এর আগে সম্মানসূচক পাম দ’র সম্মান অর্জন করেন অ্যাগনেস ভারদা, মার্কো বেল্লছিও, জোডি ফস্টার, মেরিল স্ট্রিপ এবং গত বছর রবার্ট ডি নিরো’র মতো বিশ্বনন্দিতরা। এবার সেই তালিকায় কান চলচ্চিত্র উৎসবের ৭৯তম আসরে যুক্ত হতে যাচ্ছেন বিশ্বখ্যাত নিউজিল্যান্ডের নির্মাতা পিটার জ্যাকসন। হলিউড ব্লকবাস্টার ও শিল্পধর্মী সিনেমাকে অনন্য শিল্পদৃষ্টি ও প্রযুক্তিগত সাহসিকতার সঙ্গে মিলিয়ে নতুন মাত্রা দেওয়ার স্বীকৃতিস্বরূপ এই সম্মান পাচ্ছেন তিনি।
সম্মাননা প্রসঙ্গে জ্যাকসন বলেন, ‘‘কান উৎসবে সম্মানসূচক পাম দ’র পাওয়া আমার ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় সম্মান। আমার চলচ্চিত্রজীবনে কান সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ১৯৮৮ সালে আমার প্রথম চলচ্চিত্র ‘ব্যাড টেস্ট’ নিয়ে আমি ফেস্টিভ্যালের মার্কেটপ্লেসে অংশ নিয়েছিলাম। পরে ২০০১ সালে ‘দ্য লর্ড অব দ্য রিংস: দ্য ফেলোশিপ অব দ্য রিং’ ছবির একটি প্রিভিউ সিকোয়েন্স এখানে দেখানো হয়েছিল। এই উৎসব সব সময় সাহসী ও দূরদর্শী সিনেমাকে উদযাপন করে। এমন একটি মঞ্চ থেকে স্বীকৃতি পাওয়ার খবর পেয়ে আমি কৃতজ্ঞ।”
২০০১ সালের ১৩ মে। সেবার কান উৎসবের উদ্বোধনী ছবি ছিল ‘মুলাঁ রুজ!’, নির্মাতা বাজ লহরম্যান। একই আসরে জুরি প্রেসিডেন্ট লিভ উলমান-এর হাত থেকে পাম দ’র জিতেছিলেন নান্নি মরেটি তার চলচ্চিত্র ‘‘দ্য সন’স রুম’’ দিয়ে। সেই উৎসবেই সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ প্রদর্শনীতে দেখানো হয়েছিল ‘দ্য লর্ড অব দ্য রিংস: দ্য ফেলোশিপ অব দ্য রিং’ ছবির ২৬ মিনিটের ফুটেজ। সেটা ছবিটি বিশ্বব্যাপী মুক্তির সাত মাস আগের খবর। প্রথমে কিছু সংশয় থাকলেও পরে সেটি ব্যাপক প্রশংসা পায়। সেখান থেকেই শুরু হয় মধ্য-পৃথিবী বা ‘মিডল আর্থ’-এর সেই মহাকাব্যিক চলচ্চিত্রযাত্রা।
পরবর্তীতে ‘দ্য লর্ড অব দ্য রিংস’ ট্রিলজি জিতে নেয় ১৭টি অস্কার! এর মধ্যে ‘দ্য লর্ড অব দ্য রিংস: দ্য রিটার্ন অব দ্য কিং’ একাই পায় ১১টি অস্কার। যে রেকর্ড আগে ছিল ‘বেন-হার’ এবং ‘টাইটানিক’-এর দখলে। সিরিজটি বিশ্বব্যাপী আয় করে প্রায় তিন বিলিয়ন ডলার।
ব্রিটিশ লেখক জে. আর. আর টলকিন-এর বিখ্যাত ফ্যান্টাসি উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই ট্রিলজি চলচ্চিত্রে গল্প বলার ধরণই বদলে দেয়। তিনটি ছবি, যথাক্রমে ‘দ্য লর্ড অব দ্য রিংস: দ্য ফেলোশিপ অব দ্য রিং’ (২০০১), ‘দ্য লর্ড অব দ্য রিংস: দ্য টু টাওয়ার্স’ (২০০২) ও ‘দ্য লর্ড অব দ্য রিংস: দ্য রিটার্ন অব দ্য কিং’ (২০০৩)।
সবগুলোই শুটিং হয়েছে নিউজিল্যান্ডে। বিশাল এই প্রযোজনায় ছিল দুই বছরের প্রি-প্রোডাকশন, ২৭৪ দিনের শুটিং, তিন বছরের পোস্ট-প্রোডাকশন, ২০ হাজারের বেশি এক্সট্রা শিল্পী এবং প্রায় ২৪০০ প্রযুক্তিকর্মী।
জ্যাকসনের নিজস্ব ভিএফএক্স স্টুডিও এই সিরিজে ব্যবহৃত প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের জন্য বিশেষ প্রশংসা পায়।
বিশ্বজুড়ে সাফল্যের পর ২০০৫ সালে জ্যাকসন নির্মাণ করেন ‘কিং কং’। পরে আবার টলকিয়েনের জগতে ফিরে এসে পরিচালনা করেন ‘দ্য হবিট’ ট্রিলজি, যা মুক্তি পায় ২০১২ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে।
সাম্প্রতিক সময়ে তিনি ব্যতিক্রমধর্মী তথ্যচিত্র নির্মাণেও মনোযোগ দিয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘দে শ্যাল নট গ্রো ওল্ড’ (২০১৮), যেখানে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আর্কাইভ ফুটেজ নতুন প্রযুক্তিতে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি সংগীত ইতিহাস নিয়ে নির্মাণ করেছেন আলোচিত মিনি সিরিজ ‘দ্য বিটলস: গেট ব্যাক’, যেখানে ব্রিটিশ ব্যান্ড দ্য বিটলস-এর অপ্রকাশিত ফুটেজ ব্যবহার করা হয়েছে।
দীর্ঘ চার দশকের চলচ্চিত্রযাত্রায় প্রযুক্তি, কল্পনা ও গল্প বলার অনন্য সমন্বয়ে বিশ্ব সিনেমায় স্থায়ী প্রভাব ফেলেছেন পিটার জ্যাকসন। সেই অবদানের স্বীকৃতিই এবার মিলছে কান উৎসবের সর্বোচ্চ সম্মানসূচক পুরস্কারে।
৭৯তম কান উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হচ্ছে ১২ মে ২০২৬ ফ্রান্সের কানসৈকতে, সেদিনই আনুষ্ঠানিকভাবে পিটার জ্যাকসনের হাতে তুলে দেওয়া হবে সম্মানসূচক পাম দ’র। এমনটাই নিশ্চিত করেছে কানকর্তৃপক্ষ।
আজকালের খবর/আতে