
এক সময় গ্রামবাংলায় ভোটের সিদ্ধান্ত মানেই ছিল পরিবারের বড়দের চূড়ান্ত রায়। বাবা যে প্রতীকে ভোট দেবেন, ছেলে-মেয়ে কিংবা স্ত্রী, সবার ভোটও পড়ত সেই প্রতীকেই। প্রশ্ন করার সুযোগ ছিল সীমিত। তবে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ফেনীর ফুলগাজী উপজেলায় সেই চিরচেনা চিত্রে স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, একই পরিবারের ভেতরেই এখন ভোট পছন্দে সুস্পষ্ট বিভাজন তৈরি হয়েছে।
ফুলগাজী সদর ইউনিয়নের নিলক্ষী গ্রামের একটি পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পরিবারের কর্তা দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সমর্থক। কিন্তু তার দুই ছেলে এবার দুই ভিন্ন প্রার্থীর প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
পরিবারের এক ছেলে বলেন, “আমরা বিগত দিনে ভোট দিয়ে অনেক আশা করেছি। কিন্তু এলাকার রাস্তা, চাকরি, নিরাপত্তা, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, ব্যবসা-বাণিজ্যে সিন্ডিকেট—কিছুই বদলায়নি। তাই এবার বদলের সম্ভাবনা যেখানে দেখছি, নিজের বিবেচনায় সেখানেই ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
অন্যদিকে পরিবারের আরেক সদস্যের ভিন্ন মত, “রাজনীতিতে হঠাৎ করে সিদ্ধান্ত বদল ভালো নয়। যারা দীর্ঘদিন পাশে ছিল, অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে তাদের ওপরই আস্থা রাখা উচিত।”
এই ধরনের মতভেদ এখন আর ব্যতিক্রম নয়, ফুলগাজীর একাধিক ইউনিয়নে একই চিত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, নারী ভোটারদের অবস্থান। আগে যেখানে স্বামী বা পরিবারের সিদ্ধান্তই ছিল চূড়ান্ত, সেখানে এখন অনেক নারী নিজের বিবেচনায় ভোট দেওয়ার সাহস দেখাচ্ছেন।
এক প্রবাসীর সঙ্গে ফোনালাপে জানা যায়, তিনি স্ত্রীকে একটি নির্দিষ্ট দলের প্রার্থীকে ভোট দিতে বললেও তার স্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এবার তিনি নিজের পছন্দ অনুযায়ী ভোট দেবেন।
ফুলগাজী উপজেলার একটি ভোটকেন্দ্র এলাকার এক নারী ভোটার বলেন, “যে প্রার্থী দেশকে ভালো রাখবে, নারীদের ইজ্জত ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং এলাকায় শান্তি বজায় রাখবে—আমি এসব বিবেচনা করেই ভোট দেব। শুধু পরিবারের কর্তাদের চাপ আর মানবো না।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। নারী শিক্ষার প্রসার, সচেতনতা বৃদ্ধি, এনজিও কার্যক্রম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি, গেল ‘২৪-এর জুলাই আন্দোলনের পর মানুষের মধ্য থেকে ভয়-ভীতি অনেকটাই কেটে গেছে। মানুষ এখন প্রতিবাদ করতে শিখেছে।
স্থানীয় শিক্ষাবিদ, ভোটার ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তরুণদের প্রশ্ন করার মানসিকতা বেড়েছে, দল নয় বরং ব্যক্তি ও কাজ মূল্যায়নের প্রবণতা তৈরি হয়েছে। পূর্বের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়ার হতাশা এবং ভয় নয়, যুক্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহসও এই পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছে।
ফুলগাজীর এক কলেজ প্রভাষক শায়লা শান্তা বলেন, “এটা শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, এটি একটি সামাজিক রূপান্তরের লক্ষণ। পরিবারে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বাড়ছে।”
একই পরিবারের ভেতর ভিন্ন ভোটপছন্দ রাজনীতির জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে, ভোট আর উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া যাবে না।
স্থানীয় এক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, “যেসব দল এখনো মনে করে একজন নেতাকে পেলে পুরো পরিবার পাওয়া যাবে, তারা বাস্তবতা বুঝতে পারছে না।”
ভোটারদের এই স্বাধীন অবস্থান আসন্ন নির্বাচনের ফলাফলে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আজকালের খবর/এআরজে