নওগাঁর বিভিন্ন হাটে ইজারাদার ও ব্যবসায়ীদের (ব্যাপারি) জুলুমে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন স্থানীয় কৃষকরা। শুকনা বা ধলতার নামে সবজি ও আমের ওজনে মনপ্রতি অতিরিক্ত ২ থেকে ৮ কেজি পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে। এর পাশাপাশি নিয়মবহির্ভূতভাবে কৃষকদের কাছ থেকে জোরপূর্বক খাজনা আদায়েরও অভিযোগ উঠেছে। পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ে ওজনে অনিয়ম বন্ধে গত ২৭ এপ্রিল কৃষি বিপণন অধিদপ্তর থেকে মনপ্রতি ৪০ কেজির বেশি না নেওয়ার কঠোর নির্দেশনা দিয়ে একটি পরিপত্র জারি করা হলেও, বাস্তবে এর কোনো প্রয়োগ নেই। প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে সরকারি এই পরিপত্র কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।
সরেজমিনে সবজিভাণ্ডার ও জিআই সনদপ্রাপ্ত নাকফজলি আমের জন্য বিখ্যাত বদলগাছী উপজেলা সদরের বদলগাছী হাটে গিয়ে অনিয়মের এই চিত্র দেখা যায়। সপ্তাহে দুই দিন বসা কোটি টাকার এই হাটে কৃষকরা সবজি নিয়ে ঢুকলেই প্রথমে তোলার নামে (হাট ঝাড়ুদারকে) দিতে হয় মনপ্রতি এক কেজি সবজি। এরপর দরদাম শেষে বিক্রির সময় ব্যবসায়ীরা ধলতার নামে মনপ্রতি ২ থেকে ৩ কেজি বেশি নিচ্ছেন। এখানেই শেষ নয়, নিয়ম না থাকলেও কৃষকদের কাছ থেকে জোর করে পটল ও আলু মনপ্রতি ২০ টাকা এবং মরিচসহ অন্যান্য সবজি ৪০ টাকা হারে খাজনা কেটে নেওয়া হচ্ছে। আর আমের ক্ষেত্রে মনপ্রতি অতিরিক্ত ৮ কেজি পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে। উপজেলার কোলা, ভান্ডারপুর, চাঁদপুর ও বদলগাছী হাটে বর্তমানে সরকারি তত্ত্বাবধানে খাস আদায় চললেও সেখানেও সরকারি নিয়ম মানা হচ্ছে না। ফলে ওজনের এই হেরফের নিয়ে হাটে প্রতিনিয়ত কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে হট্টগোল লেগেই আছে।
চকনরেসিং গ্রামের ভুক্তভোগী কৃষক সাহানুর ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "শুনেছি ওজন বেশি নেওয়া বন্ধে কৃষি অধিদপ্তর থেকে পরিপত্র জারি করা হয়েছে। কিন্তু হাটে এর কোনো বাস্তব প্রয়োগ নেই। ব্যবসায়ীরা জোর করে মনপ্রতি ৩-৪ কেজি বেশি নিচ্ছে, আবার অন্যায়ভাবে খাজনাও কাটছে। আমরা অবিলম্বে এই অন্যায়ের প্রতিকার এবং পরিপত্রের বাস্তবায়ন চাই।"
অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে সবজি ব্যবসায়ী ওয়ারেজ বাবু জানান, সবজি ভেজা থাকায় শুকিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তাঁরা সামান্য ধলতা নিচ্ছেন। তবে কৃষকদের কাছ থেকে খাজনা নেওয়ার বিষয়টি ইজারাদারদের নির্দেশে হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন। সরকারি পরিপত্র বা নির্দেশনার বিষয়ে তাঁরা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে অবগত নন বলেও জানান এই ব্যবসায়ী।
এ ব্যাপারে বদলগাছী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইসরাত জাহান ছনি বলেন, "আমরা সরকারি পরিপত্র পেয়েছি এবং ইতিমধ্যেই বাজার মনিটরিং শুরু করেছি। কোনো ভুক্তভোগী কৃষকের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
নওগাঁর জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল ইসলাম জানান, পরিপত্র জারির পর থেকেই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা মাঠে কাজ করছেন। কৃষকদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে উল্লেখ করে তিনি জানান, হাটের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে দ্রুতই একটি সমন্বয় সভা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
জেলার ছোট-বড় ১০৪টি হাটে প্রতিদিন কৃষকদের পকেট কাটার এই অনিয়ম বন্ধে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের দ্রুত ও স্থায়ী হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী কৃষকেরা।
আজকালের খবর/কাওছার আল হাবীব