
বাংলাদেশের ভূচিত্রে পুকুর, খাল, নদী শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়—এগুলো আমাদের সংস্কৃতি, কৃষি ও জনজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ দ্রুত নগরায়ণ, দখল ও অব্যবস্থাপনার কারণে ঢাকার জলাশয় আজ বিলুপ্তির পথে।
সাংবাদিক ও লেখক হেলিমুল আলম, দ্য ডেইলি স্টার-এর সিনিয়র রিপোর্টার, দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ঢাকার হারিয়ে যাওয়া জলাশয় নিয়ে অনুসন্ধানী কাজ করছেন। তার দুটি গবেষণাধর্মী বই—
Oasis Lost to Urban Sprawl: An In-Depth Look into Dhaka’s Lost Ponds এবং
Dhaka’s Canals on Their Dying Breath: An In-Depth Look at How the Capital’s Waterways Are Being Choked—
আজ নগর ইতিহাস ও পরিবেশ সাংবাদিকতার গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত।
সাংবাদিকতায় আসার গল্প
হেলিমুল আলম:
খুব পরিকল্পনা করে সাংবাদিকতায় আসিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ার সময়ই এ পেশা আমার কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। ১৯৯৯ সালে শুরু, আর ২০০১ সালে দ্য নিউ নেশন পত্রিকায় যোগ দিয়ে ইংরেজি সংবাদ জগতে প্রবেশ করি। পরে The New Age পত্রিকায় কাজ করেছি, বর্তমানে The Daily Star পত্রিকায় কর্মরত আছি। সাংবাদিকতা আমাকে শিখিয়েছে- একটি সংবাদ শুধু তথ্য নয়; এটি মানুষের সচেতনতা তৈরি করে, এমনকি নীতিনির্ধারকদেরও প্রভাবিত করতে পারে। এই বিশ্বাসই আমাকে এখনো ধরে রেখেছে।
পুকুর-খালের প্রতি আগ্রহ কেন?
আলম:
আমি বড় হয়েছি মিরপুরে। শৈশবে আশপাশে ছিল অনেক পুকুর—সাঁতার কাটতাম, মাছ ধরতাম, সন্ধ্যায় আড্ডা দিতাম। এখন সেগুলোর জায়গায় ভবন আর বাজার।
এই ব্যক্তিগত স্মৃতি ও পেশাগত অভিজ্ঞতা একসঙ্গে আমাকে ভাবিয়েছে—ঢাকার জলাশয় হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু পরিবেশ নয়, আমাদের সংস্কৃতি ও টিকে থাকার ইতিহাসও হারিয়ে ফেলা।
ঢাকার জলাবদ্ধতা ও বন্যার পেছনে মূল কারণই জলাশয় ধ্বংস। তাই আমি মনে করেছি, এগুলো নথিবদ্ধ করা মানে ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক বার্তা রেখে যাওয়া।
আপনার বইগুলো নিয়ে কিছু বলুন
আলম:
আমার প্রথম বই Oasis Lost to Urban Sprawl ঢাকার হারিয়ে যাওয়া পুকুরগুলোর এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। ২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের জরিপে ৬৫টি পুকুর তালিকাভুক্ত হয়েছিল—তবে এর বাইরেও শহরে ছিল অসংখ্য জলাশয়, যেগুলোর বেশিরভাগই এখন বিলুপ্ত। আমি প্রায় ছয় মাস ধরে এই সব পুকুর সরেজমিনে ঘুরে তথ্য ও ছবি সংগ্রহ করি। ২০১৭ সালে সেই ধারাবাহিক প্রতিবেদন দ্য ডেইলি স্টার-এ প্রকাশিত হয়, এবং পরবর্তী সময়ে আরও বিস্তৃত গবেষণার ভিত্তিতে ২০২৩ সালে বইটি আগামী প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়।
সেই বছর বইটি ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি সাহিত্য পুরস্কার (মনন ও গবেষণা বিভাগ) লাভ করে। ২০২২ সালের RAJUK-এর Detailed Area Plan অনুযায়ী, RAJUK এলাকায় এখনও ৩,৪৬৪টি পুকুর রয়েছে, যার মধ্যে কেন্দ্রীয় ঢাকায় প্রায় ২০০টি। তবে এর অনেকটি বর্তমানে হুমকির মুখে।
দ্বিতীয় বই Dhaka’s Canals on Their Dying Breath ঢাকার খালসমূহ নিয়ে অনুসন্ধানী গবেষণা। এতে রয়েছে ২০১৬ ও ২০২৪ সালের দুটি ধারাবাহিক প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ, মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা।
একসময়ের প্রাণবন্ত নৌপথ আজ নর্দমায় পরিণত হয়েছে—এই পরিবর্তনের পেছনের কারণ হিসেবে সরকারি অব্যবস্থাপনা ও ভুল পরিকল্পনার চিত্রই বইটিতে তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিটি খালের সংক্ষিপ্ত বিবরণ, বর্তমান চিত্র এবং সম্ভাব্য পুনরুদ্ধারের প্রস্তাবও এতে সংযোজিত আছে।
আমার বিশ্বাস, নাগরিক সচেতনতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এখনও ঢাকার অনেক খাল ও পুকুর পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব।
ঢাকার বর্তমান বাস্তবতা কেমন দেখছেন?
আলম:
ঢাকার সবচেয়ে বড় সমস্যা নিয়ন্ত্রণহীন নগরায়ন। অধিকাংশ খাল ভরাট হয়ে গেছে, ফলে প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা অচল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাংস্কৃতিক বিস্মৃতি—একসময় খাল ছিল যাতায়াতের পথ, পুকুর ছিল সামাজিক জীবনের কেন্দ্র। এখন এগুলোকে কেবল জমি হিসেবে দেখা হয়। এই মানসিকতার পরিবর্তনই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সাংবাদিকতা ও বই লেখার মধ্যে পার্থক্য কী?
আলম:
সাংবাদিকতা আমাকে শিখিয়েছে মাঠে গিয়ে মানুষের কথা শুনতে, তথ্য যাচাই করতে ও বাস্তবতা অনুধাবন করতে। তবে সংবাদ খুব দ্রুত পুরনো হয়ে যায়। বই লেখায় আমি ধীরে ও গভীরভাবে গল্পটা বলতে পারি। সাংবাদিকতা আমাকে কাঁচামাল দেয়, বই সেই কাঁচামালকে ইতিহাসে রূপ দেয়।
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করতে গিয়ে কখনও ঝুঁকির মুখে পড়েছেন?
আলম:
অবশ্যই। সত্য তুলে ধরতে গিয়ে অনেক প্রভাবশালীর বিরাগভাজন হতে হয়েছে। একবার একটি করপোরেট গ্রুপের চেয়ারম্যান আমার বিরুদ্ধে ১০০ কোটি টাকার মানহানির মামলা করার হুমকি দিয়েছিলেন, একটি লেক দখলের খবর প্রকাশের কারণে। আমি থামিনি, প্রতিবেদনটি করেছি।
একটি বড় হাউজিং কোম্পানির এক কর্মকর্তা আমাকে হুমকি দিয়েছিলেন—‘চামড়া তুলে ফেলব’। সেই রিপোর্টও করেছি।
সাংবাদিকতার এই ঝুঁকি পেশারই অংশ। সমাজের অসঙ্গতি, দুর্নীতি ও অন্যায় তুলে ধরা, সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর পৌঁছে দেওয়া—এটাই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার লক্ষ্য।
ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জন কি?
আলম:
আমার কাছে সবচেয়ে বড় অর্জন হলো মানুষের ভালোবাসা। একবার একটি হাউজিং কোম্পানির বিরুদ্ধে প্রতিবেদন করেছিলাম, যারা কিছু পরিবারের চলাচলের পথ দেয়াল তুলে বন্ধ করে দিয়েছিল। প্রতিবেদন প্রকাশের পরদিনই কোম্পানিটি দেয়াল ভেঙে দেয়। পরে এলাকার মানুষ আমাকে লিখিত ধন্যবাদ জানান—সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, সাংবাদিকতার সার্থকতা পেয়েছি।
অবশ্য, আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিগুলোও আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। এ পর্যন্ত ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (DRU) থেকে চারবার বেস্ট রিপোর্টিং অ্যাওয়ার্ড পেয়েছি, চারটি পৃথক সিরিজ প্রতিবেদনের জন্য—এর মধ্যে একটি ছিল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক। এছাড়া ওয়াটার রিপোর্টার্স ফোরাম বাংলাদেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সামাজিক সংগঠন টাচিং সোলস ইন্টারন্যাশনাল-এর পক্ষ থেকেও একটি ফেলোশিপ পেয়েছি।
তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে আমার কাছে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অর্জন হলো DRU সাহিত্য পুরস্কার ২০২৩। আমার প্রথম বইয়ের জন্য গবেষণা বিভাগে এই পুরস্কারটি পেয়ে আমি লেখক হিসেবে নিজের অস্তিত্বের স্বীকৃতি অনুভব করেছি। এটি আমার জীবনের এক বিশেষ মাইলফলক।
তরুণ সাংবাদিকদের জন্য আপনার পরামর্শ
আলম:
ধৈর্য আর কৌতূহলই সাংবাদিকতার আসল শক্তি। এখন খবর প্রকাশের গতি দ্রুত, কিন্তু গভীর অনুসন্ধান ছাড়া সত্যিকারের সাংবাদিকতা সম্ভব নয়। মানুষের সঙ্গে সময় কাটাতে হবে, ছোট বিষয়কেও গুরুত্ব দিতে হবে। আমি যখন পুকুর-খাল নিয়ে কাজ শুরু করি, অনেকে একে তুচ্ছ ভেবেছিল। এখন সবাই বুঝছে—শহরের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এগুলোই মূল চাবিকাঠি।
জলাশয়ের সঙ্গে আপনার ব্যক্তিগত টান কতটা?
আলম:
আমার শৈশব কেটেছে জলাশয়ের পাশে। পুকুরে সাঁতার কাটা, মাছ ধরা, খালের ধারে হাঁটা—এসবই জীবনের অংশ ছিল। তাই যখন জলাশয় নিয়ে লিখি, তখন শুধু সাংবাদিক হিসেবে নয়, একজন স্মৃতিবাহী মানুষ হিসেবেও লিখি।
পাঠকের জন্য বার্তা
আলম:
জলাশয়কে আমরা কেবল অতীত নয়, ভবিষ্যতের সম্পদ হিসেবেও দেখতে শিখি। জলবায়ু পরিবর্তন, পানি সংকট ও নগরের জলাবদ্ধতা রোধে এর বিকল্প নেই। উন্নয়ন মানে কেবল ভবন বা সড়ক নয়—প্রকৃতি ও সংস্কৃতি রক্ষাও উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
“পুকুর-খাল শুধু পানি নয়—এগুলো আমাদের ইতিহাস, স্মৃতি এবং টিকে থাকার অবলম্বন।”
আজকালের খবর/