পৃথিবীতে আপনজন বলতে যাদের বোঝায়, সেই স্ত্রী আর দুই সন্তানের কাউকেই পাশে পেলেন না খোকন মিয়া (৫০)। হাসপাতালের বিছানায় ৩৮ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে গত বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। কিন্তু মৃত্যুর চারদিন পার হয়ে গেলেও বাবার মরদেহ নিতে আসেননি কোনো স্বজন। অবশেষে সন্তানেরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন— ‘আর অপেক্ষা করার দরকার নেই, মরদেহ দাফন করে ফেলুন।
মঙ্গলবার দুপুরে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’-এর উদ্যোগে এই হতভাগা বাবার মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হবে। গত রোববার (৩ মে) অনেক বুঝিয়ে খোকন মিয়ার ছোট ছেলে রানাকে রাজি করানো হয়েছিল যেন তিনি অন্তত শেষবারের মতো বাবার মরদেহ গ্রহণ করেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের পক্ষ থেকে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া ও কাফন-দাফনের যাবতীয় খরচ বহনের আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সোমবার (৪ মে) দুপুরে রানা ফোন করে জানিয়ে দেন, তিনি আসছেন না এবং যেন দাফন সম্পন্ন করা হয়।
এর আগে শুক্রবার (১ মে) পুলিশ নিহতের পরিবারকে বার্তা পাঠালে তারা জানায়, গত ১০-১২ বছর ধরে খোকন মিয়ার সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ নেই এবং তারা মরদেহ গ্রহণে আগ্রহী নয়। গত ২৪ মার্চ গুরুতর সংক্রমণ (সেলুলাইটিস) নিয়ে পুলিশ খোকন মিয়াকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’-এর স্বেচ্ছাসেবক, চিকিৎসক ও নার্সরাই ছিল তার শেষ সম্বল। অস্পষ্ট কণ্ঠে নিজের নাম ও ঠিকানার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। সেই সূত্র ধরে পরিবারকে খুঁজে পাওয়া গেলেও স্ত্রী নিলুফা আক্তার ও দুই ছেলে রাজু ও রানা চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে বা শেষ বিদায়ে অংশ নিতে অস্বীকার করেন। খোকন মিয়ার পৈতৃক বাড়ি লক্ষ্মীপুরে হলেও শ্বশুরবাড়ি কুমিল্লা জেলার দেবিদ্বার উপজেলার করুইন গ্রামে।
দীর্ঘ এক যুগের বিচ্ছিন্নতা একজন বাবার লাশের প্রতি সন্তানদের এমন নির্লিপ্ত করে তুলবে, তা ভাবতেও পারছেন না স্থানীয়রা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইঞ্জি. মো. আজহার উদ্দিন বলেন, “আমরা মানবিকতার জায়গা থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি যেন অন্তত পরিবারের কেউ এসে শেষ বিদায় জানায়। দাফনের সব ব্যয় বহনের প্রস্তাব দিলেও কেউ আসেনি। এটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ঘটনা।”
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এম এম রকীব উর রাজা বলেন, “বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। আইনগত ও মানবিক দুই দিক বিবেচনায় রেখে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পরিবারের অনাগ্রহের কারণে বাতিঘরের মাধ্যমে মরদেহ দাফনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”
সদর মডেল থানার ওসি শহীদুল ইসলাম ও দেবিদ্বার থানার ওসি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান উভয়েই নিশ্চিত করেছেন যে, পরিবারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তারা মরদেহ গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করেছেন।
চারটি দীর্ঘ দিন হাসপাতালের হিমাগারে পড়ে থাকা খোকন মিয়ার নিথর দেহটি আজ মঙ্গলবার দুপুরে চিরনিদ্রায় শায়িত হবে কোনো এক গোরস্থানে— যেখানে থাকবে না তার রক্ত সম্পর্কের কেউ, থাকবে শুধু কিছু মানবতাবাদী অপরিচিত মুখ।
আজকালের খবর/কাওছার