বুধবার ৭ জানুয়ারি ২০২৬
সশস্ত্র বাহিনী মানবিকতার অগ্রদূত
আব্দুল্লাহ আল মামুন
প্রকাশ: রবিবার, ৪ জানুয়ারি, ২০২৬, ১০:৫৮ পিএম
বাংলাদেশ বিশ্বে দুর্যোগপ্রবণ দেশগুলোর অন্যতম। ভৌগোলিক অবস্থান, উচ্চ জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের কারণে এ দেশে প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ প্রায় নিয়মিত বাস্তবতা। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিধস, অগ্নিকাণ্ড কিংবা বড় দুর্ঘটনা—প্রতিবছরই কোনো না কোনো সংকট দেশের মানুষের জীবন ও জীবিকাকে বিপন্ন করে তোলে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মূল উদ্দেশ্য হলো ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা, ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের পাশে দাঁড়ানো এবং দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথ সুগম করা। এই কঠিন বাস্তবতায় কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা জাতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, আর সেই প্রয়াসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরেই এক অনন্য ও নির্ভরযোগ্য ভূমিকা পালন করে আসছে।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দেশ ও জাতির সেবায় নিয়োজিত। দেশের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষা তাদের প্রধান দায়িত্ব হলেও, প্রয়োজনের সময় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করা সেনাবাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে পরিণত হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, মানবিক সহায়তা এবং জাতি গঠনমূলক কর্মকাণ্ডে সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ আজ সর্বজনস্বীকৃত। দেশে কোনো বড় দুর্যোগ দেখা দিলে দল-মত নির্বিশেষে মানুষের প্রথম প্রত্যাশাই থাকে সেনাবাহিনী মোতায়েনের, যা এই বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থার প্রতিফলন।

দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বেসামরিক প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করে এবং প্রায় সব ক্ষেত্রেই অগ্রভাগে থাকে। ভবন ধস, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস কিংবা অগ্নিকাণ্ডে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে সেনাবাহিনীর তৎপরতা বারবার জীবন রক্ষায় ভূমিকা রেখেছে। দুর্গম এলাকায় পৌঁছাতে নৌযান, বিশেষায়িত অনুসন্ধান দল এবং আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহারের মাধ্যমে সেনাবাহিনী কার্যকর উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে। পাশাপাশি সেনাবাহিনীর মেডিক্যাল টিম আহতদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসা, নিরাপদে হাসপাতালে স্থানান্তর এবং প্রয়োজন হলে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ব্যবস্থাও করে থাকে।

বাংলাদেশে বন্যা সবচেয়ে ঘনঘটিত ও বিধ্বংসী প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর একটি। প্রায় প্রতিবছরই দেশের কোনো না কোনো অঞ্চল বন্যার কবলে পড়ে। এই সংকটময় সময়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ এবং বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসনে নিরলসভাবে কাজ করে। বন্যার সময় আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন, খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সেনাসদস্যরা ঝুঁকি নিয়ে পানিবন্দী মানুষদের উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসে। ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত ও অবকাঠামো পুনরুদ্ধারেও সেনাবাহিনীর অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংঘটিত বন্যাগুলোতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছিল বিশেষভাবে প্রশংসিত। ২০২৪ সালের বন্যায় দিন-রাত নিরবচ্ছিন্নভাবে ত্রাণ বিতরণ, হেলিকপ্টার থেকে শুকনা খাবার নিক্ষেপ, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ এবং চিকিৎসাসেবা প্রদান করে সেনাবাহিনী মানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে ওঠে। এর আগে পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলেও সেনাবাহিনীর উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা অসংখ্য মানুষের প্রাণ রক্ষা করেছে। খাদ্যসামগ্রী, ওষুধ, পানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য পৌঁছে দিয়ে তারা দুর্গত মানুষের দুর্ভোগ অনেকটাই লাঘব করতে সক্ষম হয়।

বন্যার সময় স্বাস্থ্যঝুঁকি মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়। জলবাহিত রোগের বিস্তার রোধে সেনাবাহিনীর আর্মি মেডিক্যাল কোর ফিল্ড হাসপাতাল ও মোবাইল মেডিক্যাল ইউনিট স্থাপন করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিট ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, সেতু ও কালভার্ট মেরামতের মাধ্যমে যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখতে সহায়তা করে। বন্যাকবলিত বিভিন্ন জেলায় সেনাবাহিনী যে আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে, তা স্বচ্ছতা ও গুণগত মানের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময়ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য ভরসার আশ্রয় হয়ে ওঠে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া, ত্রাণ বিতরণ, বাঁধ মেরামত এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনে সেনাবাহিনীর অবদান অনস্বীকার্য। সিডর, আইলা কিংবা বুলবুলের মতো ঘূর্ণিঝড়ে সেনাবাহিনীর দ্রুত পদক্ষেপ বহু প্রাণহানি রোধ করেছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করেছে।

