মঙ্গলবার ২১ জুলাই ২০২৬
প্রযুক্তির অভাবে অগাধ সম্পদ আহরণই বড় চ্যালঞ্জ
সুনীল অর্থনীতি: বঙ্গোপসাগরে লুকানো নতুন বাংলাদেশ
সমুদ্রে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় যুক্ত অত্যাধুনিক জাহাজ
প্রকাশ: সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬, ১১:১৬ পিএম   (ভিজিট : ১৯)
একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব অর্থনীতিতে ‘ব্লু ইকোনমি’ বা সুনীল অর্থনীতি একটি অত্যন্ত গতিশীল ও প্রভাবশালী ধারণা হিসেবে বিকশিত হয়েছে। সমুদ্রের বিশাল জলরাশির নিচে সঞ্চিত তেল, গ্যাস, মূল্যবান খনিজ পদার্থ এবং বৈচিত্র্যময় সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপর ভিত্তি করেই আজ বিশ্বের বহু উন্নত দেশের শহর, বন্দর, সভ্যতা ও আধুনিক অর্থনীতি নতুন রূপ লাভ করেছে। ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে বাংলাদেশ একটি অত্যন্ত সৌভাগ্যবান দেশ, যার দক্ষিণে রয়েছে বিশাল ও বিস্তৃত বঙ্গোপসাগর। 

তবে এই বিশাল সমুদ্র এলাকা এবং অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় ধরে তা দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, আধুনিক অবকাঠামো এবং সঠিক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবের কারণে আমাদের সমুদ্রসম্পদ এতদিন ধরে একপ্রকার অব্যবহৃত ও অনাবিষ্কৃতই থেকে গেছে। অতীতে বিভিন্ন সরকারের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক দরপত্র বা টেন্ডার আহ্বান করে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করা হলেও বাস্তবতার মুখ দেখেনি সেসব উদ্যোগ। 

এমনকি পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও সহজ শর্তে বড় পরিসরে টেন্ডার আহ্বান করা সত্ত্বেও তা চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করতে পারেনি। বর্তমানে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে দায়িত্ব     গ্রহণকারী নতুন জাতীয়তাবাদী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ ও দেশের সাধারণ মানুষ। 

সুনীল অর্থনীতির এই স্থবিরতা কাটিয়ে তুলে নতুন সরকার কার্যকর কোনো বৈপ্লবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে বলে তারা আশা প্রকাশ করছেন। সমুদ্রের অর্থনীতির এই দীর্ঘ স্থবিরতার পেছনের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করতে গিয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ের বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেন। 

তিনি উল্লেখ করেন, ২০১২ সালে মিয়ানমার এবং ২০১৪ সালে ভারতের বিরুদ্ধে সমুদ্রসীমা-সংক্রান্ত ঐতিহাসিক আন্তর্জাতিক মামলায় বিজয়ী হয়ে বাংলাদেশ ১ লাখ ১৮ হাজার ৮২৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রসীমার ওপর সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জন করে। কিন্তু চরম পরিতাপের বিষয় হলো, গত এক থেকে দেড় দশকে এই বিশাল এলাকা থেকে শুধু তেল-গ্যাস অনুসন্ধানই নয়, অন্য কোনো সম্পদ আহরণের জন্যও দৃশ্যমান ও কার্যকর কোনো প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়নি। যদিও এ দীর্ঘ সময়ে সুনীল অর্থনীতি নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও কর্মশালা আয়োজনের নামে কোটি কোটি ডলার অপচয় করা হয়েছে। 

এমনকি ২০২৪ সাল পর্যন্ত নিজেদের সমুদ্রসীমায় আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোকে আকর্ষণ করার জন্য একটি মাল্টি-ক্লায়েন্ট সিসমিক সার্ভে বা বহুমাত্রিক ভূ-কম্পন জরিপ পর্যন্ত বাংলাদেশ সম্পূর্ণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। কয়েক বছর আগে মার্কিন বহুজাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানি এক্সন-মবিল বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রের ১৫টি ব্লকে বিশাল বিনিয়োগ ও তেল অনুসন্ধানের তীব্র আগ্রহ দেখালেও ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত টেন্ডারে তারা আর অংশ নেয়নি।

তবে বর্তমান নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এই বিষয়ে কিছু ইতিবাচক ও নতুন উদ্যোগ লক্ষ করা যাচ্ছে। সম্প্রতি মালায়শিয়া ও চীন সফরের সময় দেশটির অফ-শোর ব্লকগুলোতে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগের জন্য উভয় দেশের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। চীন ইতোমধ্যে মিয়ানমারের সমুদ্রসীমায় সফলভাবে গ্যাস আহরণ করে আসছে, ফলে তাদের এই আমন্ত্রণে সাড়া দেওয়ার বিষয়ে যেমন নানা সমীকরণ রয়েছে, তেমনি বাংলাদেশ সরকারও বসে নেই। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা সম্প্রতি সমুদ্রসীমার ব্লকগুলোতে বৈশ্বিক বিনিয়োগ উৎসাহিত করার লক্ষ্যে নতুন করে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

সমুদ্রে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় নতুন দিগন্ত: নিজস্ব অত্যাধুনিক গবেষণাপোত বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা ছিল গভীর সমুদ্রে বৈজ্ঞানিক গবেষণা চালানোর নিজস্ব প্রযুক্তির অভাব। এই দীর্ঘদিনের স্থবিরতা ও সীমাবদ্ধতা দূর করতে দেশে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বোরি) জন্য আন্তর্জাতিক মানের একটি অত্যাধুনিক ও বিশ্বমানের গবেষণা জাহাজ নির্মাণের ঐতিহাসিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

খুলনা শিপইয়ার্ডে নৌবাহিনীর পরিচালনায় প্রায় ১৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে জাহাজটি নির্মিত হচ্ছে। এই বিশ্বমানের গবেষণাপোতের নকশা প্রণয়ন করেছে যুক্তরাজ্যের প্রখ্যাত সামুদ্রিক নকশা প্রতিষ্ঠান ‘কিল মেরিন’। আর জাহাজটিতে সংযোজনের জন্য প্রয়োজনীয় অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও আধুনিক বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করা হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশ, চীন, তুরস্ক এবং সিঙ্গাপুর থেকে। 

চুক্তি অনুযায়ী ২০২৮ সালের জুন মাসের মধ্যে জাহাজটি বোরির বহরে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিবেশ, ওশানোগ্রাফি ও জলবায়ু বিভাগের প্রধান এবং জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু শরীফ মো. মাহবুব-ই-কিবরিয়া এ বিষয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে জানান, প্রচলিত দেশীয় নৌযানগুলোর সীমাবদ্ধতার কারণে বর্তমানে বাংলাদেশের সমুদ্রে গবেষণা কর্মকাণ্ড শুধুমাত্র উপকূলীয় অঞ্চল ও অগভীর পানিতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। 

এর ফলে সমুদ্রের ওপরের স্তরের তাপমাত্রা, লবণাক্ততা কিংবা প্ল্যাংকটনের মতো প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহের বাইরে গভীর সমুদ্রের বিশাল পরিবেশ ও তলদেশ নিয়ে কোনো বড় ধরনের বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান চালানো সম্ভব হয়নি। নতুন এই সর্বাধুনিক গবেষণাপোত যুক্ত হলে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো গভীর সমুদ্র, সমুদ্রের একদম তলদেশ এবং পানির বিভিন্ন গভীরতম স্তরে আন্তর্জাতিক মানের নিখুঁত গবেষণা পরিচালনা করতে পারবে।

জাহাজটিতে সংযোজিত আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সমুদ্রতলের নিচের ভূতাত্ত্বিক গঠন, পলির সুনির্দিষ্ট স্তর, গ্যাস হাইড্রেটের সম্ভাব্য বিশাল অবস্থান, মূল্যবান খনিজ সম্পদ ও সমুদ্রতলের ত্রিমাত্রিক (৩ডি) ডিজিটাল মানচিত্র অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে নির্ণয় করা সম্ভব হবে। 

শুধু তাই নয়, সমুদ্রের তলদেশের পলি, মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ এবং ভারী ধাতুর ঘনত্ব বিশ্লেষণ করে অতীতের জলবায়ু পরিবর্তনের ধারাবাহিক ইতিহাস, সমুদ্রের কার্বন ধারণক্ষমতা এবং সামুদ্রিক দূষণের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জানা সম্ভব হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই জাহাজটির মাধ্যমে প্রাপ্ত বৈজ্ঞানিক তথ্যাবলি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সুনীল অর্থনীতির বৈজ্ঞানিক ও টেকসই ব্যবস্থাপনায় বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখবে।

সুনীল অর্থনীতির বহুমাত্রিক ধারণা ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: 

সহজ ভাষায় ব্লু ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতি হলো নদী, সাগর ও উপকূলীয় জলরাশির প্রাকৃতিক সম্পদভিত্তিক এক সুবিশাল অর্থনীতি। 

বিশ্বব্যাংকের সংজ্ঞা অনুযায়ী, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন, উন্নত জীবিকা সংস্থান এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের স্বাস্থ্য রক্ষা করে সামুদ্রিক সম্পদের টেকসই ব্যবহারই হলো সুনীল অর্থনীতি। আবার ইউরোপীয় কমিশন একে নদী, সাগর এবং উপকূলীয় অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্কিত যেকোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচনা করে। সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ, লবণ উৎপাদন, নৌ-পরিবহন ও বন্দর সেবা, উপকূলীয় পর্যটন, খনিজ সম্পদ ও তেল-গ্যাস উত্তোলন, সামুদ্রিক শৈবাল চাষ, মেরিকালচার এবং জাহাজ নির্মাণ ও পুনর্ব্যবহার শিল্প—এ সবই সুনীল অর্থনীতির মূল স্তম্ভ।

বিশ্ব প্রেক্ষাপটে সুনীল অর্থনীতির অবদান অপরিসীম। তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর ৪৩০ কোটি মানুষের মোট প্রাণিজ প্রোটিনের প্রায় ১৫ শতাংশ আসে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ থেকে। বিশ্ব জনসংখ্যার ১০ থেকে ১২ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জীবন ও জীবিকার জন্য এই সমুদ্রের ওপরই সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল। বর্তমানে পৃথিবীর মোট ব্যবহৃত জ্বালানি তেল ও গ্যাসের প্রায় ৩০ শতাংশই পরিবাহিত ও উত্তোলিত হয় সমুদ্রতলের বিভিন্ন তেল ও গ্যাসক্ষেত্র থেকে। 

তদুপরি, বৈশ্বিক বাণিজ্যিকভাবে পরিবহনের প্রায় ৯০ শতাংশ পথই হলো সমুদ্রপথ। ইউরোপের উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলো কেবল সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতি থেকে প্রতি বছর শত শত বিলিয়ন ইউরো উপার্জন করে, যা তাদের অর্জিত মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত যোগান দেয়। বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন ১৫০টিরও বেশি দেশের প্রায় ৫০ হাজারেরও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ সাগরে চলাচল করে, যেখানে কোটি কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।

প্রাকৃতিক এই সম্পদ মানবজাতির জন্য এক অপূর্ব আশীর্বাদ, কারণ সমুদ্রের মাছ বা লবণ উৎপাদনের জন্য মানুষকে কোনো কৃত্রিম বীজ বা সার প্রয়োগ করতে হয় না। অথচ সাগরের প্রবেশাধিকারবিহীন ভূবেষ্টিত (ল্যান্ডলকড) রাষ্ট্রগুলোকে তাদের প্রয়োজনীয় মৎস্য ও লবণ শতভাগ চড়া দামে আমদানি করতে হয়।

বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিতে সামুদ্রিক খাতের বিশাল সম্ভাবনা: নদীমাতৃক এবং দক্ষিণে দীর্ঘ সমুদ্রতট পরিবেষ্টিত বাংলাদেশের সামুদ্রিক সম্পদের সম্ভাবনা অসীম। বঙ্গোপসাগরের অববাহিকাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ যেমন নিজের ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে, তেমনি বৈশ্বিক বাণিজ্য ও রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে পারবে। বর্তমানে উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ৩০ লাখ পরিবার সরাসরি মৎস্য আহরণ ও সংশ্লিষ্ট জীবিকার সঙ্গে যুক্ত।

এছাড়া সমুদ্রের নোনা পানি ব্যবহার করে বাংলাদেশে যে লবণ শিল্প গড়ে উঠেছে, তার বার্ষিক অর্থনৈতিক অবদান প্রায় ২,৫০০ থেকে ৩,০০০ কোটি টাকা। আধুনিক রূপান্তর ও সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই লবণ দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও বিপুল পরিমাণে রপ্তানি করা সম্ভব।

শিপবিল্ডিং বা জাহাজ নির্মাণশিল্পে বাংলাদেশ বিশ্বে ১৩তম অবস্থান অর্জন করেছে এবং জাহাজ ভাঙা বা শিপ ব্রেকিং শিল্পে বিশ্বে ৩য় স্থান দখল করে আছে। পৃথিবীর মোট জাহাজ ভাঙা কর্মকাণ্ডের প্রায় ২৪.৮ শতাংশ একাই সম্পাদিত হয় বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে। দীর্ঘ উপকূলীয় অঞ্চল, বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিশাল এলাকাকে যদি পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে গড়ে তোলা যায়, তবে তা জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে অভাবনীয় অবদান রাখতে সক্ষম হবে। অপরদিকে, পর্যটন খাতকে কেন্দ্র করে সুনীল অর্থনীতির বিকাশ ঘটার বিশাল অবকাশ রয়েছে।

বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার এবং একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনকে যদি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করে উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, তবে বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে দেশের পর্যটন খাত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২৭ লাখ ১৪ হাজার ৫০০ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে, যা দেশের মোট কর্মসংস্থানের ৩.৭ শতাংশ।

এছাড়াও কুয়াকাটা, সুন্দরবন, কুতুবদিয়া এবং নতুন ফেরি যোগাযোগের আওতায় আসা সন্দ্বীপের মতো দৃষ্টিনন্দন উপকূলীয় অঞ্চলগুলোকে পরিকল্পিত পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হলো, বঙ্গোপসাগরের তলদেশে পাওয়া বিপুল পরিমাণ মূল্যবান ভারী খনিজ (হেভি মিনারেল)। 

আমাদের সমুদ্রসীমায় ইলমেনাইট, টাইটেনিয়াম অক্সাইড, রুটাইল, জিরকন, গার্নেট, ম্যাগনেটাইট, মোনাজাইট এবং কোবাল্টের মতো অত্যন্ত দামি খনিজের উপস্থিতি সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে। আধুনিক ও টেকসই উপায়ে এ সকল দুর্লভ খনিজ সম্পদ উত্তোলন করা সম্ভব হলে প্রতি বছর দেশের কোষাগারে হাজার হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা যুক্ত হবে। তদুপরি সামুদ্রিক জীব ও উপাদান থেকে কসমেটিকস, উন্নতমানের পুষ্টিসম্পূরক, খাদ্যদ্রব্য ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধ তৈরির গবেষণাও দিন দিন উন্মোচিত হচ্ছে। 

নৌ-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ এবং দেশের বিদ্যমান বন্দরগুলোর অবকাঠামোগত সক্ষমতা ও ফিডার সার্ভিস বহুগুণ বাড়াতে পারলে এগুলো আঞ্চলিক লজিস্টিকস হাব হিসেবে গড়ে উঠবে। ফলে সিঙ্গাপুর বা কলম্বো বন্দরের মতো আমাদের বন্দরগুলোও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এছাড়া দীর্ঘ ৭১০ কিলোমিটার উপকূল রেখা থাকা সত্ত্বেও সমুদ্রের জোয়ার-ভাটাকে কাজে লাগিয়ে পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে বৈশ্বিক প্রযুক্তি রয়েছে, বাংলাদেশ এখনও তা ব্যবহার শুরু করতে পারেনি, যা ভবিষ্যতের এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার।

