প্রযুক্তির গতিতে এগিয়ে চলা, মানবিকতায় পিছিয়ে পড়া প্রযুক্তির কল্যানে আমাদের জীবনযাপন, দৈনন্দিন ক্জা কর্মকে অনেকটাই সহজ করে দিয়েছে। একটি মাত্র ডিভাইসকে ইচ্ছা মতো কমান্ড করে পছন্দের বা নির্ধারিত কাজ সম্পন্ন করা যাচ্ছে। এতে সময় কম লাগছে,সহজে কাজ করা যাচ্ছে কিস্তু সমস্যা হচ্ছে এতে মানুষের শ্রম,চিন্তা করার এবং নিজস্ব সক্রিয়তাকে নস্ট করছে।
পাশাপাশি মানুষকে অলস এবং প্রযুক্তি নির্ভর কর তুলছে। তাই যাযাবর তার দৃষ্টিপাত গ্রন্থে (ছদ্মনাম ) প্রকৃত নাম বিনয় কুমার মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন,‘বিজ্ঞান আমাদের দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ...... । এটা সত্যই যুগের সাথে পাল্লা দিয়ে প্রযুক্তির উপর ভর করে মানুষ,সমাজ,রাষ্ট্র এগুচ্ছে মানুষ। আর মানুষ এর সঙ্গে নিজেদের মেলাতে গিয়ে অর্থ্যা গতির সাথে মিলে মিশে আবেগ,সামাজিকতা.মানবিকতা,সহ সবরকমের লৌকিক আচার আচরন,রীতি নীতি থেকে মানুষ ক্রমশ সরে যাচ্ছে যোজন যোজন দূরে। আর মানুষের এই গতিময়তায় আছে কালচারের পরিচয়, আর আড়ম্বরের মধ্যে আছে দম্ভের বহি:প্রকাশ। আবার এই দম্ভ কখনও অর্থের, কখনো বিদ্যার, কখনও-বা প্রতিপত্তির।
জীবনের এই গতিময়তায় জীবন, প্রেম, প্রকৃতি, মানবতা মানুষের কাছে হয়ে ওঠ এক যন্ত্র চালিত বাহনের মতো। তাই জীবনকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দেখেছেন এক বহমান নদীর মতো। তাঁর মতে, জীবন থেমে থাকার নয়, এগিয়ে চলার নামই হচ্ছে জীবন। জীবনের জয়গান গেয়ে তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কিভাবে প্রতিকূলতার মধ্যেও হাসিমুখে বাঁচতে হয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বিজ্ঞানের এই যুগে মানুষ প্রতিকুলতায় নিজেদের মেলাতে পারছেনা। এ কারণে পারস্পপরিক বিশ্বাস, সন্দেহ, বিভেধ এর দেয়াল ক্রমশ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। সমাজ সংসারে অস্থিরতা,সংঘাত লেগে আছে।
কারণ বর্তমান সময়ে যখন চারপাশে অবিশ্বাস আর সন্দেহের মেঘ, তখন রবীন্দ্রনাথের এই উক্তিটি আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। মানুষের প্রতি বিশ্বাস রাখাটা জরুরি, কারণ বিশ্বাসই পারে সুন্দর একটা সমাজ গড়তে। বাস্তবতা হচ্ছে মানুষ বর্তমানে মোবাইল ডিভাইসে দিনের অধিকাংশ সময় আসক্ত থাকায় বই থেকে,সামাজিকতা,লৌকিকতা থেকে,মানবিকতা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু বই পড়ার অভ্যাস করতে হবে। কারণ বইকে,মানুষকে ভালোবাসতে শেখানোই হলো শিক্ষার আসল কাজ।” কারণ বই আমাদের জ্ঞানের ভা-ার খুলে দেয়। তাই রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, বই পড়ার মাধ্যমে আমরা নতুন জগৎ ও নতুন চিন্তাভাবনার সঙ্গে পরিচিত হই। তাই ছোট বেলা থেকেই বই পড়ার আগ্রহ তৈরি করা শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত। কারণ আমাদের সামনে অন্ধকার যতই গভীর হোক না কেন, আলোর আগমন অনিবার্য। এই আলোর জন্য প্রয়োজন শিক্ষা।
বর্তমান বিশ্ব প্রযুক্তিনির্ভর। বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার ফলে মানুষের জীবনযাপন, দৈনন্দিন কাজকর্ম এবং যোগাযোগব্যবস্থা অভূতপূর্বভাবে সহজ ও গতিশীল হয়েছে। একটি মাত্র স্মার্ট ডিভাইসের মাধ্যমে মানুষ ঘরে বসেই ব্যাংকিং, কেনাকাটা, শিক্ষা, চিকিৎসা, অফিসের কাজ কিংবা বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের মানুষের সঙ্গে মুহূর্তেই যোগাযোগ করতে পারছে। প্রযুক্তি আমাদের সময় ও শ্রম বাঁচিয়েছে, উৎপাদনশীলতা বাড়িয়েছে এবং জীবনকে অনেক বেশি আরামদায়ক করেছে।
কিন্তু উন্নয়নের পাশাপাশি কিছু উদ্বেগজনক দিকও ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার মানুষের চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা, শারীরিক শ্রম এবং সামাজিক সক্রিয়তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। মানুষ ক্রমশ অলস, আত্মকেন্দ্রিক এবং প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়ছে। প্রযুক্তির কারণে মানুষের কাজের গতি যেমন বেড়েছে, তেমনি মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক, সহমর্মিতা, আন্তরিকতা এবং আবেগের প্রকাশ অনেকাংশে কমে গেছে। মানুষ এখন বাস্তবের চেয়ে ভার্চুয়াল জগতে বেশি সময় কাটায়। ফলে পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক আগের মতো উষ্ণ থাকে না।
আজ মানুষ, সমাজ ও রাষ্ট্র উন্নয়নের দৌড়ে প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে দ্রুত এগিয়ে চলেছে। কিন্তু এই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে মানুষ ধীরে ধীরে সামাজিকতা, মানবিকতা, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। লৌকিক আচার-অনুষ্ঠান, পারিবারিক বন্ধন, সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক সহযোগিতার পরিবর্তে প্রতিযোগিতা, ভোগবাদ এবং আত্মপ্রদর্শনের প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আধুনিক জীবনের চাকচিক্যের আড়ালে অনেক সময় অহংকার ও আত্মগৌরবের প্রকাশ ঘটে। এই দম্ভ কখনো অর্থের, কখনো শিক্ষার, আবার কখনো সামাজিক প্রতিপত্তির।
জীবনের এই যান্ত্রিকতায় মানুষ যেন অনুভূতিহীন হয়ে পড়ছে। প্রেম, প্রকৃতি, মানবতা ও নৈতিকতার মতো বিষয়গুলো অনেকের কাছে গৌণ হয়ে যাচ্ছে। অথচ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবনকে কখনো যন্ত্রের সঙ্গে তুলনা করেননি। তিনি জীবনকে দেখেছেন একটি বহমান নদীর মতো, যার মূল বৈশিষ্ট্য হলো অবিরাম গতি। তাঁর মতে, জীবন থেমে থাকার নয়; প্রতিকূলতাকে জয় করে সামনে এগিয়ে যাওয়াই জীবনের প্রকৃত অর্থ। তাঁর সাহিত্য ও দর্শন আমাদের শেখায়, দুঃসময়ের মধ্যেও আশাবাদী থাকতে হবে এবং মানবিক মূল্যবোধকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যেতে হবে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে মানুষ সামান্য প্রতিকূলতাও সহজে মোকাবিলা করতে পারছে না। পারস্পরিক বিশ্বাসের জায়গায় সন্দেহ, সহযোগিতার জায়গায় প্রতিযোগিতা এবং ভালোবাসার জায়গায় স্বার্থপরতা স্থান করে নিচ্ছে। ফলে পরিবার ও সমাজে অস্থিরতা, দ্বন্দ্ব এবং মানসিক দূরত্ব দিন দিন বেড়েই চলেছে। মানুষের মধ্যে বিশ্বাসের সংকট একটি বড় সামাজিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। অথচ একটি সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তুলতে পারস্পরিক বিশ্বাস, সহমর্মিতা এবং মানবিকতার কোনো বিকল্প নেই।
বর্তমান সময়ে আরেকটি বড় সমস্যা হলো মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত আসক্তি। শিশু থেকে বৃদ্ধসব বয়সের মানুষই দিনের একটি বড় অংশ মোবাইলের পর্দায় কাটিয়ে দিচ্ছেন। এর ফলে বই পড়ার অভ্যাস কমছে, পারিবারিক আলাপচারিতা হ্রাস পাচ্ছে এবং সামাজিক মেলামেশাও সীমিত হয়ে আসছে। মানুষ বাস্তব জীবনের পরিবর্তে ভার্চুয়াল জগতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। অথচ বই মানুষকে চিন্তা করতে শেখায়, কল্পনাশক্তিকে সমৃদ্ধ করে এবং মানবিক মূল্যবোধ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মনে করতেন, শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য কেবল তথ্য অর্জন নয়; বরং মানুষকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। বই পড়ার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান, নতুন চিন্তা এবং নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে পরিচিত হওয়া যায়। তাই শিশু-কিশোরদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। কারণ একটি বই একজন মানুষের জীবনদর্শন পরিবর্তন করে দিতে পারে। যতই অন্ধকার নেমে আসুক না কেন, জ্ঞানের আলো মানুষকে সঠিক পথ দেখাতে পারে।
প্রযুক্তির অপব্যবহারের ফলে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যও আজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের জীবন দেখে নিজের জীবনের সঙ্গে তুলনা, একাকিত্ব, সম্পর্কের ভাঙন, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ এসব কারণে অনেক মানুষ মানসিক চাপে ভুগছেন। সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া কিংবা জীবনের কোনো ব্যর্থতা অনেকের কাছে অসহনীয় হয়ে উঠছে। পরিবার ও সমাজ অনেক সময় একজন মানুষের মানসিক কষ্টকে গুরুত্ব দেয় না। বরং তাকে দ্রুত নতুন সিদ্ধান্ত নিতে চাপ দেয়, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
বিশেষ করে শহুরে জীবনে একাকিত্ব মানুষের মানসিক সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। অনেকেই বন্ধু, পরিবার কিংবা সহকর্মীদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় মানসিক সমর্থন পান না। ফলে হতাশা, উদ্বেগ এবং আত্মহত্যার চিন্তাও অনেকের মধ্যে দেখা দেয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, সমাজে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে এখনও নানা ভুল ধারণা ও কুসংস্কার রয়েছে। তাই অনেক মানুষ চিকিৎসকের কাছে যেতে সংকোচ বোধ করেন।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশু বিভিন্ন ধরনের মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হলেও অধিকাংশ মানুষ চিকিৎসাসেবার বাইরে রয়েছেন। সচেতনতার অভাব, সামাজিক লজ্জা, পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট এবং মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে ভুল ধারণা এই অবস্থার অন্যতম কারণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে পরিস্থিতির উন্নতি করতে হলে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
প্রযুক্তি তাই আমাদের শত্রু নয়, বরং সচেতনভাবে ব্যবহারের একটি উপায় হিসেবে দেখতে হবে। প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করার জন্য, মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নয়। প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং মানসিক সুস্থতার প্রতিও সমান গুরুত্ব দিতে হবে,চ্চর্চা করতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত বই পড়া, পরিবারকে সময় দেওয়া, প্রকৃতির কাছাকাছি থাকা, শরীরচর্চা করা এবং বাস্তব জীবনের সম্পর্কগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া আমাদের মানসিক ও সামাজিক জীবনকে সমৃদ্ধ করতে পারে।
প্রত্যাশা, প্রযুক্তির কল্যাণে মানবসভ্যতা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে এবং আরো এগিয়ে যাবে। তবে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারলে এর নেতিবাচক প্রভাব আমাদের ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজজীবনে গভীর সংকট সৃষ্টি করবে। তাই আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি মানবিকতা, নৈতিকতা, বই পড়ার অভ্যাস, পারস্পরিক বিশ্বাস এবং সামাজিক দায়বদ্ধতাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলেই প্রযুক্তি হবে মানুষের প্রকৃত বন্ধু এবং উন্নত, মানবিক ও সুন্দর সমাজ গঠনের অন্যতম শক্তি।
লেখক: সম্পাদক-ক্লাইমেট জার্নাল২৪.কম এবং সাধারণ সম্পাদক-বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ জার্নালিস্ট ফোরাম
আজকালের খবর/ এমকে