মানবসৃষ্ট দুর্যোগের ক্ষেত্রেও সেনাবাহিনীর ভূমিকা ইতিহাসে উজ্জ্বল। ২০১৩ সালের রানা প্লাজা ধসের পর দীর্ঘ উদ্ধার অভিযানে নেতৃত্ব দিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অসংখ্য মানুষকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। উদ্ধারকাজের শৃঙ্খলা, চিকিৎসা সহায়তা, মৃতদেহ শনাক্তকরণ ও হস্তান্তর—সব ক্ষেত্রেই সেনাবাহিনী পেশাদারিত্বের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে, যা আন্তর্জাতিকভাবেও প্রশংসিত হয়।

কোভিড-১৯ মহামারির সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মানবিকতার এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করে। লকডাউন বাস্তবায়ন, খাদ্য সহায়তা, কোয়ারেন্টাইন সেন্টার স্থাপন এবং ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসাসেবা প্রদানের মাধ্যমে সেনাবাহিনী মানুষের পাশে দাঁড়ায়। বিশেষ করে দুর্গম ও পাহাড়ি এলাকায় ঘরে ঘরে খাদ্য পৌঁছে দেওয়ার দৃশ্য জাতির স্মৃতিতে স্থায়ী হয়ে আছে।

ভূমিধস কিংবা বড় অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্যোগেও সেনাবাহিনী সবসময় কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। উদ্ধারকাজে অংশ নিতে গিয়ে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করার ঘটনাও সেনাবাহিনীর আত্মত্যাগের প্রমাণ দেয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোর বড় অগ্নিদুর্ঘটনাগুলোতে সেনাবাহিনীর দ্রুত সহায়তা না থাকলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা আরও ভয়াবহ হতে পারত।

সাম্প্রতিক সময়ে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় সেনাবাহিনীর তৎপরতা আবারও জাতিকে নাড়া দিয়েছে। দুর্ঘটনার পরপরই সেনাবাহিনীর সদস্যরা উদ্ধারকাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে অসংখ্য আহত শিশুকে জীবিত উদ্ধার করে হাসপাতালে পৌঁছে দেন। এই দ্রুত ও সাহসী পদক্ষেপের কারণে বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়, যা দেশের মানুষের হৃদয়ে গভীর কৃতজ্ঞতার ছাপ ফেলেছে।

দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিয়মিত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে এবং সর্বদা প্রস্তুত থাকে। তবে ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আধুনিক সরঞ্জাম ও সক্ষমতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রাথমিক সতর্কতা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং জনগণকে সচেতন করার উদ্যোগ জোরদার করা জরুরি। সেনাবাহিনী, বেসরকারি সংস্থা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে পারলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে।

‘সমরে আমরা, শান্তিতে আমরা, সর্বত্র আমরা দেশের তরে’—এই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যে কোনো দুর্যোগে নির্ভরতার প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়। উদ্ধার, ত্রাণ, পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের প্রতিটি ধাপে তাদের অবদান শুধু মানবিক সেবার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি স্থিতিস্থাপক ও প্রস্তুত জাতি গঠনের পথ প্রশস্ত করছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় সেনাবাহিনীর এই অব্যাহত অঙ্গীকার ভবিষ্যতেও বাংলাদেশকে আরও শক্তিশালী ও নিরাপদ করে তুলবে—এমন প্রত্যাশাই দেশের মানুষের।

লেখকঃ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক 


আজকালের খবর/ এমকে








http://ajkalerkhobor.net/ad/1751440178.gif
সর্বশেষ সংবাদ
জকসুর ২৩ কেন্দ্রের ফল ঘোষণা, হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস
বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি, জেএফ–১৭ যুদ্ধবিমান বিক্রিতে নজর পাকিস্তানের
দেশের ৩৫ জেলায় শনাক্ত নিপাহ ভাইরাস, আইইডিসিআরের সতর্কবার্তা
শহীদদের আত্মত্যাগ জাতির ইতিহাসে চিরদিন লিপিবদ্ধ থাকবে : প্রধান উপদেষ্টা
হলফনামায় গরমিল নিয়ে সারজিসের ব্যাখ্যা
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
বিপিএলের উপস্থাপনা প্যানেল থেকে বাদ ভারতীয় উপস্থাপিকা
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির কম্বল বিতরণ
সাতক্ষীরায় পশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় খামারিদের নিয়ে উঠান বৈঠক
ভেনেজুয়েলার পর ট্রাম্পের নজর যে ৫ দেশ ও অঞ্চল ওপর
নির্বাচন নিয়ে সন্দেহ ছড়ানোদের নজরদারিতে রেখেছে সরকার: প্রেস সচিব
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : হাউস নং ৩৯ (৫ম তলা), রোড নং ১৭/এ, ব্লক: ই, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ফোন: +৮৮-০২-৪৮৮১১৮৩১-৪, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor@gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor@gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft