রাজধানীর ব্যস্ততম নিউমার্কেট এলাকায় প্রকাশ্যে ফিল্মি স্টাইলে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে পুরস্কার ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নঈম আহমেদ টিটনকে (৫৫)। নিহত টিটন আরেক ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের সম্বন্ধী। মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর ঘটেছে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে নাড়া দেওয়া এই হত্যাকান্ডের ঘটনা। তাৎক্ষণিকভাবে গা হিম করা এই খুনের কোনো ক্লু খুঁজে পায়নি পুলিশ। তবে বুধবার (২৯ এপ্রিল) নিহতের বড় ভাই জানিয়েছে অন্য কিছু। যা আর এক ভয়ঙ্কও খবর।
কিন্তু অপরাধ জগতের একাধিক সূত্র বলছে, সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ভাই সাঈদ আহমেদ টিপু হত্যার বদলা নিতেই পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়েছে এই হত্যাকা-। কিলিং মিশন চালাতে মাসখানেক আগে দুবাই থেকে ঢাকায় আসেন মোহাম্মদপুরের বাদল ওরফে কিলার বাদল। দুবাই বসে এই খুনের পরিকল্পনা করেন সাবেক সেনাপ্রধানের ভাই পুরস্কার ঘোষিত আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফ আহমেদ।
এদিকে নিহত টিটনের বড় ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন বলেন, মোহাম্মদপুরের বছিলার গরুর হাটের ইজারা নিয়ে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলালের সঙ্গে বিরোধ ছিল নিহত শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটনের। তবে এই ঝামেলা জলদি মিটমাট হয়ে যাবে বলে জানিয়েছিলেন টিটন। গতকাল বুধবার বেলা ২টার দিকে নিউমার্কেট থানার সামনে সাংবাদিকদের এসব কথা জানান নিহত টিটনের বড় ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন।
রিপন বলেন, জামিন পাওয়ার পর টিটন দুবার যশোরে গিয়েছে। এর মধ্যে একবার ঈদের সময় আমার সঙ্গে দেখা হয়েছে। হত্যাকান্ডের কয়েক দিন আগে পিচ্চি হেলালের সঙ্গে বছিলার গরুর হাট নিয়ে বিরোধের কথা সামান্য বলেছিল। তাদের সঙ্গে ঝামেলা চলতেছে; পরে বলতেছে, না বড় ভাই, ঠিক হয়ে যাবেনে, অসুবিধা নাই, দোয়া কইরেন, এটুকুই।’ ইমনের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ইমনের সঙ্গে কোনো বিরোধ ছিল না। এমনিতে ছোটখাটো ঘটনা ভাইবোনের মধ্যে থাকতেই পারে। এটা কিলিং পর্যায়ের কোনো বিরোধ, তা আমি মনে করি না। কারণ, ইমন আমার মায়েরও যতœ করত। আমার দৃষ্টিতে সে (ইমন) ভালো ছেলে।’ রিপন আরো বলেন, ‘পুলিশকে সব জানানো হয়েছে, আমি চাচ্ছি ন্যায়বিচার হোক। সবার কাছে অনুরোধ, যেন ন্যায়বিচার পাই আমরা।’ সাঈদ আক্তার রিপন বলেন, ‘আমি হাসপাতালে গিয়ে আমার ভাইয়ের মরদেহটা নেব। তারপর যশোরে যেতে হবে, সেখানে দাফন করতে হবে।’ নিহত টিটনের বড় ভাই এর আগে বুধবার সকাল সাড়ে ১০টায় ডিএমপির নিউমার্কেট থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করে নিউমার্কেট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আইয়ুব বলেন, টিটন হত্যার ঘটনায় তার বড় ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় ৮-৯ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।
হত্যাকান্ডের সময় প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, সবে সন্ধ্যা পেরিয়ে নেমেছে আঁধার। তবে স্ট্রিটলাইটের আলোতে তখনো আলোকিত রাজধানীর নিউমার্কেটের পাশের বটতলা এলাকা। সেখান দিয়েই দ্রুত পায়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন টিটন। ঠিক তখনই তাকে লক্ষ্য করে দুই রাউন্ড গুলি করেন মোটরবাইকে আসা ঘাতক চক্রের সদস্য, যিনি দুই হাতে অস্ত্র চালাতে পারদর্শী। এরপর দৌড়ে কাছে গিয়ে আরো দুই রাউন্ড গুলি করেন মুখে মাস্ক পরা অস্ত্রধারী। ঘাতকের তপ্ত বুলেটের আঘাতে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন