বৃহস্পতিবার ২ জুলাই ২০২৬
সশস্ত্র বাহিনীর ১৫০ জন অফিসার পেলেন ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি ও বকেয়া সুবিধা
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬, ৫:৫০ পিএম   (ভিজিট : ৭)
যারা দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষার শপথ নিয়ে জীবন উৎসর্গ করেন, তাঁদের মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্রের অন্যতম পবিত্র দায়িত্ব। একজন সৈনিকের কাছে পদ-পদবি, ইউনিফর্ম কিংবা বেতন যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও মূল্যবান তাঁর সম্মান। সেই সম্মান যদি অন্যায়ভাবে কেড়ে নেওয়া হয়, তাহলে শুধু একজন কর্মকর্তাই ক্ষতিগ্রস্ত হন না; আহত হয় একটি পরিবারের স্বপ্ন, একটি প্রতিষ্ঠানের মনোবল এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি।

পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারামলে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে বৈষম্য, প্রতিহিংসা ও প্রশাসনিক অন্যায়ের শিকার হওয়ার অভিযোগে সশস্ত্র বাহিনীর বহু কর্মকর্তা বছরের পর বছর ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় ছিলেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বর্তমান সরকার বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর ১৫০ জন অবসরপ্রাপ্ত, অপসারণকৃত, অব্যাহতিপ্রাপ্ত ও বরখাস্ত কর্মকর্তার মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। তাঁদের ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি, বকেয়া আর্থিক সুবিধা এবং পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে একটি মানবিক ও রাষ্ট্রনৈতিক পদক্ষেপ। এটি শুধু একটি প্রশাসনিক প্রজ্ঞাপন নয়; এটি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা—অতীতে যাঁদের প্রতি অন্যায় হয়েছে বলে সরকার পর্যালোচনার ভিত্তিতে মনে করেছে, তাঁদের প্রাপ্য সম্মান ও অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার দায় বর্তমান সরকার ও রাষ্ট্র এড়িয়ে যাবে না।

রাষ্ট্র অন্যায় করতে পারে, সরকারও ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু একটি পরিণত রাষ্ট্রের মহত্ত্ব প্রকাশ পায় তখনই, যখন সে অতীতের ভুল সংশোধনের সাহস দেখায়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যেসব জাতি নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক ভুল স্বীকার করে তা সংশোধনের পথে হাঁটতে পেরেছে, তারাই দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও স্থিতিশীল রাষ্ট্র গড়ে তুলেছে।

হাসিনা রেজিমের গত দেড় দশকে বাংলাদেশের রাজনীতি ছিল তীব্র মেরুকরণ, অবিশ্বাস ও সংঘাতের আবহে আবদ্ধ। সেই সময়ে প্রশাসনসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব, বৈষম্য এবং প্রতিহিংসার অভিযোগ বহুবার সামনে এসেছে। হাসিনা তার  ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য সশস্ত্র বাহিনীর মতো একটি পেশাদার প্রতিষ্ঠানকেও বিতর্কিত  করেছিল। যা শুধু কয়েকজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; বরং পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্যই গভীর উদ্বেগের বিষয়।

একজন সেনা কর্মকর্তা তাঁর কর্মজীবনের প্রতিটি দিন কাটান শৃঙ্খলা, আনুগত্য ও আত্মত্যাগের কঠোর পরীক্ষার মধ্য দিয়ে। সীমান্তে, দুর্গম পাহাড়ে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে কিংবা আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনে তিনি দেশের পতাকাকে মর্যাদার সঙ্গে বহন করেন। সেই মানুষটিকেই যদি রাজনৈতিক বিবেচনা, ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা কিংবা প্রশাসনিক বৈষম্যের কারণে প্রাপ্য সম্মান থেকে বঞ্চিত হতে হয়, তবে সেই ক্ষত কেবল তাঁর ব্যক্তিগত নয়; সেটি রাষ্ট্রেরও ক্ষত।

এই বাস্তবতায় সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, তিন বাহিনীর সদর দপ্তর এবং উচ্চপর্যায়ের কমিটির দীর্ঘ পর্যালোচনার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এটি তাৎক্ষণিক আবেগের ফল নয়; বরং প্রাতিষ্ঠানিক যাচাই-বাছাইয়ের ভিত্তিতে গৃহীত একটি পদক্ষেপ। এ ধরনের প্রক্রিয়া রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তকে আরও গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।

তবে এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় শক্তি অর্থনৈতিক সুবিধা নয়; সবচেয়ে বড় শক্তি হলো মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া। অর্থনৈতিক ক্ষতি একসময় পূরণ করা যায়, কিন্তু অন্যায়ভাবে হারিয়ে যাওয়া সম্মান ফিরিয়ে দেওয়া অনেক বেশি কঠিন। আজ যাঁরা ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি বা প্রাপ্য স্বীকৃতি পেলেন, তাঁদের অনেকেই হয়তো জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় নীরবে পার করেছেন। তাঁদের সন্তানদের মনে হয়তো প্রশ্ন জেগেছিল—“আমার বাবার অপরাধ কী ছিল?” সরকারের এই সিদ্ধান্ত অন্তত সেই প্রশ্নের একটি নৈতিক উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছে।

রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা গড়ে ওঠে ন্যায়বিচারের ভিত্তির ওপর। নাগরিক যখন দেখেন, রাষ্ট্র অতীতের অন্যায় সংশোধনে আন্তরিক উদ্যোগ নিচ্ছে, তখন তাঁর বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়। এই আস্থা কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের চেয়েও মূল্যবান। কারণ আস্থা ছাড়া শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে না, আর শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ছাড়া টেকসই রাষ্ট্র নির্মাণ সম্ভব নয়।

তবে এখানেই থেমে গেলে চলবে না। অতীতের ভুল সংশোধনের পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্যও কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কোনো কর্মকর্তা তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত মত কিংবা ক্ষমতার পালাবদলের কারণে নয়; কেবল যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা এবং পেশাগত সততার ভিত্তিতে মূল্যায়িত হবেন। রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানের মতো সশস্ত্র বাহিনীর ক্ষেত্রেও এই নীতি অটুট থাকা অপরিহার্য।

সরকারের এই সিদ্ধান্ত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও বহন করে—প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচারই একটি জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। বিভক্ত সমাজে প্রতিশোধ নয়, ন্যায়ভিত্তিক সিদ্ধান্তই আস্থা পুনর্গঠনের সবচেয়ে কার্যকর পথ। অতীতের ক্ষত হয়তো পুরোপুরি মুছে ফেলা যায় না, কিন্তু ন্যায়বিচার সেই ক্ষত নিরাময়ের পথ খুলে দিতে পারে।

বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর অভিজ্ঞতা বলে, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়তে হলে অতীতের অন্যায়কে আড়াল করা নয়; বরং নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করতে হয়। যে রাষ্ট্র নিজের ভুল সংশোধন করতে জানে, সে রাষ্ট্রই ভবিষ্যতের জন্য আরও শক্ত ভিত নির্মাণ করতে পারে। বাংলাদেশের জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

আজকের এই সিদ্ধান্ত তাই শুধু ১৫০ জন কর্মকর্তার নয়; এটি তাঁদের পরিবার, সহকর্মী এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও একটি ইতিবাচক বার্তা। এটি মনে করিয়ে দেয়—ন্যায়বিচার বিলম্বিত হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র যদি আন্তরিক হয়, তবে ন্যায়ের পথ পুরোপুরি রুদ্ধ হয়ে যায় না। আর এই বিশ্বাসই একটি জাতিকে আশাবাদী করে তোলে।

সবচেয়ে বড় কথা, এই উদ্যোগকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি যদি সুশাসন, প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনের ধারাবাহিক অংশে পরিণত হয়, তাহলে বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে।

পরিশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা তখনই আরও অর্থবহ হবে, যখন কোনো সৎ, যোগ্য ও দেশপ্রেমিক কর্মকর্তা কখনোই রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা বৈষম্যের শিকার হবেন না। কারণ একটি সভ্য রাষ্ট্রের মহত্ত্ব ক্ষমতা প্রদর্শনে নয়; মানুষের সম্মান রক্ষায়। একটি দায়িত্বশীল সরকারের সাফল্য শুধু উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে নয়; অন্যায়ের শিকার মানুষের প্রাপ্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার মধ্যেও নিহিত। সশস্ত্র বাহিনীর এই ১৫০ জন কর্মকর্তার মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত তাই শুধু একটি প্রশাসনিক প্রজ্ঞাপন নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের মানবিক চেতনা, ন্যায়বোধ এবং প্রাতিষ্ঠানিক পরিপক্বতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ বলেই মনে হচ্ছে।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক 
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com  


আজকালের খবর/বিএস 









Advertisement
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor$gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor$gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor$gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor$gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft