বাংলাদেশ রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি)'র গোয়েন্দা শাখা মূলত রেলওয়ের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার জন্য পর্দার আড়ালে থেকে কাজ করে থাকে। তাদের প্রধান কাজ হলো গোপন তথ্য সংগ্রহ করা এবং অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধে সহায়তা করা।
এতে আরো রয়েছে আগাম তথ্য সংগ্রহ করা, রেলওয়ের সম্পদ রক্ষায় চুরি রোধে তথ্য দেওয়া, অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও অনিয়ম মনিটরিং করা, চোরাচালান ও অপরাধী শনাক্তকরণ এবং যে কোনো ঘটনার তদন্তে সহায়তা করা। গোয়েন্দা শাখা সাদা পোশাকে বা গোপনে কাজ করে, যেন অপরাধীরা অপরাধ করার সুযোগই না পায়। তারা মূলত বাহিনীর "চোখ ও কান" হিসেবে কাজ করে। কিন্তু সেই গোয়েন্দা শাখায় অনিয়মে অনিয়মে জর্জরিত।
পূর্বাঞ্চলের গোয়েন্দা শাখার সদস্য'রা দীর্ঘদিন যাবৎ অনিয়মের মধ্যে ডুবে আছে। যার মধ্যে আছে কাজ না করে বেতন তোলা, ভুয়া টিএ বিল তৈরী করা, চুক্তিতে দিন হারে কাজ না করা, লাইন ডিউটির নামে সরকারি টাকা আত্মসাৎ করা, অর্জিত টিএ বিলের উপর পারসেন্টেজ ভাগাভাগি করে নেয়া, আইবিতে কাজের বিপরীতে পোষ্টিং হাবিলদার ও চীফের বাসায় কাজ করা।
বাংলাদেশ রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর অধীনে সুসজ্জিত, আইন জানা, ট্রেনিং প্রাপ্ত গোয়েন্দা বাহিনী থাকলেও তা রেলের জন্য কার্যকর ভুমিকা রাখেনা। বরং বাহিনীর অভ্যন্তরীণণীয় বিষয়েও এই শাখার গুরুত্বপূর্ণ কোন কার্যক্রম দেখা যায় না। বলা হয়, এই শাখাকে কোণঠাসা করেই রাখা হয়েছে রেল থেকে।
◼️গৃহপরিচারিকা ও ব্যক্তিগত কাজে আইবি'র লোক:
কামরুজ্জামান, মনির হোসেন (এবি), ফিরোজ আলম এই তিনজন সিপাহি'কে দিয়ে নিয়মবহির্ভূত ভাবে চীফ কমান্ড্যান্ট তার ব্যক্তিগত কাজ করে গেছেন দীর্ঘ এক বছর।
এর মধ্যে সিপাহী মো. কামরুজ্জামান চীফ কমান্ড্যান্ট'র বাসায় রান্নাবান্নার কাজ করতেন। মনির হোসেন (অস্ত্র শাখায় কর্মরত) করতেন গৃহপরিচারিকার কাজ এবং বডিগার্ড ফিরোজ আলম করতো চীফ কমান্ড্যান্টের বাচ্ছাদের স্কুলে আনা নেয়া।
কথিত আছে কামরুজ্জামানের হাতের রান্না ভালো বলে তাকে রেখে দেয়া হয় বাসায় রান্না করার জন্য। এ সুবাদে বিনা পরিশ্রমে প্রতি মাসে বেতনের পাশাপাশি বাগিয়ে নেন ২৫-২৮ দিনের টিএ বিল। যা সরাসরি একটি অবৈধ কার্যক্রম। কামরুজ্জামান ও মনির বিষয়টি অস্বীকার গেলেও ফিরোজ রিকুয়েষ্ট করেন যাতে তার নাম নিউজে না আসে। এছাড়া আরো দুইজন তার হয়ে রিকুয়েষ্ট করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সদস্য বলেন, সাদা পোষাকে কাজ করার আদলে চীফ স্যারদের বাসায় কাজ করার ইতিহাস বহু আগে থেকেই। সর্বপরি আগে আরো বেশী স্টাফ ছিলো এসব কাজে, এখন কম আছে। বিগত (এবারের) দিনের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বের করলেই তাদের উপস্থিতি বের হবে। সেই সাথে যারা কাজ না করে মাসে মাসে ভুয়া টিএ বিল বানিয়ে ভোগ করে, তাদের প্রত্যেকের ব্যাংক একাউন্ট অডিট এবং তাদের হাতে থাকা মোবাইল নাম্বারটির নেটওয়ার্ক টাইমিং নিয়ে তৃতীয় কোনো সিভিল প্রশাসনের লোক তদন্ত করলে খুব সহজেই এই দুর্নীতি বের করা সম্ভব হবে। এছাড়া সিআরবির একাউন্স শাখার লোকেরাও এতে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া যায়। এই বিল পাশ করানোর জন্য তাদেরও দিতে হতো আলাদা একটা পার্সেন্টেজ।
স্টাফদের বাসায় কাজ করার বিষয়ে সরাসরি চীফ কমান্ড্যান্ট আশাবুল ইসলামকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি এমন নয়। মাঝেমধ্যে প্রয়োজন দেখা দিলে তাদের কেউ কেউ এসে আমাকে হেল্প করতো। টিএ বিলের বিষয়টি দেখার দায়িত্ব আইবির সিআই ও অফিস সংশ্লিষ্টদের।
বিধান অনুযায়ী চীফ কমান্ড্যান্ট আশাবুল ইসলাম একজন চলতি দায়িত্ব প্রাপ্ত নন ক্যাডার কর্মকর্তা। ৫ম গ্রেডের কর্মকর্তা হয়ে ৪র্থ গ্রেডের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
বাহিনীতে বিসিএস ক্যাডার পোষ্ট না থাকায় তারা পূর্ণাঙ্গ চীফ কমান্ড্যান্ট এর পদ পান না। যেহেতু তিনি পূর্ণাঙ্গ চীফ নয়, তাই তিনি ব্যক্তিগত সহকারি বা বডিগার্ড রাখতে পারেন না। তা সত্তেও সিপাহী ফিরোজ আলম'কে নিয়মবহির্ভূত ভাবে বডিগার্ড নিযুক্ত করেছিলেন। অথচ জহিরুল ইসলাম এর সময়ে এমন অভিযোগ পাওয়া যায়নি।
◼️দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে কাজের আড়ালে দূর্নীতি:
সিপাহী জাকির হোসেন ও মো. লুৎফুর রহমান দীর্ঘ ১ যুগের বেশী সময় ধরে পড়ে আছেন আইবি শাখায়। সরকারি বিধি মোতাবেক ৩ বছর পর পর বদলীর বিধান থাকলেও এই দুই সিপাহির বেলায় কোন অদৃশ্য শক্তির কারণে এরা বদলী হচ্ছে না তা অনুসন্ধানে জানা যায়, এরা দুইজন ইন্সপেক্টর এয়াসিন উল্লাহ এবং পোষ্টিং হাবিলদার ইউসুফ মৃধা'র হয়ে কথিত ক্যাশিয়ার হিসাবে কাজ করে যাচ্ছেন। এছাড়া এখানে অতীতে যত ইন্সপেক্টর এবং পোষ্টিং হাবিলদার এসেছেন, তাদের হয়েও একই কাজ এখন পর্যন্ত করে যাচ্ছেন।
তারা উভয়ে অফিস ডিউটি করলেও প্রতি মাসে লাইন ডিউটি দেখিয়ে ভুয়া টিএ বিল তৈরী করে নেয় নিজেদের নামে। এসব বিষয় তারাও অস্বীকার যায় এবং বলেন, এসব তাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ভালো জানেন।
জানা যায়, আইবি'তে কর্মরত আরএনবি সদস্যদের অর্জিত টিএ/ডিএ বিল থেকে শতকরা ২৫-৩০% সিআই এবং পোষ্টিং হাবিলদার'কে দিতে হয়। যার ৫% চীফ কমান্ড্যান্ট, ৫% সদর কমান্ড্যান্ট এবং বাকি অংশ সিআই ও পোষ্টিং হাবিলদার এর নামে ভাগাভাগি হওয়ার তথ্য উঠে আসে।
◼️কর্মস্থলে না থেকেও বেতন ও টিএ তোলার অভিযোগ:
পোষ্টিং হাবিলদার ইউসুফ মৃধা টানজিট ইয়ার্ডে নিজের নামে ভুয়া ডিউটি দেখিয়ে দিয়ে মাস শেষে টিএ বিল উত্তোলন করে যাচ্ছে দিনের পর দিন। জানা যায়, কর্মস্থলে না গিয়ে অন্যান্য সহকর্মীদের দিয়ে তার সাইন/সাক্ষর করিয়ে নেয়ার মত তথ্য আলোচনায় আসে।
ভগবান ডিউটির মাধ্যমে বছরের পর বছর চাকরি না করে সরকারি টাকা আত্মসাৎ করে যাওয়ার পিছনে পার্থ কুমার ভৌমিক ও মাসুদ আলম, পরাগ বকুল দাস এর নাম পাওয়া যায়। এখানে সিপাহি পার্থ কুমার ভৌমিক ও জাহিদুল ইসলাম প্রায় ৮-৯ বছর ধরে পড়ে আছেন। এছাড়া সিপাহি জাহিদুল ইসলাম কিছুদিন আগে সিজিপিওয়াই'তে বদলী হলে ১ দিনের মাথায় আবারো ম্যানেজ প্রক্রিয়ায় আইবিতে ফিরে এসেছেন বলেও তথ্য পাওয়া যায়।
জানা যায়, সিপাহি জাহিদুল ইসলাম পাহাড়তলীতে লাইন ডিউটি করেন৷ পাহাড়তলী লাইন ডিউটিতে মোট ৩ জন সিপাহি কাজ করেন৷ সিজিপিওয়াই থেকে পাহাড়তলী লোকো সেডে ট্যাংক ওয়াগন করে তেল আনা নেয়ার দায়িত্ব থাকলেও এই লাইনে যারা কাজ করে তাদের মধ্যে সিপাহি জাহিদুল ইসলামের মত অনেকেই সরজমিনে ডিউটি করা লাগে না। পিডিবি লাইনের সিপাহিরা তাদের লাইনের গাড়িগুলো এস্কর্ট করে নিয়ে আসেন বলেই তাদের আর ডিউটি করা লাগে না। দোহাজারী শাটলের সাথে নিয়ে আসে সিআই পোষ্টিং এর ভয়ে। এ ম্যানেজ প্রক্রিয়ায় সিআই এবং পোষ্টিং হাবিলদার'কে প্রতি মাসে ৭-৮ হাজার টাকা দেয়া লাগে। পাহাড়তলী লাইনে মাসে সর্বোচ্চ দুই থেকে তিন দিন ডিউটি করলেও অথচ তারা তাদের নামে মাসে ২৭-২৮ দিন টিএ/ডিএ বিল তৈরী করে সরকারি টাকা আত্মসাৎ করে যাচ্ছে দিনের পর দিন। সরজমিনে গিয়ে অনুসন্ধানের মাধ্যমে জানা যায়, পাহাড়তলী লাইনে আইবি'র সদস্যরা ডিউটিরত অবস্থায় নিয়মিত উপস্থিত থাকে না এবং আশেপাশের সিভিল স্টাফদের জিজ্ঞাসা করলে তারা তাদের সেখানে দেখেননি বলেও জানান।
◼️লাইন ডিউটি বেঁচাকেনা:
একই ভাবে ঢাকার ডিএ সিটি (পদ্ম মেঘনা যমুনা লোডকৃত) ওয়াগন এস্কর্ট ডিউটিতে ১জন হাবিলদার ও সিপাহী ৩ জনের দায়িত্ব থাকে। এই ডিউটি করার জন্য সিআই ও পোষ্টিং হাবিলদার'কে সিপাহিরা গড়ে সাড়ে তিন হাজার এবং হাবিলদারদের দেড় হাজার টাকা করে দিতে বাধ্য করা হয়।
সিলেট, শ্রীমঙ্গল ও মংলা বাজারের ট্যাংক ওয়াগন এস্কর্ট ডিউটিতে ৩-৪ জন সিপাহি ডিউটি করে থাকে। তারা এক একজন ৩-৪ হাজার করে সিআই/পোষ্টিং হাবিলদার বাবদ উৎকোচ দিয়ে থাকে।
রংপুর লাইনে এস্কর্ট ডিউটিতে ১জন হাবিলদার ৩ জন সিপাহির দায়িত্ব থাকে। এরাও জনপ্রতি ৩-৪ হাজার করে মাসিক মাসোহারা দেয়।
পাহাড়তলী লাইনে যাদের এস্কর্ট থাকে তাদের কাজ হল সিজিপিওয়াই থেকে সরকারি তেল আনা নেয়ার এস্কর্ট ডিউটি করা। কিন্তু তাদের যাওয়া লাগে না। এতে হাটহাজারী দোহাজারীতে যারা কাজ করে তারাই অটো নিয়ে আসেন পাহাড়তলীতে৷ বিভিন্ন গার্ডদের সূত্রেও একই তথ্য পাওয়া যায়।
এই সুবিধার বিনিময়ে সিআই ও পোষ্টিং হাবিলদারকে মাসে ৭ হাজার করে মাসোহারা দেয়া লাগে। যা আবার ৬০%-৪০% হারে ভাগাভাগি হয় সিআই ও পোষ্টিং হাবিলদারের মধ্যে। জাহিদ ও সাইফুল ইসলাম নামের দুই সদস্য পোষ্টিং হাবিলদার ইউসুফ মৃধার বাসায় ফরমায়েশ খাটার তথ্য পাওয়া যায়।
◼️ক্ষমতার অপব্যবহারে সিআই এয়াসিন:
তথ্য সূত্রে জানা যায়, সিআই এয়াসিন উল্লাহ শ্রমিক লীগ নেতা রহমত উল্লাহ চৌধুরীর ছেলে ভাস্কর চৌধুরীর তদবীরে ২০০৪ সালের নিয়োগে এএসআই পদে নিয়োগ প্রাপ্ত হয়। আরএনবির গোয়েন্দা শাখায় আসার আগে সিজিপিওয়াইতে সিআই পদে কর্মরত থেকে রেলের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ পাচার করে করে বিভাগীয় মামলায় অভিযুক্ত হয়েছিলেন। যার কিছু ডকুমেন্টস সংরক্ষিত আছে। এছাড়াও লোকোসেডের তেল চুরিতেও তিনি অভিযুক্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। যা নিয়ে আগেও বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ পায়।
সিজিপিওয়াই থাকাকালীন গত ২৪.১.২৪ তারিখে ট্রানজিট ইয়ার্ড এলাকা থেকে রেলওয়ের ব্যবহৃত কাঠের স্লিপার পাচার কালে স্থানীয় জনতা ও সাংবাদিকদের তোপের মুখে পড়ে ওইসব ট্রাক ভর্তি মালামাল সিজিপিওয়াই এর চৌকিতে নিয়ে আসেন। এতে তখন কোনো মামলা রুজু হয়নি। বরং তথ্য পাওয়া যায়, অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে সেই ট্রাক ও ট্রাক ভর্তি স্লিপার ছেড়ে দেয়ার অভিযোগও উঠেছিলো সেসময়। শুনা যাচ্ছে আইবি থেকে আবারো সিজিপিওয়াই'তে সিআই পদে যাওয়ার জন্য অগ্রিম লবিং করছেন তিনি।
উপরিউক্ত বিষয় সহ সিপাহি জাকির হোসেন, লুৎফুর রহমান, গ্যাজেট বিহীন পোষ্টধারী পোষ্টিং হাবিলদার ইউসুফ মৃধা সহ নিউজে উঠে আসা যাবতীয় বিষয়ে প্রশ্ন করলে সিআই এয়াসিন উল্লাহ জানান, এসব অনিয়মের বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। তবে কেউ যদি কোনো অন্যায়ে লিপ্ত থাকে তাদের বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিবেন তিনি। এছাড়াও উনার নিজের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি তিনি।
◼️চুক্তি ভিত্তিক ডিউটিতে থাকার তথ্য:
সোহেল আহম্মদ, মো. ইব্রাহিম, সাইফুল ইসলাম সহ কেউ কেউ প্রতিদিন ৩শ টাকা করে প্রতি মাসে গড়ে ১০-১৫ দিন মাসিক চুক্তিতে থাকার তথ্য পাওয়া যায়। যাকে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর ভাষায় ভগবান ডিউটি বলে। আবার এদের নামেও ভুয়া টিএ বিল করা হয়। তথ্য ফাঁস হলে তাদের নামে অগ্রিম ছুটি দেখিয়ে দেয়া হয়। এছাড়াও জানা যায়, তেলচোর ধরার জন্য ফাঁদপাতা ডিউটির নামে শর্শদী, মাস্তান নগর, ফৌজদারহাট এলাকায় ডিউটি বন্টন করা হলেও কোনো সদস্যদের সেখানে উপস্থিত হওয়া লাগে না৷ এখানে যাদের নামে ডিউটি বন্টন করা হয়, তাদের নামেও ভুয়া টিএ/ডিএ বিল তৈরী করা হয়। অনুসন্ধানে সেখানকার স্টেশন মাস্টার, পয়েন্টস ম্যান, পোর্টারদের সূত্রে জানা যায়, এখানে গোয়েন্দা শাখার লোক আসেই না।
◼️অল্প স্টাফের মধ্যেই কমিশন বাণিজ্য:
আইবিতে মোট স্টাফ আছে ৫৫-৬০ জন। এদের সবার নামে প্রতি মাসে কমবেশি আনুমানিক ৭-৮ লাখ টাকার টিএ বিল হয়। সিটি টিএ ৫২০ আর নরমাল ভ্রমণ বাতা ৪০০ করে পাওয়া যায়। এই টাকার বিল থেকে অফিস খরচ নাম করে ২৫-৩০% সিআই এবং পোষ্টিং হাবিলদারকে দিয়ে দেয় প্রত্যেক স্টাফরা। যা থেকে চীফ কমান্ড্যান্ট এবং সদর কমান্ড্যান্ট এর নামে আলাদা আলাদা করে ৫% হিসাব দেখানো হয় স্টাফদের। এখানে প্রশ্ন থেকে যায়, কাদের সাক্ষরে মাসের পর মাস এমন ভুয়া টিএ বিল পাশ হয় আর মাস শেষে কারাই'বা এ থেকে সুবিধা নিচ্ছে..?
এবিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মনিরুজ্জামান মনির বলেন: পবিত্র পোশাক গায়ে দিয়ে রাষ্ট্রের টাকা আত্মসাৎ করা কোনোভাবেই সাধারণ অনিয়ম নয়, এটি রাষ্ট্রদ্রোহিতার সমান অপরাধ। দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক কর্মকর্তা মাস শেষে অনৈতিকভাবে সুবিধা নিচ্ছেন, যা সরাসরি দুর্নীতির শামিল। বেতন-ভাতা কম এই অজুহাতে কেউ যদি ছোট ছোট চুরিবিদ্যা বা দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাৎ করেন, তবে সেটি কেবল নৈতিক পতনই নয়, বরং সরকারি আইন পরিপন্থী একটি দণ্ডনীয় কাজ। তিনি আরও বলেন, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ ও কঠোর অডিট ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। নিয়মিত ও স্বাধীন অডিট হলে রাষ্ট্রের অর্থ আত্মসাৎ করার সুযোগ আর থাকবে না। পাশাপাশি যেসব ব্যক্তি বা কর্মকর্তা এই ধরনের দুর্নীতি বা অনিয়মে জড়িত, তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এতে রাষ্ট্রীয় অর্থ সংরক্ষণের পাশাপাশি প্রশাসনিক শৃঙ্খলার সাথে সুশাসনও নিশ্চিত হবে।
গত সপ্তাহের শুরুতে এসব বিষয়ে তথ্য দিলে সদর কমান্ড্যান্ট ওমর ফারুক জানান, স্যার যেহেতু চলে যাবেন, তাই আর এসব বিষয়ে নিয়ে নিউজ করবেন না প্লিজ৷ অথচ তথ্য দেয়ার পরেও কোনো তদন্ত বা জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনেননি তিনি কাউকে। এর আগেরও ভগবানে থাকা লোকেদের ব্যাপারে তথ্য দিলেও তাতে কোনো ব্যবস্থা নেননি তিনি। গত ১১ ডিসেম্বর তার সাক্ষরিত এক আদেশে মোট ১৪ জনকে অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে বদলীতে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয় পূর্বাঞ্চলে। বলা হচ্ছিলো চীফ কমান্ড্যান্ট আশাবুল ইসলাম চট্টগ্রাম থেকে বদলীর শেষ পর্যায়ে ৩০ জনকে বদলী করে শেষ অনৈতিক সুবিধা লুফে নিয়ে যাচ্ছেন। বিভিন্ন সময়ের মত ওমর ফারুকের সাক্ষরে বদলীর বিষয়ে তাকে বলা হলে তিনি জানাতেন, আমি জাস্ট হুকুমের গোলাম। এছাড়া আমার কোনো কিছুতে সম্পৃক্ততা নেই। এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রশ্ন বৃদ্ধ হন খোদ চীফ কমান্ড্যান্ট আশাবুল ইসলাম। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনিও জানান, আমার অধীনস্থ দুই কমাড্যান্ট এসব বদলীগুলো করে থাকেন। তাদের রিকুয়েষ্টেই এসব হয়। যেমনটি উদাহরণ দিয়েছেন, কমাড্যান্ট শহীদ উল্লাহ এর ব্যাপারে। বলা হয়েছে, উনি রিকুয়েষ্ট করেছেন এই বদলী গুলো করতে তাই আমি করেছি। অন্য দিকে কমাড্যান্ট শহীদ উল্লাহ জানান, আমার বদলী করার কোনো নিজস্ব ক্ষমতা নেই। স্যার করেন বলেই আমার করতে হয়।
◼️প্রতি সপ্তাহে বদলী বাণিজ্য উৎসব:
পূর্বাঞ্চলে গত এক বছরে ৪-৫শ বদলী বাণিজ্য হয়েছে, যাতে মিনিমাম ২০-৩০ আর স্থান ভেদে একদেড় লাখ টাকার তথ্য উঠে আসে। যার আনুমানিক গড় হিসাবে আড়াই থেকে ৩ থেকে কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। যা অতিতের সব রেকর্ড ভেঙ্গে দিয়েছে। কেউ কেউ বলছেন আরো বেশী বদলী আর বিস্তর অনৈতিক সুবিধা নেয়া হয়েছে এই সময়ে। এমন প্রশ্নের জবাবে আশাবুল ইসলাম বলেন, আমি আসার পর পর প্রথম দিকে প্রশাসনিক স্বার্থে ১৫০ জনের মত বদলী করেছি। এতে কোনো আর্থিক লেনদেন হয় নি।
প্রশ্ন উঠেছে তার দুদকের মামলার বিষয়ে। যদিও তিনি অকপটেই বলেছেন, মামলাটি আর নেই, আমার নাম কমিটিতে থাকার কারণে দুদকের মামলায় আমার নাম এসেছিলো। যদিও প্রশ্ন থেকে যায় তার ওই সময়ের পদোন্নতি'কে ঘিরে।
তথ্যসূত্রে জানা যায়, চীফ কমান্ড্যান্ট আশাবুল ইসলামের বদলীর আগের দুইদিন শুক্র ও শনিবার দুইদিন অফ ডে'তেও তিনি এবং সদর কমান্ড্যান্ট ওমর ফারুক গোপনভাবে কার্যক্রম সেরেছেন। তবে জানা যায়নি কি ছিলো সেই অফ ডে'র গোপন তড়িঘড়ি কার্যক্রম।
◼️জাদুর লাঠির খ্যাত সদস্যদের একচেটিয়া রাজত্ব:
মূলত গত এক বছরে চট্টগ্রামে যত বদলী হয়েছে তা নিয়ে বাহিনীর ভিতরে বাহিরে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তথ্য উঠেছে অনৈতিক বিনিময়ে প্রথম বদলীর দুই তিন মাস পরেও পছন্দের জায়গায় বদলী হয়ে যাওয়া যায়। অথচ যারা বছরের পর বছর একই জায়গায় বিভিন্ন অপকর্ম করে যাচ্ছে তাদের বিষয়ে পূর্বাঞ্চলের তিন কর্মকর্তার কোনো ভূমিকাই ছিলো না। যাদের বলা হয় জাদুর লাঠি। যাদের প্রস্থানে মধ্য ভোগী কর্মকর্তা হয়ে যেতে পারেন অনৈতিক আয় থেকে বঞ্চিত। সব চেয়ে বেশী অভিযোগ ছিলো, নিয়ম অনুযায়ী বাহিনীর যোগ্য ব্যক্তিদের শূন্য পদে রেখে দেয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সহকারী তৈরী না করা। যার ফলে একটা সুবিধা ভোগী সিন্ডিকেট বাহিনীর আইন কানুন ভঙ্গুর করে দিয়েছে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মাস শেষের বিশেষ সুবিধার মাধ্যমে। যার ফলে ওই সব পদে যেতে না পারা সদস্য, অনৈতিক সুবিধা বঞ্চিত সদস্য, রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে নিজ ক্ষমতা জাহির, অন্য সদস্যদের দমন করণ, মাসিক সুবিধার বিনিময়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হাতের লাঠি বানিয়ে যেমন ইচ্ছা তেমন প্রভাব খাটানোর কিংবা ব্যক্তিগত রেষারেষির কারণে হিংসায় ক্রোধে কিছু থেকে কিছু হলেই বাহিনীর তথ্য লিক আউট হয়ে যায় মুহূর্তেই। যা রেলের অন্যান্য ডিপার্টমেন্টে এমন নজির নেই।
ব্যাপকভাবে আরো আলোচনা হচ্ছে, নতুনভাবে দায়িত্ব প্রাপ্ত হতে যাওয়া চীফ কমান্ড্যান্ট জহিরুল ইসলামকে নিয়ে। পূর্বের যত অনিয়ম-দুর্নীতি আর গা ঘেষা স্বজনপ্রীতির পরিবেশে বাহিনীর শৃঙ্খলা হারিয়েছে, তা থেকে নিজেকে আলাদা করে তিনি কি পারবেন কঠোর হতে? তিনি কি নিবেন বিগত দিনের ঘটে যাওয়া যত অন্যায় অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা? তিনি কি পারবেন পূর্বাঞ্চলের ভঙ্গুর ব্যবস্থা থেকে বাহিনীকে আলাদা করতে? নাকি আগের হালেই চলবে বাহিনীর কার্যক্রম, তা জানা যাবে তার দায়িত্ব প্রাপ্ত হওয়ার পরেই।
আজকালের খবর/বিএস