আমিনপুর,পাবনা – শেষ বাঁশি শুধু একটি ফুটবল ম্যাচের অবসান ঘোষণা করেনি, এটি এমন একটি মাঠকে বিদায় জানিয়েছে যা খুব শীঘ্রই চিরতরে বিলীন হয়ে যাবে।
গতকাল (৩ জুলাই) পাবনার আমিনপুরের ঢালারচরের বালুচরে ' স্বপ্নগ্রাম ব্রাজিল' ও ' স্বপ্নগ্রাম আর্জেন্টিনা'-এর মধ্যে অনুষ্ঠিত হয় শেষ প্রীতি ম্যাচ। 'চর বয়েজ' নামে পরিচিত স্থানীয় তরুণ ফুটবলাররা এই ম্যাচে অংশ নেয়। বিকে ফাউন্ডেশন এই আয়োজন করে এমন একটি সম্প্রদায়কে সম্মান জানানোর জন্য, যারা ক্ষতিকে জীবনের অংশ করে নিতে শিখেছে।
বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনা এখন সারা বিশ্বে। ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার লড়াই দেখতে টিভি পর্দায় চোখ রাখে কোটি কোটি মানুষ। কিন্তু ঢালারচরের মানুষগুলো ফুটবল উন্মাদনাকে বরণ করে নিয়েছে অন্য একভাবে। তাদের ছোট ছোট নৌকা আর টিনের ঘরের চালায় উড়ছে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার পতাকা। জেলেরা যখন নদীতে জাল ফেলছে, তখন তাদের নৌকার মাস্তুলে দোল খাচ্ছে সেই পতাকা। ঘরের স্ত্রীরা রান্নাঘরের কাজ করতে করতেও যেন এক পলক দেখে নিচ্ছে সেই পতাকার দিকে—বিশ্বকাপের স্বপ্ন তাদেরও। কিন্তু এই স্বপ্ন তারা দেখছে এক অনিশ্চিত জীবনের মাঝে। নদী যাদের সবকিছু কেড়ে নিতে পারে, তারা অন্তত আজকের এই খেলাটি দেখবে। বিশ্বকাপের সেই উন্মাদনা হয়তো তাদের ঘরে পৌঁছায় না, কিন্তু আজ তারা সেই উন্মাদনাকে নিজেদের করে নিয়েছে।
ঢালারচরের মৎস্যজীবী ও কৃষক পরিবারগুলোর কাছে যমুনা নদী শত্রু নয়। এটি একটি শক্তি, যার বিরুদ্ধে তারা লড়াই করা ছেড়ে দিয়েছে। বছর বছর ধরে এই শক্তিশালী নদী তাদের বসতবাড়ি গ্রাস করে নিচ্ছে। এটি তাদের ফসল ও জমি কেড়ে নিচ্ছে। তারা দেখেছে প্রতিবেশীরা কীভাবে তাদের সবকিছু গুছিয়ে ভেতরের দিকে সরে গেছে। তারা একমাত্র পরিচিত ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। এখন আর কোনো রাগ নেই। শুধু ক্লান্তিকর এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি।
"এটাই আমাদের জীবন," বললেন শাহিন, একজন তরুণ জেলে ও ফুটবলার, যিনি ম্যাচ আয়োজনে সাহায্য করেছিলেন। "নদী নেয়, আর আমরা সরে যাই। এটা সবসময়ই এভাবে হয়েছে। আমরা আর কাঁদি না। আমরা আর প্রশ্ন করি না কেন। আমরা যা যা পারি সংগ্রহ করি এবং নতুন জায়গা খুঁজে নিই। কিন্তু ভেতরে ভেতরে এটি আমাদের প্রতিবার একটু একটু করে মেরে ফেলে। আমাদের শিশুরা বড় হয় জেনে যে তাদের খেলার মাঠ আগামী বছর থাকবে না। এটা কেমন শৈশব?"
ঢালারচরের এই মাঠটি বছরের পর বছর ধরে অসংখ্য প্রীতি প্রতিযোগিতার সাক্ষী হয়েছে। কিন্তু এখন এটি সর্বোচ্চ দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে টিকে থাকবে। যমুনা এটিকে সম্পূর্ণ গ্রাস করবে। স্থানীয় সম্প্রদায়ের জন্য এটি কোনো চমক নয়। এটি এক নিরন্তর বাস্তুচ্যুতির চক্রের একটি পূর্বানুমেয় অধ্যায়। পাবনা অঞ্চলে নদীভাঙন অবিরাম চলছে। পরিবারগুলো বহুবার স্থানান্তরিত হয়েছে। তারা শুধু ঘরবাড়িই নয়, স্কুল, মসজিদ ও তাদের পূর্বপুরুষদের কবরও ছেড়ে চলে গেছে।
এই নীরব হতাশার মধ্যে ক্রীড়া একটি বিরল জীবনরেখা হয়ে উঠেছে। এক বিকেলের জন্য জাল সরিয়ে রাখা হয়েছিল, লাঙ্গল মাঠে ফেলে রাখা হয়েছিল এবং চরের শিশুরা ফুটবলার হয়ে উঠেছিল।
তাদের মধ্যে ছিলেন ১০ বছর বয়সী রাজু। সে একজন খণ্ডকালীন জেলে। সে তার বাবার সাথে নদীতে সময় কাটায়, শ্রেণিকক্ষে নয়। অনেক চরশিশুর জন্য শিক্ষা অধরা স্বপ্ন। তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় উচ্চাকাঙ্ক্ষা দিয়ে নয়, নদীর অনিশ্চিত প্রকৃতি দিয়ে।
"আমরা এরকম খেলতে পারি না—কখনোই না," বলল রাজু, তার চোখ এখনও ম্যাচের স্মৃতিতে উজ্জ্বল। "বেশিরভাগ দিন আমি নৌকায় থাকি, জাল ফেলি। স্কুল? আমি মাত্র কয়েকবার গিয়েছি। আমার বাবা বলেন, আবার যদি আমাদের চলে যেতেই হয় তাহলে স্কুলে যাওয়ার কোনো মানে হয় না। কিন্তু গতকাল আমি সবকিছু ভুলে গিয়েছিলাম। আমি আর্জেন্টিনার হয়ে তারকা খেলোয়াড় ছিলাম। আমি একটি গোল করেছি। কিছুক্ষণের জন্য আমি জেলের ছেলে ছিলাম না। আমি ছিলাম একজন চ্যাম্পিয়ন।"
শাহিন এমন একটি সম্প্রদায়ের পক্ষে কথা বললেন, যারা এই সুন্দর খেলায় ক্ষণিকের সান্ত্বনা খুঁজে পায়।
"আমরা ভেতরে ভেতরে ধীরে ধীরে মরে যাচ্ছি," বললেন তিনি। "নদী আমাদের জমি, আমাদের ঘর, আমাদের আশা কেড়ে নিচ্ছে। কিন্তু সেই নিরানব্বই মিনিটের জন্য আমরা বেঁচে ছিলাম। আমরা হেসেছি। আমরা উল্লাস করেছি। আমরা ভুলে গেছি যে পানি অপেক্ষা করছে। যখন এই মাঠটি চলে যাবে, তখন আমাদের শিশুরা কোথায় খেলবে? নদী তা পাত্তা দেয় না। কিন্তু আমরা এই একটি স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে যাব—এই একটি দিন, যখন আমরা শুধু বেঁচে থাকার লড়াইয়ে জয়ী ছিলাম না, আমরা মানুষ ছিলাম।
চরের শিশুরা এই ধরনের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সুযোগ খুব কমই পায়। তাদের দিন কেটে যায় বেঁচে থাকার সংগ্রামে। তারা বিপজ্জনক স্রোতে মাছ ধরে। তারা জাল মেরামতে সাহায্য করে। তারা জ্বালানির জন্য কাঠ সংগ্রহ করে। শিক্ষা তাদের কাছে দূরের স্বপ্ন। কিন্তু গতকাল তারা অন্য কিছু পেয়েছিল। তারা পেয়েছিল আনন্দ।
"প্রীতি ম্যাচ" ড্রতে শেষ হয়েছিল। এটাই ছিল মানানসই। জয় ছিল কখনোই মূল বিষয় নয়। শেষ বাঁশি যখন চর জুড়ে প্রতিধ্বনিত হল, খেলোয়াড়রা একটি দলীয় ছবির জন্য জড়ো হলো। তারা সেই মাটিতে দাঁড়াল যেখানে তারা আর কখনোই পা রাখতে নাও পারে। রাজু দাঁড়াল সামনের সারিতে। সে এখনও বলটি জড়িয়ে ধরেছিল।
"আমি আমার নাতি-পুতিদের এই দিনের কথা বলব, নদীর দিকে তাকিয়ে মৃদু কণ্ঠে বলল সে। "আমি তাদের বলব যে একসময়, এই মাটিতে যা আর নেই, আমরা হেসেছি, আমরা খেলেছি, আমরা খুশি ছিলাম।
বিকেফাউন্ডেশন চর সম্প্রদায়ের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে এই আয়োজন করে। এটি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাদের সাথে থাকার অঙ্গীকার করে। যদিও জমি বিলীন হয়ে যাচ্ছে, শিশুদের চেতনা কখনো ভোলা যাবে না।
আজকালের খবর/বিএস