রবিবার ১৯ এপ্রিল ২০২৬
শুধুই আনন্দ নয়, গবেষণায় জীবন্ত এক প্রদর্শনী: জাবির প্রজাপতি মেলা
প্রকাশ: শনিবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০২৫, ২:২৬ পিএম   (ভিজিট : ১৩৪৩)
'উড়লে আকাশে প্রজাপতি, প্রকৃতি পায় নতুন গতি'—এই স্লোগানকে সামনে রেখে প্রতিবারের মতো এবারও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) অনুষ্ঠিত হলো ১৫তম প্রজাপতি মেলা। প্রতি বছর শীতের শুরুতে জাবির সবুজ ক্যাম্পাস যেন ভিন্ন এক রূপে সেজে ওঠে, আর এই সজ্জার কেন্দ্রে থাকে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য প্রেমীদের জন্য এক অভূতপূর্ব মিলনক্ষেত্র: জাবি প্রজাতি মেলা।

দূর থেকে দেখলে এটিকে হয়তো কেবলই প্রাণিকূলের এক আনন্দময় প্রদর্শনী মনে হতে পারে; কিন্তু এই সাধারণ মেলার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বিশাল বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টা এবং গভীর গবেষণার কাজ। এই আয়োজন কেবল কৌতূহলী দর্শকদের ভিড় জমানোর জায়গা নয়, বরং এটি জাবির শিক্ষার্থীসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বছরের পর বছর ধরে চালানো নিবিড় গবেষণা, পর্যবেক্ষণ এবং জীববৈচিত্র্যের তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের নিরলস চেষ্টার প্রতিফলন।

প্রজাপতি মেলা আসলে শুধু মেলা নয়—এর নেপথ্যে রয়েছে সমস্ত অজানা গল্প, প্রকৃতি এবং প্রাণীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার এবং প্রকৃতি সংরক্ষণের অঙ্গীকারকে উন্মোচিত করা। এটি সাধারণ মেলা থেকে এক বৃহৎ জীববৈজ্ঞানিক গবেষণামূলক প্রদর্শনীতে রূপান্তরিত হয়েছে।

প্রতি বছর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের কীটতত্ত্ব শাখার উদ্যোগে গবেষণা এবং মেলার কাজ হয়ে থাকে। মেলায় মূলত প্রজাপতি প্রজাতি সংরক্ষণ, বিলুপ্তপ্রায় প্রজাপতি নিয়ে আলোচনা ও প্রদর্শনীর ব্যবস্থা থাকে।

মৌমাছির পাশাপাশি প্রজাপতিও প্রকৃতিতে পরাগায়নের কাজটি করে। দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে কীটপতঙ্গের পরাগায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পরাগায়ন ভালোভাবে না হলে প্রকৃতিতে খাদ্যের ঘাটতি পড়বে। এর সঙ্গে প্রকৃতির নিজস্ব ভারসাম্যও প্রভাবিত হবে। জলবায়ুর ওপরও এর প্রভাব পড়ে। মূলত প্রজাতির বৈচিত্র্যময় কর্মকাণ্ড পরিবেশের জন্য টিকিয়ে রাখতে গবেষকেরা কাজ করে যাচ্ছেন নিরলসভাবে।

গবেষণা ও মেলার আয়োজন সম্পর্কে গবেষক এবং মেলার আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মো. মনোয়ার হোসেন বলেন: "প্রজাপতিকে ঘরে বা বাগানে রাখলে হবে না। আমরা চাই প্রজাপতি কী, এর ভূমিকাটা কী, এবং কেন এটি কমে যাচ্ছে—এই কথাগুলো ছোটবেলা থেকে শিক্ষার্থীদের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া যাক। তাহলে তারা প্রকৃতি, প্রজাপতি এবং সংরক্ষণ এই বিষয়গুলো নিয়ে বড় হবে, সেই সাথে সংরক্ষণের জন্য ভূমিকা রাখবে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও বিলুপ্তির কারণ অনুসন্ধানে ড. মনোয়ার হোসেন আরও বলেন, জাবি ক্যাম্পাসের প্রেক্ষিতে প্রজাপতি সংরক্ষণের জন্য প্রশাসন থেকে শুরু করে সবাই সচেতনভাবে কাজ করে। "আমরা গত ১৫-২০ বছর ধরে গবেষণা করে আসছি কোন গাছে প্রজাপতি ডিম পাড়ে, কোন ফুলে মধু বেশি, কোন প্রজাতি কমে যাচ্ছে, কেন কমে যাচ্ছে—এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে তার সম্পর্ক কী, এ বিষয়গুলো আমরা নিরূপণ করি এবং মানুষের মাঝে তথ্যগুলো ছড়িয়ে দেই।"

তিনি জানান, গবেষণার মাধ্যমে তারা নিয়মিত তথ্য তুলে ধরেন, যেমন প্রজাপতি কোন ফুলে যায় বা কোন গাছে ডিম পাড়ে। বর্তমানে সুন্দরবনেও তাদের কাজ চলছে। "সুন্দরবনের প্রকৃতির সাথে গাছপালার সম্পর্ক এবং কোন গাছের জন্য প্রজাপতি বেঁচে আছে বা টিকে আছে, কোন গাছ কমে যাওয়ায় প্রজাপতিও কমে গেছে—এই পপুলেশন সার্ভে আমরা গত দুই থেকে আড়াই বছর ধরে করতেছি।"

প্রজাপতির অর্থনৈতিক অবদানের বিষয়ে ড. মনোয়ার হোসেন আরও জানান, প্রজাপতি শস্যের উৎপাদন বাড়ায়। যেমন, সরিষা ফুলে মৌমাছির পাশাপাশি প্রজাপতিও গুরুত্বপূর্ণ।

"প্রজাপতির সবচেয়ে বড় লাভ হলো আমাদের বনাঞ্চলে। আমরা কেউ গাছ লাগাই না, কিন্তু পরাগায়নের ফলে সেখানেই বনের বীজ উৎপন্ন হয়। গাছকে বীজ উৎপাদনে সাহায্য করাই এর সবচেয়ে বড় কাজ। বন বাঁচলে আমরা বাঁচব, আমরা অক্সিজেন পাব এবং খাদ্য পাব, যা কৃষি অর্থনীতিতে বেশ ভূমিকা পালন করে। এছাড়া এর মাধ্যমে বাংলাদেশের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ জলবায়ু পরিবর্তনও মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।"

গবেষণামূলক এই প্রদর্শনী ছাড়াও পরিবেশ এবং প্রাণীদের নিয়ে যারা গবেষণা করেন কিংবা সংরক্ষণের জন্য কাজ করেন, তাঁদের সম্মাননা জানানো হয়। পাশাপাশি, প্রকৃতিতে প্রজাতিদের গুরুত্ব ও ভূমিকা তুলে ধরতে ছোট শিশু এবং কিশোরদের জন্য ছিল নানা আয়োজন। এর মধ্যে ছিল: প্রজাপতি বিষয়ক ছবি আঁকা ও কুইজ প্রতিযোগিতা। প্রজাপতির আলোকচিত্র প্রদর্শনী ও প্রতিযোগিতা। প্রজাপতি বিষয়ক ডকুমেন্টারি প্রদর্শনী। প্রজাপতির হাট দর্শন, ঘুড়ি উড্ডয়ন এবং প্রজাপতি চেনা প্রতিযোগিতা।

এছাড়া মেলা শুরুর আগে, মেলায় সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি বর্ণাঢ্য র‍্যালিরও আয়োজন করা হয়।
 
এবারের মেলায় প্রকৃতি সংরক্ষণে সার্বিক অবদানের জন্য বন্যপ্রাণী বিশারদ ও সংরক্ষণবিদ ড. আলী রেজা খানকে 'বাটারফ্লাই অ্যাওয়ার্ড' প্রদান করা হয়।

'বাটারফ্লাই ইয়াং এনথুসিয়াস্ট অ্যাওয়ার্ড' প্রদান করা হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী নুরে আফসারী ও শাহরিয়ার রাব্বি তন্ময়কে। এছাড়া আলোকচিত্র প্রতিযোগিতায় পুরস্কৃত হন সৈয়দ আব্বাস, মাহমুদুল বারি ও প্রিন্স পাল জয় এবং 'মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড' প্রদান করা হয় মো. আহসান হাবীব (একুশে টেলিভিশন), মো. মিজানুর রহমান (দৈনিক স্বদেশ প্রতিদিন) ও মাহ আলমকে (বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা)।

উল্লেখ্য, ২০০৬ সাল থেকে চলমান এই গবেষণার মাধ্যমে প্রজাপতি মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

আজকালের খবর/বিএস 







আরও খবর


Advertisement
সর্বশেষ সংবাদ
খালেদা জিয়ার শেষবিদায়ে দায়িত্বশীল সবার প্রতি তারেক রহমানের কৃতজ্ঞতা
পুঠিয়ায় বাজারে বালুবাহী ট্রাক উল্টে নিহত ৪
কুড়িগ্রাম শহরে নিষিদ্ধ হিযবুত তাহরীরের পোস্টার, বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ শিক্ষার্থী আটক
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
বিশ্ব মিডিয়ায় খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবর
সোনালী ব্যাংক ম্যানেজারের বিরুদ্ধে জাতীয় পতাকা অবমাননার অভিযোগ
খালেদা জিয়ার জানাজা বুধবার দুপুর ২টায় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায়
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor@gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor@gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft