শনিবার ৪ এপ্রিল ২০২৬
সেনাবাহিনীর কার্যকর ভূমিকায় সুষ্ঠু নির্বাচন ও স্থিতিশীল পরিবেশ
প্রকাশ: রোববার, ১ মার্চ, ২০২৬, ৭:১৯ পিএম   (ভিজিট : ৯১০)
দীর্ঘ ১৭ বছর পর উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ভোট উৎসবে মেতেছিলেন দেশের মানুষ। দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ নাগরিক তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলিত হয়েছে ঐতিহাসিক নির্বাচনটিতে। নানান শঙ্কা পাশ কাটিয়ে, দেশের নাগরিকদের জন্য ভোটের দিনটি কেটেছে উৎসব, উদ্দীপনা আর দেশ নিয়ে নতুন স্বপ্নে। দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। 

স্বাধীনতা পরবর্তী সরকারে এসে চার দফা দেশ পরিচালনায় অভিজ্ঞতা রয়েছে দলটির। সব অংশীজনরাও বলছেন, দেশের ইতিহাসে অন্যতম গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছে এবার। অবশ্য এর কৃতিত্ব সরকার, নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনীর। নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান ও বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন এর অভূতপূর্ব টিমওয়ার্ক জনপ্রত্যাশা পূরণে নিয়ামকের ভূমিকা পালন করে। যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে সশস্ত্র বাহিনীর তাৎক্ষণিক ও বিচক্ষণ সিদ্ধান্তই সহিংসতা এড়ানোর পাশাপাশি শান্তি বজায় রাখতে সহায়তা করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। 

গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনে অপরিহার্য ছিল অবাধ, সুষ্ঠু ও বিতর্কমুক্ত একটি নির্বাচন। সাধারণত বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা ছিল, নির্বাচনের দিন সহিংসতার প্রবণতা অনেক বেড়ে যায়। কিন্তু এবার এই চিত্র ছিল অনুপস্থিত। নির্বাচন কমিশন এবং সামরিক বাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নির্বাচনকেন্দ্রিক যেকোনো সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে ছিল। যেখানেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে তারা তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিয়েছে। কিছু সহিংসতা বাদ দিলে এবারের নির্বাচনী পর্বটা ছিল প্রতিযোগিতাপূর্ণ ও উৎসবমুখর। 

এবারই প্রথম রেকর্ড সংখ্যক ১ লাখ ৮ হাজারের মতো সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া বিজিবির ৩৭ হাজারের বেশি, কোস্টগার্ড সাড়ে ৩ হাজারের বেশি, পুলিশের প্রায় ১ লাখ ৫৭ হাজার এবং আনসারের ৫ লাখ ৬৭ হাজার সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান ও বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন সরকারকে সর্বাত্মক সহযোগিতার মাধ্যমে গোটা বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশ একটি শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক ভোট সম্পন্ন করতে সক্ষম। তাঁরা ভোটারদের জন্য ভয়হীন ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করেছিলেন। রাজনীতিতে বা ভোটে তাঁরা কোন হস্তক্ষেপ করেনি। গণতন্ত্রের পক্ষে তাদের শক্ত ও উজ্জ্বল অবস্থান বিশ্ব ইতিহাসে নজির তৈরি করেছে। তাদের জোরদার ভূমিকার ফলেই দেশে গণতান্ত্রিক যাত্রা শুরু হয়েছে। দেশের নির্বাচনী ইতিহাসেও যা অবিস্মরণীয়। 

নির্বাচন পরবর্তী উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে দেশজুড়েই। প্রতিহিংসা, বৈরিতা, সংকীর্ণ মানসিকতা থেকে বেরিয়ে দূরদর্শী ও সমৃদ্ধ এক জাতি গঠনে বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। যদিও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে আরও কার্যকর আইন-শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এটি সম্ভব হলে বিনিয়োগে আস্থা ফিরবে, বাজারে শৃঙ্খলা আসবে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি সঞ্চার হবে। তাঁরা মনে করেন, উন্নত আইন-শৃঙ্খলা ও সুশাসন ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। নির্বাচনের পরও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে মাঠে সক্রিয় রয়েছে সশস্ত্র বাহিনী। নিরপেক্ষ ও পেশাদার আচরণ বজায় রেখেছে। কোথাও কোথাও বিচ্ছিন্ন সহিংসতার ঘটনা ঘটলেও সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি বড় ধরনের নিয়ন্ত্রণহীনতায় যায়নি। সার্বক্ষণিক কার্যকর, নিরপেক্ষ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ থেকে সশস্ত্র বাহিনী আন্ত:প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের মাধ্যমে স্বস্তির আবহ তৈরি করেছে। অনেক সমূহ বিপদের হাত থেকে রক্ষা করেছে দেশকে। 

বিশ্লেষকরা মনে করেন, তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের পর রাজনৈতিক মেরুকরণ, নতুন সরকার গঠন, ক্ষমতা হস্তান্তর ও প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের সময়টি মূল ‘সংবেদনশীল পর্ব’। নির্বাচনের পরের দিনগুলো আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তার দিক থেকে সব সময় নাজুক সময় পার করে। আবার, নির্বাচন গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলেও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ের স্থিতিশীলতাই প্রকৃত পরীক্ষার জায়গা। আর এই পরীক্ষাতেই দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ হতে সক্ষম হয়েছে সশস্ত্র বাহিনী। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি সতর্কতা ও রাজনৈতিক সংযম দুটোই সমান গুরুত্বপূর্ণ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতিতে দেশে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও। 

নির্বাচিত হওয়ার পরপরই প্রথম সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন, যেকোনো মূল্যে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে হবে এবং কোনো ধরনের সহিংসতা, প্রতিশোধ বা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড বরদাশত করা হবে না। তিনি নেতা-কর্মীদের শান্ত ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। সরকারপ্রধানের বক্তব্য থেকেও স্পষ্ট কোন প্রতিহিংসাকে সরকার সমর্থন করে না। যেকোনো মূল্যে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। সরকারপ্রধানের ভাষ্যে-প্রতিটি বাংলাদেশি নাগরিকের জন্যই আইন সমান। আইনের প্রয়োগ হবে বিধিবদ্ধ নিয়মে।

কোনো কোনো গোষ্ঠী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচন-পরবর্তী সংঘাতের ঘটনাগুলো নিয়ে নানা অপতথ্য ও ভিডিও ছড়াচ্ছে।  এ ধরনের অপতথ্য যেকোনো সময় সহিংসতা উসকে দিতে পারে। এ ব্যাপারে সতর্ক ও সজাগ থাকতে হবে দায়িত্বশীলদের। যদিও ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের পরদিন থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্বাচন-পরবর্তী সংঘাতের খবর প্রকাশিত হয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে। এমন সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনা এবারই প্রথম নয়, তবে এবার পালে হাওয়া দেয় অনলাইনে বা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অপতথ্য। তবে সাধারণ মানুষ অতীতের তুলনায় বেশি সচেতন থাকায় বড় রকমের কোন অঘটন ঘটেনি। 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলের পর বিচ্ছিন্ন কয়েকটি সহিংসতা চললেও রাজনৈতিক দলগুলোর সংযত আচরণ ইতিবাচক প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করেছিল। সেই ধারাবাহিকতাতেই নির্বাচনের দিন শান্তিপূর্ণ পরিবেশ দেখা যায়। নির্বাচনের পর দেখা গেছে, বেশ কয়েকটি আসনে বিজয়ী প্রার্থী পরাজিত প্রার্থীর সঙ্গে দেখা করে শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন। 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে জামায়াতের আমির, এনসিপির আহ্বায়ক ও চরমোনাই পীরের বাসায় গিয়ে তাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। এই সৌহার্দ্যমূলক আচরণই গণতন্ত্রের মূল চেতনা। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশে যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি করেছে, রাজনীতিবিদদের আচরণের পরিবর্তন তারই প্রতিফলন। পাশাপাশি নির্বাচনের পরও শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনীর এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে; অন্তত তাঁরা যতোদিন সরকারের নির্দেশে মাঠে থাকবে। জাতীয় সংসদকে শুরু থেকেই তর্কবিতর্ক ও আলাপ-আলোচনার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশের যে গণতান্ত্রিক উত্তরণযাত্রা শুরু হয়েছে, তা এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব আমাদের প্রত্যেকের। 

লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক 








আরও খবর


Advertisement
সর্বশেষ সংবাদ
কদমতলীতে কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার
ঝিনাইগাতীতে কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা
ব্যাংক লেনদেনের নতুন সময়সূচি নির্ধারণ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
পঞ্চগড়ে শিক্ষকের শেষ কর্মদিবসে রাজকীয় বিদায়
অফিস ৯টা থেকে ৪টা, ৬টায় মার্কেট বন্ধ: মন্ত্রিসভায় গুচ্ছ সিদ্ধান্ত
সংসদ সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক, আসতে পারে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor@gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor@gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft