বুধবার ২০ মে ২০২৬
নির্বাচনে ডিজিটাল প্রচারণায় এআই এর প্রভাব
প্রকাশ: শনিবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০২৬, ৯:২৭ পিএম  আপডেট: ৩১.০১.২০২৬ ৯:৩৮ পিএম  (ভিজিট : ৭০৫)
নির্বাচন মানে কেবল ব্যালট কাগজ নয়; আজকাল এটি তথ্য, গণমাধ্যম এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের লড়াই। এই নতুন ডিজিটাল বাস্তবতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই–এর ব্যবহার অনেক সময় ভোটের মাঠে বিপুল প্রভাব ফেলতে পারে। একদিকে এআই প্রচারণাকে দ্রুত, লক্ষ্যভিত্তিক ও ব্যক্তিগতকৃত করে, অন্যদিকে এটি ভোটার বিভ্রান্তি, গুজব এবং রাজনৈতিক চাপ তৈরি করার নতুন মাধ্যমও হয়ে উঠেছে।

ডিজিটাল প্রচারণায় এআইয়ের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ভুয়া তথ্য এবং Fact-Chaking ভিডিও। গত কয়েক বছরে বিশ্বের বিভিন্ন নির্বাচনে দেখা গেছে, অও–চালিত ভিডিও বা ছবি দিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের কথাবার্তা বিকৃতভাবে দেখানো হয়েছে। ভোটারদের কাছে এই কন্টেন্ট বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় এবং তা তাদের মানসিক প্রভাবিত করে। বাংলাদেশেও সাম্প্রতিক সময়ের সোশ্যাল মিডিয়ার নজরে এসেছে ভুয়া ছবি, সংশোধিত ভিডিও এবং প্রপাগান্ডা, যা সরাসরি ভোটারদের মনোভাব প্রভাবিত করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাই বলা যায় না; এটি তথ্য ও প্রযুক্তির যুদ্ধক্ষেত্রেও পরিণত হচ্ছে।

আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো মাইক্রোটার্গেটিং এবং অ্যালগরিদম-চালিত ভোটার প্রভাব। এআই ব্যবহার করে ভোটারের ব্যক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়-জন্মদিন, শিক্ষাগত যোগ্যতা, আগ্রহের বিষয়- এবং সেই অনুযায়ী বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়। এটি প্রচারণাকে বহুগুণে কার্যকর করতে পারে, কিন্তু ভোটারদের নিজস্ব বিবেক ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার সম্ভাবনা তৈরি করে। অনেক সময় ভোটার বুঝতেই পারেন না কোন বার্তাটি প্রকৃত এবং কোনটি কৃত্রিমভাবে প্রণীত।

সোশ্যাল মিডিয়ায় অও চালিত বট বা স্বয়ংক্রিয় অ্যাকাউন্টও বড় হুমকি। এই বটগুলো ভুল তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে দেয়, ভধপঃ-পযবপশরহম কে নিঃশব্দ করে, এবং জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করে। এছাড়া তারা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অসম্মানিত করে এমন বার্তা ছড়িয়ে দিয়ে ভোটারদের মানসিক চাপ বাড়ায়। ফলে ভোট প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণের বিশ্বাস ক্ষুণ্ন হয়।

এই ঝুঁকি মোকাবেলায় নির্বাচন কমিশন, প্রযুক্তি কোম্পানি এবং নাগরিক সমাজকে সমন্বিত ও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। প্রথমত, ভোটারদের প্রযুক্তিগত সচেতনতা বাড়াতে হবে। ডিজিটাল প্রচারণায় অও চালিত কন্টেন্ট চিনতে শেখানো, সোর্স যাচাই করা এবং বিশ্বাসযোগ্য তথ্য উৎস ব্যবহার করা অপরিহার্য। ভোটারের নিজের বিবেচনামূলক ক্ষমতা ডিজিটাল প্রভাবের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ।

দ্বিতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের দায়িত্ব আরও বৃদ্ধি করতে হবে। অও চালিত Misinformation শনাক্ত করার প্রযুক্তি ব্যবহার করা, স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং Watermarks বা সতর্কতা প্রদানের মতো পদ্ধতি বাধ্যতামূলক করা দরকার। এমনকি নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হওয়ার আগেই ভুয়া কন্টেন্ট সনাক্ত করা গেলে ভোটার বিভ্রান্তি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

তৃতীয়ত, আইনগত কাঠামো আধুনিক পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে আপডেট করতে হবে। অও চালিত ভুল তথ্য ছড়ানো, Deepfakt ভিডিও তৈরি বা নির্বাচনী প্রচারণায় স্বচ্ছতা না থাকা- এসবের জন্য স্পষ্ট শাস্তিমূলক বিধান থাকা জরুরি। বাংলাদেশে নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যেই কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যেমন ডিজিটাল অ্যাকাউন্ট নিবন্ধন, Oneline Monitoring এবং তথ্য যাচাই। তবে এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—ভোটার সচেতনতা। ভোটারকে বুঝতে হবে যে ডিজিটাল প্রচারণা অনেক সময় কেবল রাজনৈতিক প্রপাগান্ডা নয়; এটি তাদের মতামত ও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার সরঞ্জামও হতে পারে। তাই ভোটের আগে সব তথ্য যাচাই করা, গুজব থেকে দূরে থাকা এবং আবেগের সঙ্গে নয়, তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া আবশ্যক।

এআই–চালিত ডিজিটাল প্রচারণার নেতিবাচক প্রভাব শুধু গণতন্ত্রের স্বচ্ছতা কমায় না; এটি ভোটারের আস্থা ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। যদি ভোটার বিভ্রান্ত হয়, সঠিক তথ্য না পায়, বা প্রভাবিত হয়, তাহলে শুধুমাত্র নির্বাচনের ফল নয়, পুরো রাজনৈতিক পরিবেশ ও সরকারের গ্রহণযোগ্যতাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়।

সংক্ষেপে, ডিজিটাল প্রচারণায় এধাই-এর ব্যবহার ইতিবাচক ও নেতিবাচক- উভয় দিকই রয়েছে। এটি নির্বাচনী বার্তা পৌঁছে দিতে, প্রচারণাকে দক্ষ করতে এবং ভোটারকে সঠিকভাবে জানাতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে বিভ্রান্তি, মিথ্যা তথ্য ও প্রোপাগান্ডার ঝুঁকি বাড়ায়। তাই ভোটার সচেতনতা, সামাজিক মিডিয়ার দায়বদ্ধতা এবং আইনগত নিয়ন্ত্রণ ছাড়া নির্বাচনী প্রক্রিয়া সুরক্ষিত রাখা অসম্ভব।

আজকের বাস্তবতায় গণতন্ত্রকে রক্ষা করার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো সচেতন ভোটার ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া। ডিজিটাল প্রচারণার নতুন ঝুঁকি মোকাবেলায় এই সমন্বয়ই একমাত্র কার্যকর উপায়। নতুবা, এধাই-চালিত Misinformation ভোট প্রক্রিয়া, জনমত ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে গুরুতরভাবে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।

লেখকঃ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক 











Advertisement
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor@gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor@gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft