মানুষের বেঁচে থাকার জন্য যেমন খাবার প্রয়োজন, তেমনি সব গাছেরও খাবারের প্রয়োজন হয়। আমরা জানি, যে কোনো ফসলের জীবনচক্রে (বীজ থেকে বীজ) উদ্ভিদের যেসব খাদ্যোপাদানের দরকার হয়, তার মধ্যে ১৭ টি খাদ্যোপাদান অত্যন্ত জরুরি, যদিও ১৭ টি খাদ্যোপাদানের বাইরে আরো অনেক উপাদান আছে। তবে সেগুলো বিশেষভাবে জরুরি নয়। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের মোট কৃষিজমির শতকরা ৭৫ ভাগ তার উর্বরতা হারিয়েছে। একজন কৃষক বহু বছর ধরে একটার পর একটা ফসল চাষ করছেন, ফলে জমি বিশ্রাম পাচ্ছে না। প্রতিটি চাষের সময় নানা রকমের রাসায়নিক সারের ব্যবহার করা হচ্ছে। বেশির ভাগ কৃষক জৈবসার ব্যবহার কম করায় মাটির চরিত্র বদলে যাচ্ছে। কৃষক অধিক মুনাফার জন্য প্রয়োজনের তুলনায় বেশি মাত্রায় রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করছেন। সুষম ও পরিমিত মাত্রায় সার ব্যবহার করছেন না। ফলে দিনের পর দিন এভাবে চলার ফলে জমির উর্বরাশক্তি কমে যাচ্ছে, ফলে ফলন কম হচ্ছে।
‘বাংলাদেশে বৈচিত্র্যময় ফসলের জন্য পুষ্টি ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক প্রকল্পের দলনেতা ও অস্ট্রেলিয়ার মারডক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক রিচার্ড ডব্লিউ বেল-এর গবেষণা মতে, ‘কৃষক যদি সারের পরিমিত ব্যবহার নিশ্চিত করে, তাহলে বছরে ৭৫ লাখ টনের বেশি ধানের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। মোট বার্ষিক লাভ হবে ২০ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা।’ এজন্য দরকার নিয়মিত সয়েল টেস্ট বা কৃষিজমির মাটি পরীক্ষা করা। মাটি পরীক্ষা করলে জানা যাবে কী কী খাদ্যোপাদান কী পরিমাণে আছে। কী পরিমাণে বাড়তি সার বা খাদ্য উপাদান দিতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, বছরের পর বছর অনুমানভিত্তিক নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম সার জমিতে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু মাটি পরীক্ষার পর দেখা গেল ফসফেটের মাত্রা অতি উচ্চ, পটাশের মাত্রাও অনেক বেশি, আবার অন্যান্য খাদ্যোপাদানের মাত্রা বেশ কম রয়েছে। কৃষক ফসল অনুযায়ী তার প্রয়োজনীয় মাত্রায় সারের ব্যবহার করছেন অথচ মাটি পরীক্ষার পর জানা যায় বেশ কিছু সারের অপব্যবহার হয়েছে। তাই প্রত্যেকটি জমির মাটি বছরে অন্তত এক বার পরীক্ষা করতে হবে। সম্ভব না হলে কমপক্ষে তিন বছর থেকে চার বছর পরপর মাটি পরীক্ষা করা উচিত।
বেশি মাত্রায় রাসায়নিক সারের ব্যবহারে মাটিতে বসবাসকারী উপকারী জীবাণুর সংখ্যাও কমতে থাকে, ফলে ফসলের ফলন কমে যায় । মাটি পরীক্ষা করে মাটির স্বাস্থ্য নিশ্চিত হয়ে সুষম সার ব্যবহার করলে শুধু যে অর্থের সাশ্রয় হবে, তা নয়, ভবিষ্যতে মাটির স্বাস্থ্য ভালো থাকবে এবং পরিবেশও ভালো থাকবে। এছাড়া মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে কৃষি ফসলের উৎপাদন খরচ শতকরা ১৫-২৫ ভাগ কমিয়ে আনা সম্ভব। এসব কারণে মাটি পরীক্ষা করা ছাড়া কোনো বিকল্প উপায় নেই। প্রধানত মাটির অম্ল/ ক্ষারের পরিমাণ, লবণের পরিমাণ, নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, সালফার, বোরন ইত্যাদি পরীক্ষা করা দরকার। প্রয়োজনে অনুখাদ্যের পরিমাণ জানতে আধুনিক স্থায়ী পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করতে হবে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে দুই ধরনের গবেষণাগারে মাটি পরীক্ষা করা যায়। প্রথমত স্থায়ী গবেষণাগার এবং দ্বিতীয়ত ভ্রাম্যমাণ মৃত্তিকা গবেষণাগারের মাধ্যমে মাটি পরীক্ষা করে সার সুপারিশ কার্ড দেওয়া হয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের সাতটি বিভাগীয় গবেষণাগার, ১৬টি আঞ্চলিক গবেষণাগার রয়েছে। এসব গবেষণাগারের মধ্যে রংপুরে একটি অবস্থিত। দেশের স্থায়ী গবেষণাগারের মাধ্যমে বছরের যে কোনো সময়ে ৬৩/-টাকার বিনিময়ে মাটির প্রায় সব উপাদান পরীক্ষা করা যায়। এছাড়াও বর্তমানে ১০ টি ভ্রাম্যমাণ মাটি পরীক্ষা গবেষণাগার (MSTL) রয়েছে, যেখানে মাত্র ২৫/-টাকার বিনিময়ে মাটি পরীক্ষার সুযোগ রয়েছে।
দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি ও সংরক্ষণের মাধ্যমে অধিক ফসল উৎপাদন করে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা একান্ত প্রয়োজন। নিজেদের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমাদের খাদ্যের উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই। এজন্য মৃত্তিকা পরীক্ষা গবেষণাগারের মাধ্যমে মাটি পরীক্ষা করে সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ করে মাটির স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে হবে।
মাটি পরীক্ষা না করলে কৃষক সাধারণত অনুমানের উপর ভিত্তি করে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ইউরিয়া বা অন্যান্য সার ব্যবহার করেন। অ্যাপের সুনির্দিষ্ট সুপারিশ অনুসরণে সারের অপচয় কমবে এবং আর্থিক সাশ্রয় হবে।
মাটির পুষ্টি উপাদানের অভাব পূরণ করে সুষম সার প্রয়োগ নিশ্চিত করার ফলে ফসলের স্বাস্থ্য ভালো থাকে এবং ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় । অতিরিক্ত রাসায়নিক সার মাটিতে জমা না হওয়ায় মাটি ও পানির দূষণ হ্রাস পাবে। খামারি অ্যাপ ব্যবহার করে কৃষক তার জমির অবস্থান এবং ফসলের প্রয়োজন অনুযায়ী একটি বিজ্ঞানসম্মত সার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সর্বোচ্চ ফলন এবং মুনাফা নিশ্চিত করতে পারবে।
বৃহত্তর রংপুর এলাকার মাটি প্রাকৃতিকভাবেই তীব্র অম্লীয় হয়ে থাকে। তাই প্রতি তিন বছর পর পর শতাংশ প্রতি ৪ কেজি ডলোচুন ব্যবহার করার জন্য বলে বিভাগ। ডলোচুন ছিটিয়ে দেওয়ার সাথে সাথেই চাষ ও মই দিয়ে মাটির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হয়। চুন মাটির গভীর স্তরে পৌঁছে গেলে এর কার্যকারিতা বাড়ে। ডলোচুন প্রয়োগে অন্তত ৭ থেকে ১৪ দিন পর জমিতে বীজ বা চারা রোপণ করতে হবে।জমির দাঁড়ানো পানিতে বা কাদা অবস্থায় ডলোচুন প্রয়োগ করা যাবে না।
জৈব সারের বহুমাত্রিক উপকারিতা রয়েছে, যা শুধু ফসলের ফলন বাড়ায় না, বরং মাটির দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের সুরক্ষাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, তাই জৈব সার ব্যবহার করা কৃষকদের জন্য জরুরি।
সর্বোপরি মাটি পরীক্ষা করে সার ব্যবহার করলে আমাদের উৎপাদন খরচ কমবে, ফলন বাড়বে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জমির স্বাস্থ্য ঠিক রেখে আমরা আমাদের সোনার ফসল ফলালো অব্যাহত রাখতে পারব এটি কৃষকসহ সবারই উপলব্ধি হোক।
আজকালের খবর/বিএস