গাজীপুরের ঐতিহ্যবাহী ও পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘেঁষে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা স্থাপনা নির্মাণকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে তীব্র প্রশাসনিক সংকট। একদিকে বন বিভাগের কঠোর আপত্তি, অন্যদিকে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের উন্নয়ন প্রকল্প এই দ্বন্দ্ব এখন সম্ভাব্য পরিবেশ বিপর্যয়ের অশনি সংকেত হয়ে উঠছে।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের অভিযোগ অনুযায়ী, জাতীয় উদ্যানের কোর জোন ও তার সংলগ্ন এলাকায় যেকোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ সরাসরি বন আইন লঙ্ঘনের শামিল। ইতোমধ্যে মাটি ভরাট, কাঠামো নির্মাণ ও রাস্তা তৈরির একাধিক চেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে বলে দাবি তাদের।
বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এম.কে.এম ইকবাল হোসাইন অভিযোগ করেন, সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে সীমানা প্রাচীর ক্ষতিগ্রস্ত করে পুনরায় কাজ চালানোর চেষ্টা হয়েছে, যা জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলের জন্য সরাসরি হুমকি।
অন্যদিকে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ সোহেল হাসান এই প্রকল্পকে নগর ব্যবস্থাপনার জন্য অপরিহার্য হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মহাসড়কের পাশে জমে থাকা বর্জ্য অপসারণ এবং একটি আধুনিক সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন স্থাপন এখন সময়ের দাবি। উপযুক্ত জমির সংকটের কারণে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির সঙ্গে চুক্তির ভিত্তিতে কাজ শুরু করা হয়েছে। তবে বন বিভাগের বাধায় প্রকল্প বাস্তবায়ন অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
পরিবেশবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, এটি কেবল প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব নয়; বরং দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চল ধ্বংসের সম্ভাব্য সূচনা। বর্জ্য স্থাপনা থেকে নির্গত গ্যাস ও দূষিত পানি বনজ পরিবেশব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এর ফলে পর্যটন ও গবেষণা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় জলবায়ু ও জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীদের ভাষায়, এটি উন্নয়ন নয়, বরং ধ্বংসের নকশা। তাদের মতে, এর ফলে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল হুমকির মুখে পড়বে এবং পুরো এলাকা দূষণে আক্রান্ত হয়ে বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকটের মূল কারণ আন্তঃদপ্তরীয় সমন্বয়ের অভাব। তাই জরুরি ভিত্তিতে স্বচ্ছ পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, মন্ত্রণালয় পর্যায়ে সমন্বিত সিদ্ধান্ত, বিকল্প স্থান নির্ধারণ এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে প্রশ্ন একটাই-উন্নয়নের নামে কি একটি জাতীয় সম্পদ ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া হবে, নাকি টেকসই ভবিষ্যতের স্বার্থে এখনই নেওয়া হবে সঠিক ও সাহসী সিদ্ধান্ত?
আজকালের খবর/ এমকে