোভা, সাকিব ইমসলাম লিনু, রুবেল মিয়া, নুসরাত জাহান রুনা বলেন- আমরা লাইট হাউজ থেকে প্রশিক্ষণ পেয়েছি। দুর্যোগকালীন সময়ে কিশোরীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, প্রসূতি ও গর্ভবতী মা এবং প্রতিবন্ধী ও বৃদ্ধদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও নিরাপত্তার বিষয়ে আমাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, স্যানিটেশন, জন্ম নিয়ন্ত্রণ, স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার বিষয়েও আমরা প্রশিক্ষণ পেয়েছি। এছাড়াও লাইট হাউজের অ্যাপসের মাধ্যমে দুর্যোগের বার্তা জানানো হয় আমাদের।
তারা আরো বলেন, কয়েকদিন আগে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপদসীমার কাছাকাছি এলে আমরা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের যোগাযোগ করলে তিনি মাইকিং করে জনগণকে সচেতন করেন। পাশাপাশি আমরা নদ তীরবর্তী অঞ্চলগুলোতে গিয়ে লোকজনকে সচেতন করি। মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক সচেতন হয়েছেন।
রমনা মডেল ইউনিয়নের ভরট্টপাড়া গ্রামের অছিরন, নুর ফাতেমা, সাবিনা বেগম বলেন, আমরা আগে বন্যার সময় কখনো কখনো নদীর পানি খেতাম। এ কারণে ডায়রিয়া হতো। কিন্তু, লাইট হাউজ থেকে পানি বিশুদ্ধকরণ পদ্ধতি ও বিশুদ্ধ পানি না খাওয়ার ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জানতে পেরেছি। ফলে পানিবাহিত রোগের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছি।
অষ্টমীরচর ইউনিয়নে থাকা লাইট হাউজের স্বেচ্ছাসেবী মো. শহিদুল ইসলাম, হেলেনা আক্তার হ্যাপী, নয়ারহাট ইউনিয়নের মুসফিকা বিনতে বৃষ্টি, দবিরুল ইসলাম, চিলমারী ইউনিয়নের হোসাইন মোহাম্মদ মেহেদী, শাহিন আলম শাওন, রাণীগঞ্জ ইউনিয়নের জ্যোতিষ কুমার, শাহানাজ পারভীন সুমী জানান, বন্যার সময় মানুষকে অনেক কষ্ট করতে হয়। তাদের বাঁধের উপর, বিভিন্ন স্কুলে, আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিতে হয়। সেখানে করতে হয় মানবেতর জীবন যাপন। সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সাহায্য সহযোগিতা করা হলেও স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে একেবারই সচেতন করা হয় না। আমরা লাইট হাউজের পক্ষ থেকে দুর্যোগের আগাম বার্তা জানিয়ে দেই। ফলে ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে।
আগের চেয়ে মানুষ এখন অনেকটা সচেতন হয়েছেন। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সোহেল রহমান বলেন, চরের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। পাশাপাশি বেসরকারি কিছু উন্নয়ন সংস্থা বসতভিটা উঁচুকরণের কাজ করছে। আমরা রাস্তা নির্মাণ করছি। কালভার্ট নির্মাণ করছি। দুর্যোগের সময়ে এনজিওদের সহায়তায় বিশেষ করে লাইট হাউজের স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে দুর্যোগের আগাম বার্তা পৌঁছে দিচ্ছি।
লাইট হাউজের উপজেলা কো-অর্ডিনেটর হামিদা আক্তার হেনা বলেন, আমরা চিলমারী উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের কিশোরী ও নারীদের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। তারা এখন অনেক সচেতন হয়েছেন। এই প্রশিক্ষণ কাজে লাগালে তাদের জীবনমান উন্নয়ন হবে। স্বাস্থ্য ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসবে।
আজকালের খবর/ওআর