সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় র্যাবের অস্থায়ী ক্যাম্পে হামলার ঘটনায় দীর্ঘ ১১ ঘণ্টার যৌথ অভিযান শেষে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে জানিয়েছে র্যাব-৭। এ ঘটনায় ২৫ জনকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়েছে।
সোমবার (২৫ মে) দুপুর ১২টার দিকে অভিযান শেষে এসব তথ্য জানান র্যাব-৭ চট্টগ্রামের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান।
তিনি জানান, রবিবার দিবাগত রাত দুইটার দিকে প্রায় ৩০০ সন্ত্রাসী অতর্কিতে জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর এলাকায় র্যাবের অস্থায়ী ক্যাম্পে হামলা চালায়। হামলাকারীরা ক্যাম্প লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে এবং বুলডোজার দিয়ে ক্যাম্পের দেয়ালসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ভাঙচুর করে। র্যাব অধিনায়ক বলেন, ক্যাম্পে থাকা প্রায় ১৫০ র্যাব ও পুলিশ সদস্য তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ফাঁকা গুলি ছোড়া হয়। পরে অতিরিক্ত ফোর্স নিয়ে যৌথ বাহিনী অভিযান পরিচালনা করে।
তিনি আরও বলেন, হামলার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা যাতে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে না পারেন সে জন্য অন্তত চারটি স্থানে রাস্তা ও কালভার্ট কেটে দেয় হামলাকারীরা। ফলে সদস্যদের গাড়ি অনেক দূরে রেখে পায়ে হেঁটে ঘটনাস্থলে যেতে হয়।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান জানান, এখন পর্যন্ত ২৫ জনকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। হামলার সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।তিনি দাবি করেন, ‘সন্ত্রাসী’ ইয়াসিন বাহিনী পরিকল্পিতভাবে এ হামলা চালিয়েছে। তবে অভিযানের এক পর্যায়ে বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসী পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্য গুরুতর আহত হননি বলেও জানান তিনি।
এদিকে র্যাব কর্মকর্তা কামাল হোসেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওবার্তায় দাবি করেন, সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন স্থানে রাস্তা কেটে দিয়ে বাহিনীর অভিযান ব্যাহত করার চেষ্টা করে। তবে সব বাধা অতিক্রম করে যৌথ বাহিনী অভিযান চালায়।
এদিকে সলিমপুরের ফের হামলার এই ঘটনা নিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম। এসময় তিনি ঘটনাটিকে কোটি টাকার সাম্রাজ্য হারাতে বসা সন্ত্রাসীদের ঝাঁকুনি বলে অভিহিত করেন।
এসপি মাসুদ আলম বলেন, এই জঙ্গল সলিমপুর সন্ত্রাসীদের একটা বড় স্বার্থের এবং ইন্টারেস্টের জায়গা। এগুলো প্রতিটা টাকার বিষয়। কোটি কোটি টাকার বিশাল এ সাম্রাজ্য যখন তাদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে, তখন হাতছাড়া হওয়ার আগে তারা একটা ঝামেলার দিকে যাচ্ছে। তারা যতই ঝামেলার দিকে যাক, আমরা প্রতিহত করতে চেষ্টা করব। এসময় তিনি জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সেখানে অবস্থান করছে। সামনে প্রয়োজনে আরও বেশি পরিমাণে ফোর্স মোতায়েন করা হবে এবং সে অনুযায়ী কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
হামলার মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত ইয়াসিন নামের ওই ব্যক্তির বিষয়ে এসপি বলেন, এই ইয়াসিন নামের ব্যক্তিটি সম্প্রতি এখানে তৎপরতা শুরু করেছে। আমাদের মনে হচ্ছে, ওর ব্যাকগ্রাউন্ড বা ওর পেছনে কেউ থাকতে পারে। তদন্ত সাপেক্ষে আমরা তা শনাক্ত করার চেষ্টা করছি। তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মূল উদ্দেশ্যের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে এই জনপদে যেকোনো মূল্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। একে যেন আবার দেশের ভেতরে আরেক দেশ বা কোনো রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র না বানানো হয়, তার জন্য যা যা করা দরকার আমরা করবো।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান ঠেকাতে সন্ত্রাসীরা জঙ্গল সলিমপুরের প্রবেশমুখের অন্তত চারটি রাস্তা কেটে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। তবে সেই বাঁধা উপেক্ষা করেই ভোররাত থেকে যৌথবাহিনীর সদস্যরা অভিযান শুরু করে। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এলাকাটিতে ব্যাপক তল্লাশি চালিয়ে জড়িত সন্দেহে এদের আটক করা হয়েছে।
জানা গেছে, দীর্ঘ তিন দশক ধরে জঙ্গল সলিমপুরের সরকারি খাস জমি দখল করে ভূমিদস্যু ও বিভিন্ন সন্ত্রাসীগোষ্ঠী নিজস্ব রাজত্ব চালিয়ে আসছিল। চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি এখানে অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলায় র্যাবের এক কর্মকর্তা নিহত হওয়ার পর গত ৯ মার্চ যৌথবাহিনীর প্রায় ৪ হাজার সদস্য অভিযান চালিয়ে এলাকাটি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। এরপর সেখানে স্থায়ী ক্যাম্প নির্মাণ করা হলেও তা ভেঙে দেয় সন্ত্রাসীরা। তাদের আধিপত্য ফিরে পেতে এই দুঃসাহসিক হামলা চালায় তারা।সেখানে র্যাবের একটি ক্যাম্প নির্মাণের কাজ চলছিল। রবিবার রাতের হামলায় সেই ক্যাম্পের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে র্যাব।
আজকালের খবর/বিএস