গাজীপুর মহানগরীর চান্দনা চৌরাস্তার একটি আবাসিক হোটেলে গার্মেন্টস কর্মী শান্তা বেগম (৩৩) হত্যাকাণ্ডের রহস্য মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
এ ঘটনায় নিহতের স্বামী ও মামলার প্রধান আসামি মো. সাইফুল ইসলামকে (৩৯) ঢাকার দক্ষিণখান এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের পর আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে স্ত্রীকে হত্যার দায় স্বীকার করেছেন তিনি। তার কাছ থেকে নিহতের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনও উদ্ধার করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) গাজীপুরে নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পিবিআই গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার মো. রকিবুল আক্তার।
পিবিআই জানায়, গত ২১ জুলাই দুপুর ১টা ৪৮ মিনিটে শান্তা বেগম ও সাইফুল ইসলাম স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে চান্দনা চৌরাস্তার ‘আনোয়ারা ম্যানশন’ ভবনের ইভ্যালি আবাসিক হোটেলের ৩০৭ নম্বর কক্ষ ভাড়া নেন। ওই রাত প্রায় ১০টা ৪৮ মিনিটে হোটেল কর্তৃপক্ষের খবরে জিএমপির বাসন থানা পুলিশ কক্ষ থেকে শান্তার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে। তার গলা ও বুকে ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। ঘটনার পর থেকেই সাইফুল পলাতক ছিলেন।
প্রাথমিকভাবে নিহতের পরিচয় অজ্ঞাত থাকলেও পিবিআইয়ের ক্রাইম সিন ইউনিট আঙুলের ছাপ, তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে তার পরিচয় শনাক্ত করে। নিহত শান্তা বেগম নাটোর সদর উপজেলার চরলক্ষীকোল গ্রামের শহিদুল ইসলামের মেয়ে। তিনি গাজীপুরের কালিয়াকৈরের সফিপুর এলাকায় ভাড়া বাসায় থেকে একটি পোশাক কারখানায় কর্মরত ছিলেন। তিনি দুই সন্তানের জননী।
এ ঘটনায় নিহতের বাবা বাদী হয়ে বাসন থানায় দণ্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলাটি পিবিআইয়ের তফসিলভুক্ত হওয়ায় ২৩ জুলাই সংস্থাটি তদন্তভার গ্রহণ করে। পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান আনসারীকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। পুলিশ সুপার মো. রকিবুল আক্তারের তত্ত্বাবধানে বিশেষ তদন্ত দল ছায়া তদন্ত শুরু করে।
তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় আসামির অবস্থান শনাক্ত করে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ঢাকার দক্ষিণখান থানার ফায়দাবাদ ট্রান্সমিটার মোড় এলাকা থেকে সাইফুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার কাছ থেকে নিহতের মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ এবং আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে সাইফুল জানান, এটি ছিল তাদের উভয়ের তৃতীয় বিয়ে। বিয়ের পর থেকেই আগের সংসার, সন্তান এবং পারিবারিক বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে অবিশ্বাস ও দাম্পত্য কলহ চলছিল। ঘটনার দিন হোটেলে অবস্থানকালে পুরোনো বিষয় নিয়ে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ছুরি দিয়ে শান্তাকে হত্যা করেন। পরে পরিচয় গোপন করার উদ্দেশ্যে তার ব্যাগ থেকে মোবাইল ফোন ও জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে পালিয়ে যান।
সংবাদ সম্মেলনে পিবিআই গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার মো. রকিবুল আক্তার বলেন, অজ্ঞাত নারীর মরদেহ উদ্ধারের পরপরই ঘটনাস্থলে ক্রাইম সিন টিম পাঠানো হয় এবং সমান্তরালভাবে ছায়া তদন্ত শুরু করা হয়। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা, তথ্যপ্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার এবং তদন্ত দলের ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই নিহতের পরিচয় শনাক্ত, প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তার এবং হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়েছে।
তিনি আরও জানান, মামলার অন্যান্য আলামত সংগ্রহ, সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণ যাচাই শেষে দ্রুত আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
গ্রেপ্তার সাইফুল ইসলামকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আদালতে দেওয়া তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, উদ্ধার হওয়া মোবাইল ফোন, হোটেলের রেজিস্টার, সিসিটিভি ফুটেজ এবং অন্যান্য আলামত যাচাই করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে পিবিআই।
আজকালের খবর/বিএস