একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো তার ভৌগোলিক সীমানার সুরক্ষা এবং দেশের অভ্যন্তরে অবস্থানরত প্রতিটি ব্যক্তির ওপর রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি। কিন্তু গত দেড় দশকে বাংলাদেশে আমরা এক অদ্ভুত ও আত্মঘাতী প্রশাসনিক শিথিলতা লক্ষ্য করেছি। বিশেষ করে ক্ষমতাচ্যুত হাসিনা রেজিমের সময় প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রতি যে ‘ডোমেস্টিক’ আচরণ বা অতি-তোষণমূলক নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল, তা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
ফলে আজ বাংলাদেশে হাজার হাজার বিদেশী নাগরিকের অবৈধভাবে বসবাস কেবল একটি আইনি সংকট নয়, বরং এটি আমাদের স্বাধীনতার প্রতি এক নিরব অবমাননা। রাষ্ট্র যখন তার অভ্যন্তরে বসবাসকারী বিদেশীদের সঠিক হিসাব রাখতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব কার্যত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কতজন বিদেশী নাগরিক অবৈধভাবে অবস্থান করছেন, তার সঠিক পরিসংখ্যান দীর্ঘকাল ধরে জনসমক্ষে অস্পষ্ট রাখা হয়েছিল। তবে গত ২০ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে প্রকাশিত একটি সংবাদের সূত্রে জানা যায়, সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী এক সভায় জানিয়েছিলেন, ‘দেশে এখনও ৩৩ হাজার ৬৪৮ জন অবৈধ বিদেশী’ অবস্থান করছেন (তথ্যসূত্র: ঢাকা টাইমস)। একটি সীমিত ভূখণ্ডের জনবহুল দেশে এই বিশাল সংখ্যক বিদেশী যখন কোনো ধরনের বৈধ নথিপত্র ছাড়াই অবাধে বিচরণ করেন, তখন রাষ্ট্রের গোয়েন্দা নজরদারি এবং প্রশাসনিক চেইন অফ কমান্ড ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। এটি কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর নামান্তর।
বিগত হাসিনা রেজিমের সময় প্রতিবেশী ভারতের নাগরিকদের বিষয়ে যে ধরনের উদাসীনতা দেখানো হয়েছে, তা ছিল নজিরবিহীন এবং আত্মঘাতী। দৈনিক যুগান্তরের এক সাম্প্রতিক ভিডিও রিপোর্টে (১৬ আগস্ট ২০২৫) স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশে এখনও হাজার হাজার ভারতীয় নাগরিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও উন্নয়ন খাতে কর্মরত রয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যকই অবৈধ (তথ্যসূত্র: যুগান্তর)। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে চিহ্নিত অবৈধ ৭ হাজার ৩০৯ জন বিদেশীর মধ্যে ৪ হাজার ৯৯৭ জনই ভারতীয়। তারা আমাদের তৈরি পোশাক শিল্প (গার্মেন্টস), বিদ্যুৎ প্রকল্প, আইটি সেক্টর এবং বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন।
প্রশ্ন ওঠে, যেখানে দেশের লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত যুবক বেকারত্বের অভিশাপে জর্জরিত, সেখানে ভিনদেশি নাগরিকরা—বিশেষ করে ভারতীয়রা—ওয়ার্ক পারমিট ছাড়া কাজ করে আমাদের কর্মসংস্থান দখল করছে কোন সাহসে? এটি কি কেবল ব্যক্তিগত অপরাধ, নাকি এর পেছনে গত ১৫ বছরের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা কাজ করেছে? হাসিনা সরকার প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রতি যে প্রশ্নহীন আনুগত্য দেখিয়েছিল, তারই ফলশ্রুতিতে আজ ভারতীয় নাগরিকরা বাংলাদেশকে তাদের ‘নিজেদের আঙিনা’ মনে করে নথিপত্র ছাড়াই বসবাসের স্পর্ধা দেখাচ্ছে। এর ফলে রাষ্ট্র কেবল রাজস্বই হারাচ্ছে না, বরং আমাদের অতি মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে।
আওয়ামী লীগের পতনের কয়েকমাস আগে দৈনিক বণিক বার্তার এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে অবস্থানরত মোট বিদেশীর সংখ্যা বর্তমানে ১ লাখ ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে ভারত ও চীনের নাগরিকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি (তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা)। এসব বিদেশী নাগরিকদের একটি বড় অংশ পর্যটন (ট্যুরিস্ট) বা ব্যবসায়িক ভিসায় বাংলাদেশে প্রবেশ করে পরবর্তীতে অবৈধভাবে কর্মসংস্থানে লিপ্ত হয়। আইন অনুযায়ী বিদেশীদের আয়ের ওপর ৩০ শতাংশ কর দেওয়ার বিধান থাকলেও অবৈধ হওয়ার কারণে তারা কানাকড়িও কর দেয় না। ফলে দেশ থেকে প্রতিবছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অবৈধ পথে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। এটি আমাদের ভঙ্গুর অর্থনীতির ওপর এক ধরনের ‘পরজীবী’ আক্রমণ। বিগত সরকার রাজনৈতিক স্বার্থে এই অর্থনৈতিক রক্তক্ষরণকে প্রশ্রয় দিয়েছে, যা জাতীয় সার্বভৌমত্বের সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা।
অবৈধভাবে বসবাসকারী বিদেশীদের চিহ্নিত করা কেবল অর্থনৈতিক কারণে নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেও আজ অপরিহার্য। অবৈধ নাগরিকদের গতিবিধি বা উদ্দেশ্য সম্পর্কে রাষ্ট্রের কাছে কোনো তথ্য না থাকা মানেই হলো অন্ধকারের চোরাবালিতে পা রাখা। যুগান্তরের তথ্যমতে, নাইজেরিয়াসহ বেশ কিছু আফ্রিকার দেশের নাগরিকরা বাংলাদেশে প্রবেশের পর তাদের পাসপোর্ট নষ্ট করে ফেলে যাতে তাদের কোনোভাবেই শনাক্ত করে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো না যায়। এদের অনেকেই পরবর্তীতে মাদক ব্যবসা, জাল মুদ্রার কারবার এবং আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অবৈধ নাগরিকদের উপস্থিতি অনেক সময় গোয়েন্দা তৎপরতা বা অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র কখনোই কারো ‘করায়ত্ত’ থাকতে পছন্দ করে না এবং কোনো বিশেষ রাষ্ট্রের প্রতি একপাক্ষিক আনুগত্য দেখিয়ে নিজের অস্তিত্ব বিপন্ন করতে পারে না। স্বাধীনতা মানে কেবল মানচিত্রের সুরক্ষা নয়, স্বাধীনতা মানে দেশের প্রতিটি কর্মসংস্থান এবং প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
বিগত ১৫ বছরে আমাদের ইমিগ্রেশন ও গোয়েন্দা বিভাগগুলো কেন এই বিপুল সংখ্যক অবৈধ বিদেশীকে চিহ্নিত করতে পারল না? উত্তরটি সহজ—রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। হাসিনা রেজিমের সময় এমন এক সংস্কৃতি গড়ে তোলা হয়েছিল যেখানে ভারতীয় বা বিশেষ কিছু দেশের নাগরিকদের নথিপত্র যাচাই করাকে ‘অসৌজন্যমূলক’ মনে করা হতো। ফলে তারা অবাধে বাংলাদেশের প্রতিটি স্তরে ঢুকে পড়েছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তারা স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্ট তৈরির চেষ্টাও করেছে। এই প্রশাসনিক পচনের কারণেই আজ ৩৩ হাজারেরও বেশি মানুষ ‘অবৈধ’ হিসেবে টিকে আছে।
এখন সময় এসেছে কঠোর ও নির্মোহ হওয়ার। কোনো আবেগের বশবর্তী হয়ে বা প্রতিবেশী সুলভ নমনীয়তার দোহাই দিয়ে সার্বভৌমত্বকে ঝুঁকির মুখে ফেলার দিন শেষ। রাষ্ট্রের প্রতি আমাদের স্পষ্ট দাবিগুলো হলো:
১. চিরুনি তল্লাশি ও ডিজিটাল ডাটাবেজ: প্রতিটি জেলা, গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি, উন্নয়ন প্রকল্প এলাকা এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনতিবিলবে চিরুনি তল্লাশি চালাতে হবে। প্রতিটি বিদেশী নাগরিকের পাসপোর্ট ও ওয়ার্ক পারমিট ডিজিটাল পদ্ধতিতে যাচাই করে একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে।
২. অবৈধদের দ্রুত বহিষ্কার (Deportation): যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়েছে বা যারা ভিসার শর্ত ভঙ্গ করে কাজ করছেন, তাদের চিহ্নিত করে অবিলম্বে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর আইনি প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো দেশের প্রতি বিশেষ বিবেচনা দেখানো যাবে না।
৩. নিয়োগকর্তাদের কঠোর শাস্তি: যেসব প্রতিষ্ঠান বা শিল্প মালিক অবৈধ বিদেশীদের আশ্রয় দিচ্ছে বা কর ফাঁকি দিয়ে কাজ দিচ্ছে, তাদের লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর অর্থদণ্ড ও কারাদণ্ডের বিধান করতে হবে।
৪. জরিমানা ও ব্ল্যাকলিস্টিং: যুগান্তরের তথ্যমতে, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ৭৬৭ জন বিদেশীকে প্রায় ২১ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এই জরিমানা আদায়ের হার আরও বাড়িয়ে তাদের স্থায়ীভাবে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ করতে হবে যাতে তারা পুনরায় বাংলাদেশে প্রবেশের সুযোগ না পায়।
৫. ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তি: পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যুর মতো এই ‘অবৈধ বিদেশী বিতাড়ন’ ইস্যুটিকেও সরকারের অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
বাংলাদেশ আজ এক নতুন ভোরের প্রত্যাশায় দাঁড়িয়ে। আমরা এমন এক বাংলাদেশ চাই যেখানে আইনের শাসন সবার জন্য সমান হবে এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব হবে অটুট। বিগত ১৫ বছরের তোষণমূলক রাজনীতির যে ক্ষত আমাদের দেহে সৃষ্টি হয়েছে, তা নিরাময়ে ‘অবৈধ বিদেশী’ ইস্যুতে আপসহীন অবস্থানের বিকল্প নেই। আমাদের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বকে কোনোভাবেই অপমানিত হতে দেওয়া যাবে না। কোনো বিদেশি শক্তি বা গোষ্ঠী যেন মনে না করে যে বাংলাদেশ তাদের যথেচ্ছ ব্যবহারের ক্ষেত্র। ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা এবং দেশপ্রেমের ভিত্তিতে প্রতিটি অবৈধ বিদেশীকে চিহ্নিত করে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোই এখন জাতীয় ঐকমত্য বা ন্যাশনাল কনসেনসাস। সত্যের জয় হোক, সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত থাকুক।
লেখক: এ এইচ এম ফারুক (A H M Faruk)
সাংবাদিক, কলামিস্ট, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
farukkht@yahoo.com