শুক্রবার ২২ মে ২০২৬
সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিয়ে প্রশংসিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও সশস্ত্র বাহিনী
প্রকাশ: রোববার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১০:৩১ এএম   (ভিজিট : ৯৮৯)
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি একটি স্বর্ণাক্ষরে লেখা দিন হয়ে থাকবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ২০২৫ সালের শেষভাগ থেকে দেশজুড়ে যে অজানা শঙ্কা, গুজব এবং অস্থিরতা বিরাজ করছিল, তা দূর করে একটি উৎসবমুখর ও সংঘাতহীন নির্বাচন উপহার দেওয়া ছিল এক অসাধ্য সাধন। এক সময় মনে হয়েছিল, রাজনৈতিক মেরুকরণ আর জনমনে উৎকণ্ঠা যখন তুঙ্গে, তখন রাষ্ট্র এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি। কিন্তু সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং বিশেষ করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে যে দৃঢ়তা দেখিয়েছে, তা বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক মর্যাদাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাস মানেই দীর্ঘকাল ধরে পেশিশক্তি, বুথ দখল আর সংঘাতের প্রতিচ্ছবি। এই কলঙ্কিত অধ্যায় মুছে ফেলাই ছিল বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের সমন্বয়ে যে বিশাল কর্মযজ্ঞ সাজানো হয়েছিল, তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল "সমরে আমরা, শান্তিতে আমরা, সর্বত্রই আমরা দেশের তরে" এই মূলমন্ত্রে দীক্ষিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগসহ বিভিন্ন বাহিনীর মোট ৮ লাখ ৯৭ হাজার ১১৭ জন সদস্য মোতায়েন ছিল। এর মধ্যে সরাসরি মাঠ পর্যায়ে সেনাবাহিনীর ১ লাখ সদস্যের উপস্থিতি সাধারণ ভোটারের মনে এক বিশাল আস্থার জায়গা তৈরি করে। এছাড়া নৌবাহিনীর ৫ হাজার এবং বিমানবাহিনীর ৩ হাজার ৭৩০ জন সদস্য দুর্গম এলাকায় মোতায়েন থেকে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন।

নির্বাচনের অনেক আগেই সেনাসদর থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছিল যে, একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য যা যা প্রয়োজন, সেনাবাহিনী তার সবটুকুই করবে। গত জানুয়ারিতে সেনাসদরের সামরিক অপারেশনস পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করেছিলেন—"সেনাবাহিনী সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থেকে দায়িত্ব পালন করবে।" সেই কথার প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই ১২ ফেব্রুয়ারির ব্যালট যুদ্ধে।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে ৪১১টি উপজেলায় ৫৪৪টি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করে সেনাবাহিনী যে নজরদারি চালিয়েছে, তা ছিল নজিরবিহীন। গত ২০ জানুয়ারি থেকে সদস্য সংখ্যা ৩৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১ লাখে উন্নীত করা এবং সারাদেশে নিয়মিত টহল ও যৌথ অভিযানের মাধ্যমে চিহ্নিত অপরাধীদের দমন করা হয়। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান নিজে মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম পরিদর্শন করে অসামরিক প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সেনাবাহিনী সর্বোচ্চ সহযোগিতা দেবে। এই বলিষ্ঠ নেতৃত্বই সাধারণ মানুষকে নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে আসতে উৎসাহিত করেছে।

নির্বাচনের আগের ১৪ দিনে সারা দেশে এক বিশাল চিরুনি অভিযান পরিচালনা করা হয়। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১০ হাজার ১৫২টি অবৈধ অস্ত্র এবং ২ লাখ ৯১ হাজার গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ছিল বিদেশি পিস্তল থেকে শুরু করে ককটেল ও শক্তিশালী গ্রেনেড। ৩১ জানুয়ারি যশোরের বাঘারপাড়ায় যে যৌথ অভিযান পরিচালিত হয়, তা ছিল নাশকতার বড় একটি ছক নস্যাৎ করার উজ্জ্বল উদাহরণ। শুধু তাই নয়, প্রায় ২২ হাজার ২৮২ জন চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও দুষ্কৃতকারীকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তরের মাধ্যমে নির্বাচনের মাঠকে শান্তিপূর্ণ রাখা হয়েছে।

সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে এই নির্বাচনে পুলিশ (১ লাখ ৪৯ হাজার ৪৪৩), বিজিবি (৩৭ হাজার ৪৫৩), র‍্যাব (৭ হাজার ৭০০) এবং কোস্টগার্ড একযোগে কাজ করেছে। তবে সংখ্যার বিচারে সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী। প্রায় ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৩১৪ জন আনসার সদস্য সরাসরি মাঠ পর্যায়ে সম্পৃক্ত থেকে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেন।

বিশেষভাবে উল্লেখ্য, ১২ ফেব্রুয়ারি ছিল বাহিনীর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৪৮ সালে যাত্রা শুরু করা এই বাহিনী ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে বাংলাদেশের প্রথম গঠিত সরকারকে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রথম প্রহরীর মর্যাদা পেয়েছিল। ২০২৬ সালের এই নির্বাচনেও তারা সেই দেশপ্রেমের উত্তরাধিকার বহন করেছে। ডিজিটাল সক্ষমতায় বলীয়ান হয়ে ‘নির্বাচন সুরক্ষা অ্যাপস’-এর মাধ্যমে বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আব্দুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ যে আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা চালু করেছিলেন, তা বাহিনীর ইতিহাসে এক নব দিগন্ত উন্মোচন করেছে। প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ভোটারদের প্রতি তাদের মানবিক আচরণ সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গায় এই বাহিনীকে পরম বন্ধুর আসনে বসিয়েছে।

একটি সফল কাজের পেছনে সবসময়ই কিছু ষড়যন্ত্র থাকে। এবারের নির্বাচনেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিথ্যা তথ্য ও অপতথ্য ছড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। কতিপয় সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী ডিজিটাল প্লাটফর্মে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর মতো ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলেছিল। কিন্তু সেনা সদর এবং সংশ্লিষ্ট বাহিনীর বলিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ নেতৃত্ব সেই অপপ্রচারকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। কোনো কেন্দ্র থেকেই ইঞ্জিনিয়ারিং বা অনিয়মের ন্যূনতম প্রমাণ মেলেনি। বরং বাহিনীর পেশাদারিত্ব সেই অভিযোগকারীদের মুখেই চুনকালি মেখে দিয়েছে।

বাংলাদেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসে যেখানে নির্বাচনের দিন মারামারি-খুনোখুনিরমত রক্তপাত ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার, সেখানে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ছিল বিস্ময়করভাবে শান্তিপূর্ণ। দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে নির্বাচন সরঞ্জাম পাঠাতে সামরিক হেলিকপ্টার ও জলযানের ব্যবহার প্রমাণ করেছে যে, রাষ্ট্র তার প্রতিটি নাগরিকের ভোটাধিকার রক্ষায় কতটা সজাগ।

সেনাপ্রধানের নির্দেশনায় বাহিনীর নিয়োজিত সদস্যরা নির্বাচন কমিশন, অন্তর্বর্তী সরকার, অসামরিক প্রশাসন এবং গণমাধ্যমের সাথে যে চমৎকার সমন্বয় তৈরি হয়েছিল, তা-ই ছিল এই সফলতার মূল চাবিকাঠি। দুর্গম সাজেক থেকে শুরু করে দক্ষিণের ঘুমধুম পর্যন্ত প্রতিটি ভোটার যখন নির্ভয়ে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছেন, তখনই সফল হয়েছে সেনাবাহিনীর ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ কার্যক্রম।

পরিশেষে বলা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল একটি রাজনৈতিক জয় নয়, এটি ছিল শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম এবং আস্থার জয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তথা সশস্ত্র বাহিনী প্রমাণ করেছে যে, সঠিক নেতৃত্ব এবং অদম্য দেশপ্রেম থাকলে যেকোনো অসাধ্য সাধন করা সম্ভব। একটি 'ফ্যাসিবাদমুক্ত' বাংলাদেশে গণতন্ত্রের এই নতুন পথচলায় সেনাবাহিনী যে মাইলফলক স্থাপন করল, তা আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। দেশের প্রতিটি প্রান্তে শান্তির সজাগ পাহারা হিসেবে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী এবং আনসার ভিডিপি তাদের গৌরবময় ঐতিহ্যকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে। এই নির্বাচন উপহার দেওয়ার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং প্রতিটি বাহিনীর সদস্য বাংলাদেশের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
 
আজকালের খবর/ এমকে









Advertisement
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor@gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor@gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft