গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার উঁচু ও চালা জমিতে উৎপাদিত সুস্বাদু কাঁঠালের সুনাম রয়েছে দেশজুড়ে। মৌসুম এলেই উপজেলার ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে অবস্থিত জৈনা বাজার পরিণত হয় দেশের অন্যতম বৃহৎ কাঁঠালের পাইকারি হাটে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ব্যবসায়ীদের হিসাবমতে, শুধু এই বাজার থেকেই প্রতি সপ্তাহে কোটি টাকার বেশি কাঁঠাল দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতিবছর জ্যৈষ্ঠ থেকে শ্রাবণ মাস পর্যন্ত জৈনা বাজারে কাঁঠালের এই বৃহৎ হাট বসে। প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে কেনাবেচা। এখানে দৈনিক ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকার কাঁঠাল বিক্রি হয়, যা সপ্তাহজুড়ে কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, স্থানীয় বিভিন্ন এলাকা থেকে ভ্যান ও ছোট যানবাহনে করে কাঁঠাল এনে সড়কের পাশে স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। পরে পাইকাররা দরদাম করে সেগুলো কিনে সন্ধ্যার পর ট্রাকে ভর্তি করে নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, বরিশাল, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠাচ্ছেন। এই মৌসুমি হাটকে ঘিরে প্রায় চার মাস ধরে স্থানীয় দুই থেকে আড়াই শতাধিক মানুষের সাময়িক কর্মসংস্থান হয়েছে।
শনিবার (২০ জুন) সকালে হাটে কথা হয় পাইকারি ব্যবসায়ী মো. আক্কাস আলীর সঙ্গে। তিনি জানান, মাঝারি আকারের ১০০টি কাঁঠালের একটি লট ৫ থেকে ৭ হাজার টাকায় এবং বড় আকারের লট ৭ থেকে ৯ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ঢাকা থেকে আসা পাইকার আব্দুল হালিম বলেন, "শ্রীপুরের কাঁঠাল সুস্বাদু হওয়ায় এর চাহিদা সবসময় বেশি। আমি প্রতি সপ্তাহে প্রায় দুই হাজার কাঁঠাল কিনে ঢাকায় নিয়ে যাই।"
কাঁঠালের আড়তদার দেলোয়ার হোসেন জানান, প্রতিদিন এখান থেকে ১০ থেকে ১৫ ট্রাক কাঁঠাল বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। জৈনা বাজারের ইজারাদার রাসেল মিয়া বলেন, "প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কৃষক ও খুচরা ব্যবসায়ীরা কাঁঠাল নিয়ে আসেন, আমরা তাদের সার্বিক নিরাপত্তা ও সুবিধা নিশ্চিত করছি।"
তবে জমজমাট বেচাকেনার মধ্যেও খরচ ও দাম নিয়ে কিছুটা হতাশ কৃষক ও খুচরা ব্যবসায়ীরা। তাঁদের অভিযোগ, গাছ থেকে কাঁঠাল সংগ্রহ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের ব্যয় বাড়লেও লাভের পরিমাণ কম। উপজেলার বারতোপা গ্রামের কৃষক আব্দুল আলী বলেন, "এ বছর ফলন ভালো হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার টাকার কাঁঠাল বিক্রি করেছি।" স্থানীয় খুচরা ব্যবসায়ী বাবলু মিয়া বলেন, "গ্রাম থেকে ২০ থেকে ৬০ টাকায় কাঁঠাল কিনে আকারভেদে ৩০ থেকে ৮০ টাকায় পাইকারদের কাছে বিক্রি করি। তবে খরচের তুলনায় লাভ খুব বেশি থাকে না।"
গাজীপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় প্রায় ৩ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে কাঁঠাল গাছ রয়েছে, যার সিংহভাগই শ্রীপুর উপজেলায়। উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, শ্রীপুরে বছরে গড়ে প্রায় ৭৮ হাজার টন কাঁঠাল উৎপাদিত হয়। এখানে প্রধানত খাজা, গালা ও দুরসা জাতের কাঁঠালের চাষ বেশি।
শ্রীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুমাইয়া সুলতানা বলেন, "শ্রীপুরের কাঁঠালের ব্র্যান্ডিং ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব বাড়াতে আমাদের বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে। কাঁঠাল সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে আচার ও 'রেডি টু কুক' পণ্য তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি এই সুস্বাদু কাঁঠাল বিদেশে রপ্তানির সম্ভাবনাও যাচাই করা হচ্ছে।"
আজকালের খবর/কাওছার আল হাবীব