শনিবার ৪ এপ্রিল ২০২৬
নির্বাচনী প্রচারণায় এআই ব্যবহারে নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য
প্রকাশ: শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৮:১৯ পিএম   (ভিজিট : ৬৫৯)
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (অৎঃরভরপরধষ ওহঃবষষরমবহপব) আধুনিক বিশ্বের এক অনিবার্য বাস্তবতা। তথ্যপ্রযুক্তির এই অগ্রগতি একদিকে যেমন মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করেছে, তেমনি অন্যদিকে নতুন নতুন ঝুঁকিরও জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—নির্বাচনে এআইয়ের ব্যবহার ও অপব্যবহার নিয়ে বিশ্বজুড়েই বাড়ছে উদ্বেগ। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। নির্বাচনী প্রচারণায় এআই ব্যবহারে স্পষ্ট নীতিমালা ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এখন সময়ের দাবি।

নির্বাচন মানেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, প্রতিযোগিতা এবং জনগণের সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা যাচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক প্রচারণায় এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভুয়া তথ্য, বিকৃত ভিডিও (ডিপফেক), কণ্ঠ নকল করা অডিও এবং বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ছড়িয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করার প্রবণতা বাড়ছে। এসব কনটেন্ট অনেক সময় এতটাই বাস্তবসম্মত হয় যে সাধারণ মানুষের পক্ষে সত্য-মিথ্যা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে ভোটারদের স্বাধীন ও স্বতঃস্ফূর্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

নির্বাচনী প্রচারণায় এআই ব্যবহারের একটি বড় ঝুঁকি হলো ‘ডিসইনফরমেশন’। কোনো প্রার্থীর নামে মিথ্যা বক্তব্য তৈরি করে প্রচার, প্রতিপক্ষকে হেয় করতে সাজানো ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া, কিংবা নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি আস্থা নষ্ট করার মতো কনটেন্ট ছড়ানো—এসবই এআইয়ের অপব্যবহারের উদাহরণ। এর ফলে শুধু একটি নির্বাচন নয়, পুরো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। জনগণের মধ্যে অবিশ্বাস, বিভ্রান্তি ও উত্তেজনা তৈরি হলে সামাজিক স্থিতিশীলতাও হুমকির মুখে পড়ে।

এআই প্রযুক্তি নিজে কোনো সমস্যা নয়; সমস্যা হলো এর অনিয়ন্ত্রিত ও নৈতিকতাবিহীন ব্যবহার। সঠিক নীতিমালা থাকলে এআই নির্বাচনী ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করতেও সহায়ক হতে পারে—যেমন ভোটার তথ্য বিশ্লেষণ, নির্বাচন ব্যবস্থাপনা উন্নত করা বা দ্রুত তথ্য সরবরাহ। কিন্তু নীতিমালার অভাবে একই প্রযুক্তি হয়ে উঠতে পারে বিভাজন ও অস্থিরতার হাতিয়ার। তাই ‘ব্যবহার নিষিদ্ধ’ নয়, বরং ‘নিয়ন্ত্রিত ও দায়িত্বশীল ব্যবহার’ নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।

এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনী আচরণবিধিতে এআই ব্যবহারের স্পষ্ট সংজ্ঞা, কোন ধরনের কনটেন্ট গ্রহণযোগ্য আর কোনগুলো নিষিদ্ধ—তা পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক করতে হবে প্রচারণায় ব্যবহৃত ডিজিটাল কনটেন্টের স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অর্থায়িত প্রচারণা, বট অ্যাকাউন্ট বা স্বয়ংক্রিয় প্রচার ব্যবস্থার ব্যবহারও নজরদারির আওতায় আনতে হবে।

শুধু আইন বা নীতিমালা করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। এর বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে প্রয়োজন প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়। নির্বাচন কমিশন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকলে এআই অপব্যবহার রোধ করা কঠিন হবে। একই সঙ্গে দ্রুত ভুয়া তথ্য শনাক্ত ও অপসারণের জন্য বিশেষ মনিটরিং সেল গঠনের কথাও ভাবা যেতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভোটারদের সচেতনতা। এআই-নির্ভর ভুয়া কনটেন্ট শনাক্ত করার সক্ষমতা সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি না হলে যেকোনো নীতিমালাই আংশিক ফলপ্রসূ হবে। গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সুশীল সমাজকে এগিয়ে এসে ডিজিটাল লিটারেসি বাড়াতে ভূমিকা রাখতে হবে। সত্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারলেই এআই অপব্যবহারের ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

সবশেষে বলা যায়, নির্বাচন শুধু একটি দিনের ঘটনা নয়; এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া, যার ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ। এই প্রক্রিয়াকে কলুষিত করার সুযোগ কোনোভাবেই দেওয়া যায় না। এআই প্রযুক্তির যুগে দাঁড়িয়ে নির্বাচনকে সুরক্ষিত, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য রাখতে হলে এখনই প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতিমালা, কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং সবার সম্মিলিত দায়িত্বশীলতা। নইলে প্রযুক্তির সুবিধা আমাদের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার বদলে দুর্বল করে দিতে পারে—যার খেসারত দিতে হবে পুরো সমাজকে।

লেখকঃ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক 








আরও খবর


Advertisement
সর্বশেষ সংবাদ
কদমতলীতে কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার
ঝিনাইগাতীতে কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা
ব্যাংক লেনদেনের নতুন সময়সূচি নির্ধারণ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
পঞ্চগড়ে শিক্ষকের শেষ কর্মদিবসে রাজকীয় বিদায়
অফিস ৯টা থেকে ৪টা, ৬টায় মার্কেট বন্ধ: মন্ত্রিসভায় গুচ্ছ সিদ্ধান্ত
লক্ষ্মীপুরে ইটভাটায় বিদ্যুৎস্পৃষ্টে দুই শ্রমিকের মৃত্যু
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor@gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor@gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft