সরকারি ব্যয়ে লাগাম টেনে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানোই ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ব্যয়সাশ্রয়ী নানা পদক্ষেপের ঘোষণাও দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, কাগুজে উদ্যোগের বাইরে গিয়ে পরিচালন খাতে একের পর এক ব্যয় বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফল হিসেবে নিকট-অতীতে প্রথমবারের মতো গত অর্থবছরে সরকারের পরিচালন ব্যয় মোট রাজস্ব আয়ের চেয়েও বেশি হয়ে যায়। অথচ সরকারের রাজস্ব আয়ে বড় অঙ্কের ঘাটতি রয়েছে।
গত অর্থবছরে পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতার মধ্যে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো দ্বিগুণেরও বেশি করার প্রস্তাব করেছে পে কমিশন। অন্যদিকে আগামী সরকারের মন্ত্রীদের জন্য বিলাসবহুল ফ্ল্যাট প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা। এসব সিদ্ধান্ত নতুন নির্বাচিত সরকারের জন্য শুরুতেই অর্থ খরচ অনেক বাড়িয়ে দিতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক বিশ্লেষণ ও সংস্থান পরিকল্পনা থাকে। সরকার জানে কীভাবে অর্থের জোগান দিতে হয়।
সংকট মোকাবিলার উদ্যোগ ও বাস্তবতা
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আর্থিক খাতে দুর্নীতির প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অর্থনীতির ক্ষত সারাতে নানা উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি সরকারি ব্যয়ে আরও লাগাম টানতে অর্থ মন্ত্রণালয় একাধিক প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র জারি করে।
বাস্তবে এসব নির্দেশনার বাইরে গিয়ে পরিচালন বাজেটের আওতায় ধারাবাহিকভাবে ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। এর সূচনা হয় ২০২৪ সালের শেষ দিকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ২০ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা দেওয়ার উদ্যোগ দিয়ে। তীব্র সমালোচনার মুখে সে সিদ্ধান্ত বাতিল হলেও ২০২৫ সালের জুলাই থেকে গ্রেডভেদে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বিশেষ আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয়।
ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি ও বাড়তি আর্থিক দায়
পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম বড় খাত হলো ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গত ফেব্রুয়ারিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রায় ১৬ বছরে অবসর নেওয়া ৭৬৪ জন সাবেক কর্মকর্তাকে উপসচিব থেকে সচিব পর্যন্ত ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেয়। এর মধ্যে ১১৯ জন সচিব পদে উন্নীত হন।
এ ছাড়া প্রশাসন ক্যাডার বাদে অন্যান্য ক্যাডারের আরও ৭৮ জন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ভূতাপেক্ষ পদোন্নতির বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। এসব পদোন্নতির ফলে সরকারের ওপর স্থায়ী আর্থিক দায় তৈরি হয়েছে।
ভাতা বৃদ্ধির ধারাবাহিক সিদ্ধান্ত
গত ১৪ আগস্ট সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিষয়ভিত্তিক অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ ভাতা বাড়ানো হয়। এতে প্রশিক্ষণার্থীদের ভাতা দ্বিগুণ এবং প্রশিক্ষকদের ভাতা সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অধীন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের ভাতাও ২০ থেকে ৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
গত জুলাই মাসে পুলিশ সদস্যদের ঝুঁকিভাতা ২০ শতাংশ বাড়ানো হয়। কনস্টেবল থেকে এসআই/সার্জেন্ট পর্যায় পর্যন্ত চাকরির বয়সভিত্তিক পাঁচ ধাপে নতুন হার নির্ধারণ করা হয়। ফলে বছরে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় ১০০ কোটি টাকা। একই সঙ্গে গ্রাম পুলিশ বাহিনীর বেতন এক হাজার টাকা এবং অবসরকালীন ভাতা ২০ হাজার টাকা বাড়ানো হয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দেশের ৬০টি কূটনৈতিক মিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বৈদেশিক ভাতা ২০ থেকে ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়, ফলে বছরে অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগে ১৫ বছরে মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম না থাকায় চলতি অর্থবছরের বাজেটে সারাদেশে এক হাজার ৫১৯টি মাদ্রাসা এমপিওভুক্ত করার ঘোষণা দেওয়া হয়। ইতোমধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হয়েছে, বাকিগুলো প্রক্রিয়াধীন। এর ফলে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, বাড়ি ভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা বাবদ পরিচালন ব্যয় আরও বাড়বে।
পে কমিশনের প্রস্তাব ও বড় অঙ্কের ব্যয়
সর্বশেষ ২১ জানুয়ারি জাতীয় পে কমিশন সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও পেনশন সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। এই প্রস্তাব বাস্তবায়নে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।
এমনকি তিন অর্থবছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হলেও প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত জোগান দিতে হবে, যা দেশের মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় সাড়ে তিন মাসের সমান।
সরকারি গাড়ি ও বিলাসী স্থাপনায় ব্যয়
অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে তিন দফায় সরকারি যানবাহন কেনার মূল্যসীমা বাড়ানো হয়েছে। এসি মিনিবাস, বাস, প্রাইভেট কার, জিপ, পিকআপ, ট্রাক ও মোটরসাইকেলের মূল্যসীমা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এদিকে ঢাকার মন্ত্রীপাড়ায় ৭২টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট নির্মাণে ৭৮৬ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। এর আগে মন্ত্রীদের জন্য ৬০টি গাড়ি কেনার প্রস্তাব তীব্র সমালোচনার মুখে বাতিল হলেও নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের জন্য ২২০টি গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত বহাল থাকে।
পরিচালন ব্যয়ের চাপে বাজেট
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অন্তর্বর্তী সরকার ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করে। তবে সংশোধিত বাজেটে পরিচালন ব্যয়ে ২৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। উন্নয়ন ব্যয় থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা কমানো হয়েছে। শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা বাবদই বাড়তি ২২ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে পরিচালন ব্যয়ের চিত্র আরও স্পষ্ট হয়েছে। অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে এ খাতে ব্যয় হয়েছে ৯০ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ১১ দশমিক ৪৭ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ হার ছিল ১০ দশমিক ২৩ শতাংশ, তার আগের বছর আরও কম।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার বাজেটের বিপরীতে ব্যয় হয় ৬ লাখ ২৮ হাজার ৫৪৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে পরিচালন ব্যয় ছিল ৪ লাখ ৭৪ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা। অথচ অনুদানসহ মোট রাজস্ব আদায় হয় ৪ লাখ ৩৮ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা। অর্থাৎ রাজস্ব আয়ের চেয়ে পরিচালন ব্যয় বেশি ছিল প্রায় সাড়ে ৩৫ হাজার কোটি টাকা।
সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সাধারণত রাজস্ব আয় দিয়ে পরিচালন ব্যয় মেটানোর পাশাপাশি কিছু উন্নয়ন ব্যয় ব্যবহার হয়। কিন্তু পরিচালন ব্যয়ের সমান রাজস্ব সংগ্রহ না হওয়া আশঙ্কার। নব্বই দশকের পর এ ধরনের পরিস্থিতি দেখা যায়নি। তা ছাড়া চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে পরিচালন ব্যয় বাড়ানো হয়েছে, যা যৌক্তিক নয়। বরং সরকারের উচিত পরিচালন ব্যয় কমিয়ে এনে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানো। কারণ উন্নয়ন ব্যয় না বাড়লে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক কে এ এস মুরশিদ বলেন, রাজস্ব না বাড়ার পরও অযৌক্তিকভাবে পরিচালন ব্যয় বাড়ানো যথাযথ নয়। আগেও সরকারের এই ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা ছিল। এখন আরও প্রকট হয়েছে। এখন হয়তো সরকার বেতন-ভাতা বাড়িয়ে কর্মকর্তাদের খুশি করার চেষ্টা করছে। কিন্তু এ ধরনের বাড়তি পরিচালন ব্যয়ের ক্ষেত্রে আরও চিন্তাভাবনার প্রয়োজন রয়েছে। অর্থের সংস্থান না করে এত বেশি বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ কার্যকর হলে মহাসংকট হিসেবে দেখা দেবে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সানেমের নির্বাহী পরিচালক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে ব্যয় কমানোর কথা বলেছিল। অথচ আশ্চর্যজনকভাবে দেখা যাচ্ছে, নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক সরকারের মতো আচরণ করছে। ভবিষ্যতের মন্ত্রীদের জন্য সর্বোচ্চ স্বাচ্ছন্দ্য দেওয়ার উদ্যোগ একটি অরাজনৈতিক সরকারের কাজ হতে পারে না।
তিনি আরও বলেন, সরকারের পরিচালন ব্যয় বাড়ছে, অথচ উন্নয়ন ব্যয় কমছে। বর্তমানে অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে এই প্রবণতা যৌক্তিক নয়। বর্তমান সরকারের উচিত ছিল জনকল্যাণমুখী ব্যয়ের দিকে নজর বাড়ানো।
আজকালের খবর/ এমকে