টিটন। তখন তার মৃত্যু নিশ্চিতে মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে আরেক দফা গুলি করেন ঘাতক। পরে মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যান তারা। গুলিবিদ্ধ টিটনের নিথর দেহ উদ্ধার করে নেওয়া হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে। রাত সাড়ে আটটার দিকে তাকে মৃত ঘোষণা করেছেন কর্তব্যরত চিকিৎসক। গুলির ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী রতন নামে এক কিশোর জানিয়েছে, চোখের নিমিষেই ঘটে যায় পুরো ঘটনা। হত্যাকা- ঘটিয়ে পালিয়ে যেতে ঘাতকরা সময় নিয়েছে মাত্র ১ মিনিট। এমনকি ঘটনার সময় লোকজন চিৎকার দিলে, পালানোর আগে এক রাউন্ড ফাঁকা গুলিও ছোঁড়ে তারা। পরে দৌড়ে গিয়ে একটি মোটরসাইকেলের পেছনে ওঠে ঘাতক। মোটরসাইকেলটি চলে যায় বিজিবি গেটের দিকে। আশপাশের লোকজনের সহায়তায় টিটনকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে। টিটনের হাতে, গায়ে ও মাথায় বেশ কয়েকটি গুলির চিহ্ন রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন ঢামেক হাসপাতালের মর্গ ইনচার্জ সিকান্দার।
প্রত্যক্ষদর্শীরা আরো বলেন, দুর্বৃত্তদের দুজনই ক্যাপ ও মাস্ক পরিহিত ছিল। পরে রাস্তায় পড়ে থাকা ওই ব্যক্তিকে দ্রুত উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এর আগে গত বছর ১০ নভেম্বর বেলা পৌনে ১১টায় পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের সামনে প্রকাশ্যে গুলি করে ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ তারিক সাঈফ মামুনকে হত্যা করা হয়। পুলিশের তদন্তে এই হত্যায় নাঈম আহমেদ টিটনের ভগ্নিপতি শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন জড়িত থাকার তথ্য উঠে আসে।
অপরাধ জগতের একাধিক সূত্র জানাচ্ছে, ২০০৫ সালে ঢাকার অপরাধ জগতের যে ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীকে ধরিয়ে দিতে সরকার পুরস্কার ঘোষণা করেছিল সেই তালিকায় উপরের দিকেই রয়েছে টিটনের নাম। ১৯৯৯ সালে বিমানবন্দর সড়কের নিকুঞ্জ এলাকায় খুন হয়েছিলেন সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ভাই সাঈদ আহমেদ টিপু। চলন্ত গাড়িতে ব্রাশফায়ার করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল তাকে। এতে সরাসরি জড়িত ছিলেন টিটন। ওই মামলায় ২০০৪ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে। তিনি ২০১৪ সালে বাবর এলাহী হত্যা মামলায় মৃত্যুদ-প্রাপ্ত হন। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে তিনি জামিনে কারাগার থেকে মুক্তি পান। তিনি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর ১২ আগস্ট কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান। তিনি জামিনে থাকলেও আদালতে হাজিরা না দিয়ে পলাতক ছিলেন।
ওই সময় কারামুক্ত হন তার বোনজামাই আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনও। ইমন দেশের বাইরে চলে গেলেও টিটন ছিলেন দেশেই।
আরেকটি সূত্র জানায়, টিটন কারামুক্ত হওয়ার পর থেকেই তাকে টার্গেট করেন শীর্ষ সন্ত্রাসী তোফায়েল আহমেদ (জোসেফ)। ভাইয়ের খুনের বদলা নিতে দুবাই বসেই টিটন হত্যার পরিকল্পনা করেন তিনি। ছক মাফিক মাস খানেক আগে জোসেফের সহযোগী ও তার কিলার বাহিনীর অন্যতম সদস্য বাদল ওরফে কিলার বাদলকে দুবাই থেকে পাঠানো হয় দেশে। ফিরেই ‘কামলা’ দিয়ে টিটনের গতিবিধির ওপর নজর রাখতে থাকেন তিনি। সেনাপ্রধানের চাকরি শেষ হওয়ার পর তার ভাই যোসেফ দুবাই গেলে মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা কিলার বাদলও পাড়ি জমান সেই দেশে। মূলত এই হত্যার ছক করেই দেশে পাঠানো হয় বাদলকে। তার তত্ত্বাবধানেই এই কিলিং মিশন চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে একাধিক সূত্র।
আজকালের খবর/বিএস