গাজীপুর মহানগরীর পূবাইল এলাকায় পুরোনো টায়ার থেকে তেল তৈরির একটি কারখানায় আবারও বয়লার বিস্ফোরণ ও ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
শনিবার (২০ জুন) দুপুরে পূবাইল কলেজ গেট এলাকায় অবস্থিত ‘অটো গ্রিন অয়েল’ নামের ওই কারখানায় বিকাল ২টা ১০ মিনিটে এ বিস্ফোরণ ঘটে। বিকট শব্দে বিস্ফোরণের পর কারখানাজুড়ে আগুন ছড়িয়ে পড়লে পুরো এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। পরে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা এসে ৩টা ৪০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কারখানাটিতে বয়লারের মাধ্যমে পুরোনো ও পরিত্যক্ত টায়ার গলিয়ে তেল উৎপাদন করা হয়। শনিবার দুপুরে হঠাৎ বয়লারটি বিস্ফোরিত হলে মুহূর্তের মধ্যে পুরো কারখানায় আগুন ধরে যায়। বিস্ফোরণের শব্দ এতটাই জোরালো ছিল যে, আশপাশের সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। খবর পেয়ে টঙ্গী ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের তিনটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে।
টঙ্গী ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার শাহীন আলম বলেন, প্রাথমিকভাবে বয়লার বিস্ফোরণ থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে এনেছেন। এই ঘটনায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
বর্তমানে ‘অটো গ্রিন অয়েল’ নামে পরিচালিত এই কারখানাটি স্থানীয়দের কাছে বহু বছর ধরেই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। এর আগের নাম ছিল ‘স্মার্ট মেটাল অ্যান্ড কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ’। একই স্থানে বারবার দুর্ঘটনার কারণে কারখানাটিকে ঘিরে স্থানীয়দের মনে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও আতঙ্ক রয়েছে।
আজকের বিস্ফোরণ এলাকাবাসীর মনে এক দশক আগের সেই মর্মান্তিক স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। ২০১৬ সালের ২৩ জানুয়ারি তৎকালীন ‘স্মার্ট মেটাল অ্যান্ড কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজে’ এক ভয়াবহ বয়লার বিস্ফোরণ ঘটেছিল। বিস্ফোরণের পর ছিটকে আসা আগুন ও দাহ্য পদার্থে ঘটনাস্থল রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পরবর্তীতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ব্যক্তিসহ নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল অন্তত ৮ জনে।
সেই দুর্ঘটনায় শুধু কারখানার শ্রমিকরাই নন, প্রাণ হারিয়েছিলেন সাধারণ পথচারীরাও। নিহতদের মধ্যে ছিলেন বড়ইবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা সিদ্দিকা জেবুন্নেছা (ডলি)। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, তিনি রিকশাযোগে কারখানার সামনের সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় এই দুর্ঘটনার শিকার হন এবং ঘটনাস্থলেই দগ্ধ হয়ে মারা যান। এছাড়া এক রিকশাচালকসহ আরও কয়েকজন সাধারণ মানুষও ওই দিন প্রাণ হারান।
দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টিকারী সেই ঘটনার পর জেলা প্রশাসন কারখানাটি সিলগালা করে বন্ধ করে দেয়।
প্রশাসন কর্তৃক সিলগালা করার কিছুদিন পর নতুন ব্যবস্থাপনায় ‘অটো গ্রিন অয়েল’ নামে কারখানাটি আবারও চালু করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নতুন নামে চালু হলেও কারখানার মূল ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রমে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। উল্টো এবার কারখানার চারদিকে অত্যন্ত উঁচু প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে ভেতরের কার্যক্রম বাইরে থেকে দেখা না যায়।
শনিবারের এই ঘটনার পর আবারও কারখানার নিরাপত্তা ও প্রশাসনের তদারকি নিয়ে জোরালো প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, অতীতে আটটি তাজা প্রাণ ঝরে যাওয়ার পরও জনবসতিপূর্ণ এলাকায় কীভাবে পুনরায় এই ঝুঁকিপূর্ণ কারখানা চালানোর অনুমতি দেওয়া হলো, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই স্থানে বারবার বিস্ফোরণ প্রমাণ করে যে, কারখানার নিরাপত্তা ঝুঁকি এখনও পুরোপুরি দূর করা হয়নি। পরিবেশগত অনুমোদন, বয়লারের মান ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নতুন করে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
আজকালের খবর/বিএস