নাটকীয়তায় ঠাসা ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে জায়গা করে নিলো কানাডা। দ্বিতীয়ার্ধের অতিরিক্ত সময়ে স্টিফেন ইউস্তাকিওর করা একমাত্র জয়সূচক গোলে ইতিহাস গড়েছে তারা। এই ঐতিহাসিক জয়ের পর মাঠেই আবেগঘন উল্লাসে মেতে ওঠেন কানাডার খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফরা।
ম্যাচ শেষে মাঠে হার্ডেলে দলের খেলোয়াড়দের উদ্দেশে কানাডার প্রধান কোচ জেসি মার্শ বলেন, আজ আপনারা কানাডার নায়ক। এই দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যারা এই খেলাটি খেলবে, তাদের কাছে আপনারা নায়ক হিসেবে থাকবেন। কোচের এই বক্তব্যের পরই পুরো দলে করতালির রোল পড়ে যায়। মার্শকে তার ধূসর জিপ-টপে থাকা কানাডার প্রতীকে চুমু খেতে এবং ভাঙা পা নিয়ে ক্রাচে ভর দিয়ে উদযাপনে যোগ দেওয়া ইসমাইল কোনেকে বুকে জড়িয়ে আলিঙ্গন করতে দেখা যায়।
ম্যাচটি যখন নিশ্চিতভাবেই অতিরিক্ত সময়ের দিকে গড়াচ্ছিল, ঠিক তখনই আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। দ্বিতীয়ার্ধের অতিরিক্ত সময়ের খেলা শুরুর মাত্র চৌষট্টি সেকেন্ডের মাথায় দক্ষিণ আফ্রিকার ডিফেন্ডারদের একটি ক্লিয়ারেন্স বক্সের প্রান্তে বুক দিয়ে নামিয়ে নেন স্টিফেন ইউস্তাকিও। এরপর ডান পায়ের চমৎকার শটে বল জড়ান জালে। টুর্নামেন্টে প্রথমবার মাঠে নেমেই ৭৫ মিনিট পর্যন্ত অধিনায়কের আর্মব্যান্ড পরা ইউস্তাকিও দেশের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা জয়টি এনে দেন।
ম্যাচ শেষে ইউস্তাকিওকে নিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন কোচ মার্শ। ২০২৩ সালে মস্তিষ্কের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ইউস্তাকিওর মা এসমেরালদা এবং তার এক বছর পর হৃদরোগে বাবা আরমান্দো মারা যান। তাদের স্মরণ করে মার্শ বলেন, আমার মনে হয়, তার বাবা-মা কোথাও থেকে ওপর থেকে দেখছেন। এর চেয়ে যোগ্যতর মানুষ আমি আর ভাবতে পারি না।
গ্রুপ পর্বে হ্যামস্ট্রিং ইনজুরির কারণে দলের সেরা তারকা আলফোনসো ডেভিসকে নিয়ে কোনো তাড়াহুড়ো করতে চাননি মার্শ। বায়ার্ন মিউনিখের এই ফুল-ব্যাককে সামলানোর বিষয়টিকে তিনি একটি ‘ফেরারি গাড়ি’র সাথে তুলনা করেছেন। ২০২৫ সালের মার্চে অ্যান্টেরিয়র ক্রুসিয়েট লিগামেন্টে (এসিএল) চোট পেয়ে আট মাস মাঠের বাইরে ছিলেন ডেভিস। দলের উদ্বোধনী ম্যাচে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে খেলতে না পেরে গ্যালারিতে বসে কেঁদেছিলেন ডেভিস, তবে এই ম্যাচে ৭৫ মিনিটে বদলি হিসেবে মাঠে নামেন তিনি।
ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার খেলায় তেমন কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা লক্ষ্য করা যায়নি। দলটির একমাত্র অন-টার্গেট শটটি ছিল তেবোহো মোকোয়েনার ৩০ গজ দূর থেকে নেওয়া একটি শট। এমনকি দলটির গোলরক্ষক রনওয়েন উইলিয়ামস বল ধরে রেখে সময় নষ্ট করার কারণে দর্শকদের দুয়োধ্বনিও শোনেন।
পরাজয়ের পর দক্ষিণ আফ্রিকার ৭৪ বছর বয়সী প্রধান কোচ হুগো ব্রুস নিজের মেয়াদের সমাপ্তি নিয়ে স্পষ্ট কিছু না বললেও জানান, এটা আমার শেষ বিশ্বকাপ, এটা নিশ্চিত। হতাশ অবস্থায় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। আমরা যদি আরও এক রাউন্ড যেতে পারতাম, তবে তা অলৌকিক কিছু হতো।
কানাডার পরবর্তী ম্যাচ আগামী শুক্রবার, হিউস্টনে। সেখানে তারা মুখোমুখি হবে মরক্কো বনাম নেদারল্যান্ডস ম্যাচের বিজয়ী দলের। আগামী সোমবারের সেই ম্যাচটি মাঠে বসে দেখতে ইতিমধ্যেই মন্টেরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন মার্শ।
নিজেকে গর্বিত আমেরিকান দাবি করলেও কানাডিয়ানদের জীবনযাত্রার প্রশংসা করে মার্শ বলেন, কানাডিয়ানরা দয়া ও উদারতাকে মূল্য দেয়। আমেরিকানদের মাঝে মাঝে অহংকারী বলা হলেও লোকে কী বললো তাতে আমার কিছু যায় আসে না। পরবর্তী ম্যাচ নিয়ে তার আত্মবিশ্বাসী বার্তা, আমরা একটি দৈত্যের বিরুদ্ধে সবকিছু উজাড় করে দিতে প্রস্তুত থাকবো।
আজকালের খবর/ এমকে