‘আসক্তি’ সবার কাছে একটি সুপরিচিত শব্দ। আসক্তি হলো কোনো কিছুর প্রতি এমন তীব্র নেশা, টান বা মোহ যা থেকে সামান্য সময়ের জন্য বিচ্যুত হলে মানসিকভাবে কেউ চরম অসুস্থতা অনুভব করে। ডিজিটাল আসক্তি বর্তমানে কিশোর-কিশোরীদের জন্য এক মারাত্মক আসক্তি, যে ব্যাপারে আমরা অনেকেই জানি না বা অহর্নিশ শুনতেও পাই না। তবে অনলাইন পদ্ধতিতে ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা শুরু হলে ডিজিটাল আসক্তির কথাটি বিভিন্ন মিডিয়ায় বেশ আলোচিত হচ্ছে, যা অভিভাবকদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ডিজিটাল আসক্তি বলতে ডিজিটাল ডিভাইসের প্রতি এমন মোহ বা টান যা ব্যবহারকারীদের মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন করে তোলে এবং অনিয়ন্ত্রিতভাবে ডিজিটাল প্রযুক্তি, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তথা ভিডিও গেম, অনলাইন বিনোদন, মোবাইল অপারেশন, ডিজিটাল গ্যাজেট এবং সোশ্যাল নেটওয়ার্ক প্ল্যাটফর্মগুলোতে নেশাগ্রস্ত করে রাখে। এককথায়, ডিজিটাল আসক্তিতে আক্রান্ত ব্যক্তি অনলাইন কার্যক্রমে এমনভাবে ঝুঁকে পড়ে যা তার দৈনন্দিন আবশ্যকীয় কর্মকাণ্ড সম্পন্ন করা থেকে বিরত রাখে এবং তার স্বাভাবিক আচার-আচরণেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ডিজিটাল আসক্তির তিনটি ধরন রয়েছে, যথা- ফোন আসক্তি, ইন্টারনেট আসক্তি এবং সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি। সব বয়সের মানুষের মধ্যে এ আসক্তি দেখা দিলেও কিশোর-কিশোরী শিক্ষার্থীরা এ আসক্তিতে বেশি আক্রান্ত। ডিজিটাল আসক্তি মানুষে মানুষে সম্পর্কের সূক্ষ্ম দিকগুলো দুর্বল করে দেয় এবং সামাজিকভাবে একে অন্যের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে।
ফেসবুকের ব্যবহার বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বড় হুমকি। ছাত্র, শিক্ষক, বৃদ্ধ, বনিতাসহ প্রায় সব শ্রেণী-পেশার মানুষ এ ফেসবুকের সঙ্গে জড়িত। যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘উই আর সোশ্যাল’ আর কানাডাভিত্তিক ডিজিটাল সেবা প্রতিষ্ঠান হুটস্যুইটের যৌথ জরিপে প্রকাশিত হয়েছে যে, সারা বিশ্বে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা বিবেচনায় ঢাকা দ্বিতীয় যার সংখ্যা ২২ মিলিয়ন বা দুই কোটি ২০ লাখ। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ব্যাংকক শহর, ৩ কোটি আর তৃতীয় স্থানে আছে ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা।
বর্তমানে শিক্ষাধারা অব্যাহত রাখতে অনলাইন শিক্ষার প্ল্যাটফর্মই একমাত্র অবলম্বন। কারণে-অকারণে শিক্ষার্থীদের অনলাইনে বসতে হয়। দীর্ঘ সময় ধরে অনলাইন শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা ক্লাসের অন্তরালে ঝুঁকে পড়ছে নানা ধরনের অপ্রাসঙ্গিক বিনোদনে যা তাদের মারাত্মকভাবে আসক্ত করে তুলছে। অনলাইন গেম ও ফেসবুক এদের মধ্যে অন্যতম। সুযোগ পেলেই শিক্ষার্থীরা ফেসবুক ও অনলাইন গেমসের দিকে ঝুঁকছেন। অনলাইনে পড়ানোর সময় ইন্টারনেটে শিক্ষকদের তেমন কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকায় শিক্ষার্থীরা ফোন গেমিংয়ে জড়িয়ে পড়ে, ইউটিউবে অশ্লীল ছবি ও গানের প্রতি তাদের আসক্তি বাড়ে এবং কখনো কখনো ফেসবুক চ্যাটিং-এ যুক্ত হয়ে যায়।
এখন, শিক্ষার্থীরা বিনোদনের জন্য অনলাইন গেমস, পাবজি এবং ফ্রি ফায়ার বেছে নেয়। ঘরের এক কোণে বসে মাতাল হয়ে অনলাইনে ভিডিও গেম খেলছে। তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রিনের চার কোণে তাদের সময় পার করছে। শিশু এবং কিশোর-কিশোরীদের জন্য সর্বাধিক জনপ্রিয় অনলাইন ভিডিও গেমগুলো হলো পাবজি এবং ফ্রি ফায়ার, যা আজকাল অত্যধিক খেলতে দেখা যায়। প্লেয়ার অজানা ব্যাটেল গ্রাউন্ড (পিইউবিজি), দক্ষিণ কোরিয়ার সংস্থা ব্লু-হোয়েল সহযোগী প্রতিষ্ঠান দ্বারা বিকশিত একটি খেলা পাপজি এবং ফ্রি ফায়ারের মতো অনলাইন গেমের শিশু এবং কিশোর-কিশোরীদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
বিশ্ব পরিসংখ্যানগুলোতে দেখা যায় শিক্ষার্থীরা এ দুটি গেম সবচেয়ে বেশি খেলছে। একাধিক সমীক্ষা অনুসারে, বর্তমানে বিশ্বের ৮৭ কোটি ছেলেমেয়ে প্রতিদিন পাবজি এবং ফ্রি ফায়ার খেলছে। গুগল প্লে স্টোর থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০ কোটি ডাউনলোড করা হচ্ছে। অন্য একটি অনলাইন সমীক্ষা বলছে যে বাংলাদেশে প্রতিদিন এক কোটিরও বেশি এ গেম খেলা হচ্ছে। অন্যদিকে, বিশ্বের প্রায় ৫০ কোটি মানুষ প্রতিদিন ফ্রি ফায়ার গেমটি খেলছে। বাংলাদেশে প্রায় ