বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণ শিশুদের স্বাস্থ্যের ওপর ক্রমবর্ধমান প্রভাব ফেলছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং বায়ুদূষণের কারণে বিভিন্ন সংক্রামক ও শ্বাসতন্ত্রের রোগের ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে মশাবাহিত রোগ, যেমন ডেঙ্গুর বিস্তারও নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় তারা এসব ঝুঁকির প্রতি বেশি সংবেদনশীল। সাম্প্রতিক কালে শিশুদের জন্য আরেক আতংকের নাম বা যমদূত হচ্ছে‘ হাম’।
এমনি অবস্থায় শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা, জমে থাকা পানি অপসারণ, বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার, নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ এবং বায়ুদূষণ থেকে শিশুদের যতটা সম্ভব দূরে রাখা উচিত। অতিরিক্ত গরমের সময় শিশুদের পর্যাপ্ত পানি পান করানো, হালকা পোশাক পরানো এবং দীর্ঘ সময় রোদে না রাখাও জরুরি।
এছাড়া শিশুদের মধ্যে স্বাস্থ্যবিষয়ক ভালো অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। নিয়মিত হাত ধোয়া, কাশি বা হাঁচির সময় মুখ ঢেকে রাখা, অসুস্থ ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশে বসবাসের অভ্যাস ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে। পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজ সম্মিলিতভাবে শিশুদের স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে পারলে অনেক রোগের সংক্রমণ সহজেই প্রতিরোধ করা সম্ভব। একটি সুস্থ পরিবেশ, সঠিক পুষ্টি, সময়মতো টিকাদান এবং স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন নিশ্চিত করতে পারলেই হামসহ অধিকাংশ প্রতিরোধযোগ্য রোগ থেকে শিশুদের নিরাপদ রাখা সম্ভব হবে।
হামসহ শিশুদের সব ধরনের রোগের হাত থেকে রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। কারণ শিশুরা একটি দেশের ভবিষ্যৎ। তাদের সুস্বাস্থ্য, নিরাপদ শৈশব এবং সুষম বিকাশ একটি জাতির সামগ্রিক উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু জন্মের পর থেকে পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুরা বিভিন্ন সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। হাম, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা, চিকেনপক্স, ডেঙ্গু, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস, অপুষ্টি, কৃমি এবং অন্যান্য সংক্রমণ শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশকে ব্যাহত করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এসব রোগ জটিল আকার ধারণ করে স্থায়ী শারীরিক ক্ষতি এমনকি মৃত্যুর কারণও হতে পারে।
বিশ্বব্যাপী শিশুস্বাস্থ্য উন্নয়নে টিকাদান কর্মসূচি, নিরাপদ পুষ্টি, পরিচ্ছন্নতা, মাতৃসচেতনতা এবং সময়মতো চিকিৎসাসেবার গুরুত্ব বারবার প্রমাণিত হয়েছে। বাংলাদেশেও সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি, পুষ্টি কর্মসূচি এবং স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধির ফলে শিশু মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে এখনও সচেতনতার অভাব, অপুষ্টি, পরিবেশ দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সংক্রমণজনিত বিভিন্ন কারণে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয়নি। তাই শিশুদের সব ধরনের রোগ থেকে রক্ষা করতে পরিবার, সমাজ, স্বাস্থ্যকর্মী এবং সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। শিশুরা বিভিন্ন ধরনের রোগে আক্রান্ত হতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো হাম, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া,ইনফ্লুয়েঞ্জা বা মৌসুমি জ্বও,চিকেনপক্স, মাম্পস, রুবেলা, টাইফয়েড,ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া (যেসব অঞ্চলে ঝুঁকি রয়েছে), কৃমিজনিত রোগ, অপুষ্টি, রক্তস্বল্পতা, চর্মরোগ, হেপাটাইটিস, কান, নাক ও গলার সংক্রমণ প্রভৃতি। এসব রোগের অনেকগুলোই প্রতিরোধযোগ্য, যদি যথাসময়ে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।
তবে হাম একটি সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি বা হাঁচি দিলে বাতাসের মাধ্যমে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে এবং অন্য শিশুকে সহজেই সংক্রমিত করতে পারে। হামের লক্ষণ গুলোর মধ্যে রয়েছে উচ্চ জ্বও, কাশি, সর্দি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া, শরীরে লালচে দানা বা র্যাশ, দুর্বলতা, ক্ষুধামন্দা,হাম থেকে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, কানের সংক্রমণ, অপুষ্টি, এমনকি বিরল ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের জটিলতাও হতে পারে। তাই হামকে কখনোই সাধারণ রোগ হিসেবে অবহেলা করা উচিত নয়। শিশুকে রোগমুক্ত রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সময়মতো সব নির্ধারিত টিকা নিশ্চিত করা।
টিকা শিশুর শরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে, ফলে সে গুরুতর সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা পায়।জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির আওতায় সাধারণত যেসব রোগের বিরুদ্ধে টিকা দেওয়া হয়, তার মধ্যে রয়েছে হাম, রুবেলা, যক্ষ্মা, পোলিও, ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি,টিটেনাস হেপাটাইটিস প্রভৃতি। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের উচিত শিশুর টিকাকার্ড সংরক্ষণ করা এবং নির্ধারিত সময়ে প্রতিটি টিকা সম্পন্ন করা। পাশাপাশি শিশুর পুষ্টিকর খাদ্যের গুরুত্ব দেয়া। কারণ শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্যের বিকল্প নেই। জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শুধুমাত্র মায়ের বুকের দুধই শিশুর জন্য সর্বোত্তম খাদ্য। এরপর বুকের দুধের পাশাপাশি বয়স অনুযায়ী নিরাপদ ও পুষ্টিকর সম্পূরক খাবার দিতে হবে।
একই সঙ্গে শাকসবজি,মৌসুমি ফল,ডিম,মাছ,মাংস,ডাল,দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার,ভাত, রুটি ও অন্যান্য শর্করা,পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি দেয়া উচিত। কারণ সুষম খাদ্য শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং অপুষ্টি প্রতিরোধ করে। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা দরকার। পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলে অনেক সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। এ জন্য অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে,সাবান দিয়ে নিয়মিত হাত ধোয়া। খাবারের আগে ও টয়লেট ব্যবহারের পরে হাত পরিষ্কার করা।শিশুর নখ ছোট রাখা।প্রতিদিন গোসল করানো।পরিষ্কার কাপড় পরানো।পরিষ্কার বিছানা ব্যবহার করা। এসব অভ্যাস ডায়রিয়া, কৃমি ও বিভিন্ন সংক্রমণের ঝুঁকি কমায়। তাছাড়া নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থধা নিশ্চিত করা। কারণ দূষিত পানি শিশুদের ডায়রিয়া, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস এবং অন্যান্য পানিবাহিত রোগের অন্যতম কারণ। তাই ফুটানো বা নিরাপদ পানি পান করাতে হবে। খাবার ঢেকে রাখতে হবে। টয়লেট পরিষ্কার রাখতে হবে। আবর্জনা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে হবে। মাছি ও মশার বিস্তার রোধ করতে হবে।
হাম প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো নির্ধারিত সময়ে হামের টিকা গ্রহণ।আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা। কাশি ও হাঁচির শিষ্টাচার মেনে চলা।পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিশ্চিত করা।পর্যাপ্ত তরল ও পুষ্টিকর খাদ্য দেওয়া। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়া।জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া। নিউমোনিয়া প্রতিরোধ টিকা নিশ্চিত করা।বুকের দুধ খাওয়ানো।ধূমপানের ধোঁয়া থেকে দূরে রাখা।ঘরের পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা।ঠান্ডা-কাশি অবহেলা না করা।শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া। আর ডায়রিয়ার সময় সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো শরীরে পানিশূন্যতা।প্রতিরোধে নিরাপদ পানি পান করা। হাত ধোয়া।পরিষ্কার খাবার খাওয়া। ওরস্যালাইন ব্যবহার করা। বুকের দুধ চালিয়ে যাওয়া। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া। ডেঙ্গু প্রতিরোধ ডেঙ্গু বর্তমানে শিশুদের জন্যও একটি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি।প্রতিরোধে বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি পরিষ্কার করা। মশারি ব্যবহার করা। পূর্ণহাতা পোশাক পরানো। মশা প্রতিরোধক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
অন্যদিকে কৃমি শিশুর অপুষ্টি, রক্তস্বল্পতা ও শারীরিক দুর্বলতার কারণ হতে পারে। প্রতিরোধে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা।জুতা পরে হাঁটা। নিরাপদ খাবার গ্রহণ। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কৃমিনাশক ওষুধ গ্রহণ। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা দরকার। শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি, ওজন, উচ্চতা, দৃষ্টিশক্তি, দাঁত এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা উচিত। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করলে রোগের প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করা সহজ হয় এবং দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হয়। পর্যাপ্ত ঘুম ও শারীরিক ব্যায়াম দরকার। ঘুম শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এছাড়া নিয়মিত খেলাধুলা ও শারীরিক ব্যায়াম রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। স্থূলতা কমায়। মানসিক বিকাশে সহায়তা করে। হাড় ও পেশি শক্তিশালী করে। তাছাড়া সুস্থ শরীরের পাশাপাশি শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের উচিত শিশুর সঙ্গে সময় কাটানো। ভালোবাসা ও নিরাপত্তা প্রদান। অতিরিক্ত চাপ না দেওয়া। খেলাধুলার সুযোগ সৃষ্টি করা। মোবাইল ও স্ক্রিন ব্যবহারে সীমা নির্ধারণ করা। এ জন্য অভিভাবকদের সচেতনতা প্রয়োজন। কারণ শিশুর স্বাস্থ্য রক্ষায় অভিভাবকদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। তাদের উচিত অসুস্থ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া। নিজে ও পরিবারকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে উৎসাহিত করা। ওষুধ নিজ ইচ্ছায় না খাওয়ানো। তাছাড়া বিদ্যালয়ের ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিদ্যালয় শিশুস্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিদ্যালয়ে স্বাস্থ্যবিষয়ক শিক্ষা প্রদান। পরিষ্কার পরিবেশ নিশ্চিত করা। হাত ধোয়ার ব্যবস্থা রাখা। অসুস্থ শিশুদের বিশ্রামের ব্যবস্থা করা। স্বাস্থ্যসচেতনতা কর্মসূচি পরিচালনা করা। সরকারের উচিত টিকাদান কর্মসূচি আরও শক্তিশালী করা। প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া। পুষ্টি কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা। নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করা।স্বাস্থ্য শিক্ষা ও গণসচেতনতা বৃদ্ধি করা।দক্ষ শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সংখ্যা বৃদ্ধি করা।
অন্যদিকে, শিশুদের সুস্থ রাখতে পরিবার ও সরকারের পাশাপাশি সমাজেরও দায়িত্ব রয়েছে। সামাজিক সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং গণমাধ্যম শিশুস্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ গড়ে তোলা, টিকাদানে উৎসাহ প্রদান এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
ূহাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা সাধারণত শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে একজন মানুষ থেকে আরেকজনের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। প্রাথমিকভাবে জ্বর, কাশি, সর্দি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে দুর্বলতার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। কয়েক দিনের মধ্যে শরীরে লালচে র্যাশ দেখা দেয়, যা পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। যদিও অনেক ক্ষেত্রে এটি সাধারণ ভাইরাল জ্বরের মতো মনে হতে পারে, কিন্তু শিশুদের ক্ষেত্রে জটিলতা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কে প্রদাহ এবং শ্বাসকষ্টের মতো প্রাণঘাতী অবস্থার সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে শিশু টিকাদান কর্মসূচিতে সাফল্যের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়ে এসেছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) মাধ্যমে দেশটি বহু বছর ধরে ৮০ শতাংশের বেশি টিকা কভারেজ বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিল। বিশেষ করে ২০১২ সালে হাম–রুবেলা (গজ) টিকা চালুর পর ২০২৫ সাল পর্যন্ত টিকা কভারেজ ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশে পৌঁছায়, যা শিশু মৃত্যুহার কমাতে বড় ভূমিকা রেখেছিল। তবে কোভিড-১৯ মহামারির সময় এই ধারাবাহিকতায় বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটে এবং পরবর্তী সময়ে টিকাদান কার্যক্রম পুরোপুরি আগের অবস্থায় আর ফিরতে পারেনি।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো টিকাদান কাভারেজের ঘাটতি। মৃত্যুবরণ করা শিশুদের একটি বড় অংশই হামের টিকা নেয়নি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এছাড়া কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘœ, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অস্থিরতা, স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি এবং টিকা সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
জনস্বাস্থ্যবিদদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কাঠামোগত ভাবে প্রান্তিক পর্যায়ে দুর্বল। ইউনিয়ন ও গ্রামীণ পর্যায়ে কার্যকর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি থাকায় রোগীরা দ্রুত বড় শহরের হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, ফলে চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, সময়মতো প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা না হলে মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়, যা এই প্রাদুর্ভাবে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট শুধুমাত্র একটি ভাইরাসের বিস্তার নয়, বরং একাধিক সামাজিক, পুষ্টিগত এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থাগত সমস্যার সমন্বিত ফলাফল। কোভিড-পরবর্তী সময়ে অনেক পরিবারের পুষ্টি পরিস্থিতি দুর্বল হয়ে পড়ে, বিশেষ করে শিশু ও মায়েদের মধ্যে প্রোটিন ও প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি দেখা দেয়। এর ফলে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। একই সঙ্গে অনেক এলাকায় মাতৃদুগ্ধ গ্রহণের হারও কমে গেছে, যা নবজাতক ও ছোট শিশুদের প্রাথমিক ইমিউনিটি দুর্বল করে এই পরিস্থিতিতে হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ হওয়া সত্ত্বেও টিকাদান ব্যবস্থার সামান্য দুর্বলতাই এত বড় বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। তাই ভবিষ্যতে নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করা, তথ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা, পুষ্টি নিরাপত্তা উন্নত করা এবং স্বাস্থ্যসেবাকে প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।
লেখক: ফারিহা হোসেন প্রভা
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োকেমিস্ট্রি এন্ড বায়োটেকনোলজি বিষ য়ে অধ্যয়নরত।
আজকালের খবর/বিএস