ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট)-এ নতুন উপাচার্য (ভিসি) নিয়োগকে কেন্দ্র করে চলমান অস্থিরতা আরও গভীর সংকটে রূপ নিয়েছে। নবনিযুক্ত ভিসি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকবাল দায়িত্ব গ্রহণ করে প্রশাসনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিলেও ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’ ব্যানারে আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে ইসলামি ছাত্রশিবির সমর্থিত শিক্ষার্থীরা।
রবিবার সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় পুলিশ অজ্ঞাতনামা ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছে। প্রধান ফটক টানা দুইদিন বন্ধ থাকায় ব্যাহত হচ্ছে প্রশাসনিক কার্যক্রম, শিক্ষার্থীদের চলাচল এবং দাপ্তরিক কাজ।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সোমবার ক্যাম্পাসে পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন করেছে শিবির, ছাত্রদল ও শিক্ষক সমিতি। এতে ভিসি নিয়োগের বিষয়টি এখন প্রশাসনিক সংকটের পাশাপাশি রাজনৈতিক মেরুকরণেও রূপ নিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রবিবার দায়িত্ব গ্রহণের পর নবনিযুক্ত ভিসি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকবাল সাংবাদিকদের জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে প্রশাসন কাজ করছে। তিনি বলেন, নিরাপত্তার স্বার্থে প্রধান ফটকে আইডি কার্ড দেখে প্রবেশের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানায়, অচলাবস্থা নিরসনে সমঝোতার চেষ্টা করা হলেও আন্দোলনকারীদের অনড় অবস্থানের কারণে পরিস্থিতি এখনও জটিল রয়ে গেছে।
নবাগত ভিসিকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে আজ সোমবার দুপুরে শহীদ মিনার চত্বরে সংবাদ সম্মেলন করে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। সেখানে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মো. আমান উল্লাহ।
তিনি বলেন, ডুয়েটের অভ্যন্তরীণ শিক্ষকদের মধ্য থেকেই প্রশাসন গঠনের দাবি ছিল শিক্ষার্থীদের। কিন্তু সেই দাবি উপেক্ষা করে বাইরের একজনকে ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এই নিয়োগ বাতিল না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
তিনি আরও বলেন, ঈদের আগেই সংকটের সমাধান না হলে আন্দোলন আরও কঠোর হবে এবং প্রয়োজনে পুরো ক্যাম্পাস শাটডাউন করে দেয়া হবে। আন্দোলনকারীদের দাবি, এটি রাজনৈতিক নয়; বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ও অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব রক্ষার আন্দোলন।
অন্যদিকে একই দিন বিকেলে সংবাদ সম্মেলন করে ডুয়েট শাখা ছাত্রদল। সংগঠনটির নেতারা অভিযোগ করেন, সদ্য বিদায়ী ভিসি অধ্যাপক জয়নাল আবেদীনের সময়কার অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য আড়াল করতেই নতুন ভিসির দায়িত্ব গ্রহণে বাধা দেয়া হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন ডুয়েট শাখা ছাত্রদলের সভাপতি জামিরুল ইসলাম জামিল, সিনিয়র সহ-সভাপতি রুকন আলী, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদির ও যুগ্ম সম্পাদক রাকিবুল ইসলামসহ অন্য নেতারা।
তারা বলেন, সাবেক প্রশাসনের সময় নিয়োগ বাণিজ্য, ভর্তি অনিয়ম এবং উন্নয়নকাজে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। নতুন প্রশাসন দায়িত্ব নিলে এসব অনিয়ম প্রকাশ হয়ে পড়ার আশঙ্কায় একটি মহল পরিকল্পিতভাবে পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।
ছাত্রদলের অভিযোগ, জামায়াত-শিবির সমর্থিত একটি গোষ্ঠী ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’ ব্যানার ব্যবহার করে ক্যাম্পাসে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। যদিও আন্দোলনকারীরা এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
রবিবার নতুন ভিসি ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে গেলে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এ সময় গেট এলাকায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংঘর্ষে শিক্ষার্থী, পুলিশ সদস্য, সদর ইউএনও এবং সাংবাদিকসহ অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন বলে দাবি ছাত্রদলের।
এ ঘটনায় গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ-এর সদর মেট্রো থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় সরকারি কাজে বাধা, হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং পুলিশ ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের আহত করার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো আসামির নাম প্রকাশ করা হয়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র জানিয়েছে, ভিডিও ফুটেজ ও স্থিরচিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে জড়িতদের শনাক্ত করার কাজ চলছে।
এদিকে ডুয়েট শিক্ষক সমিতি চলমান পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এক বিবৃতিতে তারা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে জ্ঞানচর্চা ও গণতান্ত্রিক মতপ্রকাশের স্থান। শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি উপস্থাপন ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার রয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং বহিরাগতদের হস্তক্ষেপের নিন্দা জানিয়ে দ্রুত শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে শিক্ষক সমিতি।
বিশ্লেষকদের মতে, ডুয়েটের বর্তমান সংকট কেবল ভিসি নিয়োগের বিরোধিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ, ছাত্ররাজনীতি এবং অতীতের দুর্নীতির অভিযোগও জড়িয়ে গেছে। একদিকে আন্দোলনকারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব ও স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্ন তুলছেন, অন্যদিকে প্রতিপক্ষ সংগঠনগুলো অভিযোগ করছে-দুর্নীতির তথ্য গোপন রাখতেই পরিকল্পিতভাবে অস্থিরতা সৃষ্টি করা হচ্ছে।
আজকালের খবর/কাওছার আল হাবীব