সোমবার ২৭ জুলাই ২০২৬
আনোয়ারায় লাখের বেশি কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে সিঙ্গেল উইন্ডো সেবা
প্রকাশ: সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬, ৫:০৩ পিএম   (ভিজিট : ০)
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় গড়ে ওঠা চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (সিইআইজেড) দেশের শিল্পায়ন, বিদেশি বিনিয়োগ এবং রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। 

তিনি বলেছেন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের পাশাপাশি সড়ক, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, ড্রেনেজ, যোগাযোগ অবকাঠামো ও অন্যান্য সহায়ক সুবিধা বিবেচনায় নিলে সিইআইজেডে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হবে।

সোমবার (২৭ জুলাই) চট্টগ্রামের আনোয়ারায় সিইআইজেডের উন্নয়নকাজের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, সিইআইজেড সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। এই শিল্পাঞ্চল কেবল নতুন কারখানা নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ জনবল সৃষ্টি এবং বৈশ্বিক উৎপাদন শৃঙ্খলে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে।

তিনি বলেন, বর্তমানে প্রকল্পে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের শিল্প বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে অবকাঠামো নির্মাণ, ইউটিলিটি সংযোগ, অভ্যন্তরীণ সড়ক, লজিস্টিকস ব্যবস্থা এবং অন্যান্য উন্নয়ন ব্যয় যুক্ত করলে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ সহজেই ১ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করবে।

অর্থমন্ত্রী জানান, এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে পূর্ণাঙ্গ শিল্প কার্যক্রম শুরু হলে এক লাখেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এর ফলে আনোয়ারা, কর্ণফুলী, চট্টগ্রাম মহানগরীসহ আশপাশের এলাকায় নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিকাশ ঘটবে। পরিবহন, গুদামজাতকরণ, ব্যাংকিং, বীমা, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্যও নতুন ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি হবে।

তিনি বলেন, একটি শিল্পাঞ্চল শুধু কারখানা গড়ে তোলে না; এর সঙ্গে গড়ে ওঠে শক্তিশালী সাপ্লাই চেইন, সহায়ক শিল্প এবং বহুমাত্রিক সেবা খাত। ফলে স্থানীয় অর্থনীতি আরও গতিশীল হয়ে ওঠে এবং কর্মসংস্থানের পরিধিও বাড়তে থাকে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার বিদেশি ও দেশীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি সহজ, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করছে। অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে এবং বিনিয়োগের গতি বাড়াতে বিভিন্ন খাতে ডিরেগুলেশন (নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ) কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন ব্যবসার জন্য ২৪ ঘণ্টা, সপ্তাহে সাত দিন উন্মুক্ত। বিনিয়োগের পথে যেসব বাধা রয়েছে, সেগুলো দূর করতে সরকার প্রয়োজনীয় নীতিগত পরিবর্তন অব্যাহত রাখবে।”

দীর্ঘদিনের আলোচিত সিঙ্গেল উইন্ডো সার্ভিস দ্রুত চালু করা হবে বলে আশ্বাস দেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানান, বিনিয়োগকারীদের বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরতে হবে না; এক প্ল্যাটফর্ম থেকেই প্রয়োজনীয় অনুমোদন, নিবন্ধন ও সরকারি সেবা পাওয়া যাবে।

তার ভাষায়, এই ব্যবস্থা চালু হলে বিনিয়োগ প্রক্রিয়ায় সময় ও ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশ আরও আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠবে।

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের একটি উদ্বেগের বিষয় ছিল অর্জিত মুনাফা ও মূলধন নিজ দেশে ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়া। এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার সেই বাধাগুলো দূর করছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগ করে যে মুনাফা অর্জিত হবে, তা সহজেই নিজ দেশে পাঠানোর সুযোগ নিশ্চিত করা হবে। এমনকি কোনো বিনিয়োগকারী ভবিষ্যতে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে চাইলে তার মূলধন ফেরত নেওয়ার ক্ষেত্রেও জটিলতা কমিয়ে আনা হবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের পুঁজিবাজারকে আধুনিক ও কার্যকর করতে সরকার পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এর মাধ্যমে তারা সহজে মূলধন সংগ্রহ করতে পারবেন এবং বাংলাদেশের সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও এসব প্রতিষ্ঠানের অংশীদার হওয়ার সুযোগ পাবেন।

তিনি আরও বলেন, শুধুমাত্র ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর না করে পুঁজিবাজারকে শিল্প অর্থায়নের অন্যতম উৎস হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

শিল্পায়নের সঙ্গে দক্ষ মানবসম্পদের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বাংলাদেশে একটি চীন-বাংলাদেশ দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, আনোয়ারা বা চট্টগ্রামে এমন একটি কেন্দ্র গড়ে উঠলে স্থানীয় তরুণদের আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব হবে।

তিনি বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের প্রতি এ বিষয়ে সহযোগিতার আহ্বান জানান। তার মতে, দক্ষ জনবল তৈরি হলে দেশের শিল্পখাত যেমন উপকৃত হবে, তেমনি বিদেশেও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, শিল্পায়নের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, উন্নয়ন যেন পরিবেশের ক্ষতির কারণ না হয়, সেদিকে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।

তিনি শ্রমিকদের জন্য আবাসন সুবিধার প্রশংসা করে বলেন, উন্নত বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা বর্তমান সময়ের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। শিল্পোন্নয়নের পাশাপাশি শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নও সরকারের অগ্রাধিকার।

তিনি বলেন, আমরা এমন একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চাই, যেখানে শিল্পের উন্নয়ন হবে, কর্মসংস্থান বাড়বে, আবার মানুষের জীবনযাত্রার মানও উন্নত হবে। পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের কল্যাণ সবকিছুর সমন্বয়েই টেকসই উন্নয়ন সম্ভব।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সিইআইজেড চালু হলে বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও গভীর হবে। শিল্পাঞ্চলটিতে ইলেকট্রনিকস, প্রকৌশল, টেক্সটাইল, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ, রাসায়নিক শিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং উচ্চমূল্য সংযোজনকারী বিভিন্ন শিল্পে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে।

চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর, কর্ণফুলী টানেল, কক্সবাজার মহাসড়ক এবং ভবিষ্যতের মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ সুবিধা থাকায় এই অর্থনৈতিক অঞ্চল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্যও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর ফলে রপ্তানি বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং স্থানীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, সিইআইজেডের চেয়ারম্যান ওয়াং বেনচিয়ান, সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ, আবু সুফিয়ান, সরওয়ার জামাল নিজাম, হুমাম কাদের চৌধুরী, চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক, চট্টগ্রাম কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এস এম সাইফুল আলম, এম এম ইস্পাহানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান মির্জা সালমান ইস্পাহানিসহ সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা।

আজকালের খবর/বিএস 







আরও খবর


Advertisement
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor$gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor$gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor$gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor$gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft