গাজীপুর জেলা পরিষদের এফডিআর (ফিক্সড ডিপোজিট রিসিপ্ট) সংক্রান্ত একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত আলোচিত প্রতিবেদনকে “ভিত্তিহীন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ফরমায়েশি সংবাদ” দাবি করে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন গাজীপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক ব্যারিস্টার ড. চৌধুরী ইশরাক আহমেদ সিদ্দিকী।
তিনি বলেছেন, যেখানে জেলা পরিষদের অর্থ ঝুঁকিমুক্ত করে অধিক নিরাপদ ও লাভজনক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় স্থানান্তর করা হয়েছে, সেখানে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন করে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। এটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নয়, নতুন সরকারের উন্নয়ন ভাবনার বিরুদ্ধেও একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের প্রয়াস।
বৃহস্পতিবার (৭ মে) দুপুরে গাজীপুর জেলা পরিষদের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রশাসক ইশরাক এসব কথা বলেন।
সংবাদ সম্মেলনে জেলা পরিষদের কর্মকর্তা-কর্মচারী, স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিক এফডিআরের ৬২ কোটি টাকা সিইওর কবজায়” শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, গাজীপুর জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. নজরুল ইসলাম একযোগে ১৪টি ব্যাংক থেকে ৬২ কোটি টাকার এফডিআর ভেঙে পে-অর্ডার আকারে নিজের জিম্মায় রেখেছেন এবং এ ক্ষেত্রে যথাযথ অনুমোদন নেওয়া হয়নি। প্রতিবেদনে এটিকে নীতিবহির্ভূত ও আর্থিক অনিয়ম হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
তবে সংবাদ সম্মেলনে প্রশাসক ইশরাক দাবি করেন, সংবাদটিতে বাস্তব তথ্য উপেক্ষা করে উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিভ্রান্তিকর উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনি বলেন, এই সংবাদে যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে এবং যেভাবে বিষয়টিকে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা স্পষ্টভাবে হলুদ সাংবাদিকতার উদাহরণ। সাংবাদিকদের প্রতি আমাদের আহ্বান থাকবে-সত্যতা যাচাই না করে কোনো প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় এমন সংবাদ প্রকাশ করা উচিত নয়।
তিনি বলেন, আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর দেখতে পাই, জেলা পরিষদের বিপুল অঙ্কের অর্থ বিভিন্ন দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকে নিম্ন সুদে জমা রাখা ছিল। অনেক এফডিআর মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থায় পড়ে ছিল। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এসব ব্যাংকে অর্থ রাখা নিরাপদ ছিল না। জনগণের অর্থ সুরক্ষা ও অধিক মুনাফা নিশ্চিত করতেই আমরা ব্যাংকিং পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ গ্রহণ করি।
প্রশাসক ইশরাকের দাবি, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই এফডিআর স্থানান্তরের কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। তিনি বলেন, গাজীপুর জেলা পরিষদের প্রায় ৩৫ কোটি টাকা ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকগুলোতে ছিল। সেই অর্থ উদ্ধার করে সোনালী ব্যাংকসহ রেটিংয়ে শক্তিশালী ও নিরাপদ ব্যাংকে স্থানান্তর করা হয়েছে। এর ফলে অর্থের নিরাপত্তা যেমন নিশ্চিত হয়েছে, তেমনি মুনাফাও বেড়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও দাবি করেন, দীর্ঘদিনের আর্থিক অব্যবস্থাপনা কাটিয়ে বর্তমান প্রশাসন জেলা পরিষদের আর্থিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে। তার ভাষ্যমতে, পূর্বে প্রায় ৫৫ কোটি টাকার আমানত ছিল, যা বর্তমানে ১১৫ কোটিতে উন্নীত হয়েছে। সঠিক আর্থিক পরিকল্পনা, তদারকি ও জবাবদিহিতার মাধ্যমেই এই প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে।
তিনি বলেন, “যেখানে জেলা পরিষদের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে, জনগণের অর্থ নিরাপদ হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানের লাভ বেড়েছে, সেখানে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশংসা করার পরিবর্তে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এটি দুঃখজনক।
প্রশাসক ইশরাক অভিযোগ করেন, দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে গাজীপুর জেলা পরিষদ একটি দুর্নীতি ও অনিয়মের সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে ছিল। বর্তমান প্রশাসন সেই চক্র ভেঙে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়ায় একটি স্বার্থান্বেষী মহল অস্বস্তিতে পড়েছে।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সুবিধাভোগী কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং কয়েকজনকে বদলি করা হয়েছে। তারাই প্রতিহিংসা থেকে বিভ্রান্তিকর তথ্য সরবরাহ করে অপপ্রচার চালাচ্ছে। উন্নয়ন কার্যক্রম থামিয়ে দিতে এবং প্রতিষ্ঠানকে বিতর্কিত করতেই এই মিথ্যা প্রচারণা।
সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, গণমাধ্যম রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। বর্তমান গণতান্ত্রিক পরিবেশে সাংবাদিকরা স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারছেন। তাই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার স্বার্থে তথ্য যাচাই-বাছাই করে সংবাদ প্রকাশ করা জরুরি। ভুল ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে সংবাদ পরিবেশন করলে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হয় না, জনগণের মধ্যেও বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়।
তিনি আরও বলেন, আমরা একটি জনকল্যাণমুখী, আধুনিক ও দুর্নীতিমুক্ত জেলা পরিষদ গড়ে তুলতে কাজ করছি। জনগণের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। উন্নয়নের এই যাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে যারা অপপ্রচার চালাচ্ছে, জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করবে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, জেলা পরিষদের আর্থিক খাত পুনর্বিন্যাসের ফলে আগের তুলনায় অধিক মুনাফা অর্জিত হচ্ছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংক থেকে অর্থ সরিয়ে নিরাপদ ব্যাংকে রাখার ফলে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক নিরাপত্তাও বৃদ্ধি পেয়েছে।
আজকালের খবর/বিএস