গতিহীন গবেষণা, কারিগরি সীমাবদ্ধতা ও টেকসই সমাধানের পথ: উজ্জ্বল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বিশ্ব উন্নয়নের দৌড়ে বাংলাদেশ এখনো অনেকটাই পিছিয়ে আছে। সমুদ্রের বিপুল সম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় হলো জরিপ ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার মন্থর গতি এবং উচ্চতর কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ জনবলের তীব্র ঘাটতি। 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী মনে করেন, আমাদের অধিকারভুক্ত বিশাল সমুদ্রসীমা ও উপকূলীয় অঞ্চলের সম্পদকে সঠিকভাবে আহরণ, ব্যবহার ও বিশ্ববাজারে রপ্তানি করতে না পারার মূল কারণ অনুসন্ধান ও গবেষণায় গতিহীনতা। তিনি জোর দিয়ে বলেন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে হলে সমুদ্রসম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে দেশীয় বাস্তবতার আলোকে নতুন নতুন প্রযুক্তিবান্ধব পন্থা উদ্ভাবন করা অত্যন্ত জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের প্রাক্কলন অনুযায়ী, সমুদ্র থেকে শুধু টেকসই উপায়ে মাছ শিকার ও রপ্তানি করেই বছরে ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব। সামুদ্রিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেভ আওয়ার সি’-এর দেওয়া উপাত্ত অনুযায়ী, প্রতি বছর সমগ্র বঙ্গোপসাগর থেকে আনুমানিক ৮০ লাখ টন মৎস্য সম্পদ আহরিত হয়। তবে দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশের মৎস্যজীবীরা তার মধ্যে মাত্র ৭ লাখ টন বা ১৫ শতাংশের মতো মৎস্য সংগ্রহ করতে পারেন, যার বেশিরভাগই উপকূলীয় বা অগভীর সমুদ্রকেন্দ্রিক। গভীর সমুদ্রে মৎস্য শিকারের সক্ষমতা বাংলাদেশের নগণ্য।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমুদ্র সম্পদের সঠিক ও বিজ্ঞানসম্মত ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে ২০৩০ সাল নাগাদ কেবল সুনীল অর্থনীতি থেকেই প্রতি বছর আড়াই লাখ কোটি ডলার সমপরিমাণ অর্থনৈতিক মূল্য বা আয় সৃষ্টি করা সম্ভব। তবে বড় বাস্তবতা হলো, সুনীল অর্থনীতির অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এ খাতের জন্য সুনির্দিষ্ট ও পৃথক কোনো বিশেষ বাজেট বরাদ্দ রাখা সম্ভব হয়নি। পাশাপাশি দেশীয় বেসরকারি খাত থেকেও সমুদ্রে ঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগ করার আগ্রহ তেমন দেখা যায়নি।

উচ্চতর প্রযুক্তির অভাবে বাধ্য হয়ে আমাদের বিদেশি সংস্থাগুলোর তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এই দীর্ঘদিনের ক্ষতি পোষাতে হলে বাংলাদেশকে অবিলম্বে একটি গতিশীল ও বৈপ্লবিক নীতি গ্রহণ করতে হবে। সামুদ্রিক বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকরা বলছেন, সমন্বিত নীতিমালা ও বেসরকারি খাতের সক্রিয় অংশীদারত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশ খুব দ্রুতই প্রতি বছর অন্তত ১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের সুনীল অর্থনীতির বাজার উন্মোচন করতে পারে। এর জন্য গভীর সমুদ্রে বাণিজ্যিক মৎস্য শিকার, মেরিন বায়োটেকনোলজি এবং সি-ফুড প্রক্রিয়াজাতকরণে কৌশলগত বিনিয়োগ এখন সময়ের দাবি। 

মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (মিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন সামুদ্রিক অর্থনীতির রূপরেখা তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশকে তার প্রথাগত ‘ভূমি-কেন্দ্রিক’ উন্নয়ন ভাবনাসমূহ থেকে বের হয়ে এসে বঙ্গোপসাগরকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে। 

মৎস্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, অবকাঠামোগত লজিস্টিকস এবং আন্তর্জাতিক রপ্তানি বাণিজ্যকে একটি একক সুসংগঠিত ‘ভ্যালু চেইন’ বা মূল্য শৃঙ্খলের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। 
মাতারবাড়ী ও মহেশখালী এলাকাকে সামুদ্রিক শিল্পের কেন্দ্রস্থল (হাব) হিসেবে উল্লেখ করে তিনি জানান, সরকারি নীতিমালার সুষ্ঠু সমন্বয় সাধন ও বেসরকারি খাতের চাহিদা অনুযায়ী আকর্ষণীয় বিনিয়োগ প্যাকেজ তৈরি করতে সমন্বিত কাজ চলছে। 

ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে সরকারি-বেসরকারি শক্তিশালী অংশীদারত্ব, সুনির্দিষ্ট আর্থিক বরাদ্দ এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে যদি সমুদ্রসম্পদের টেকসই আহরণ নিশ্চিত করা যায়, তবে বঙ্গোপসাগরের তলদেশের অতল সম্পদই হবে আগামী দিনের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় নিশ্চয়তা।

আজকালের খবর/ এমকে







আরও খবর


Advertisement
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor$gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor$gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor$gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor$gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft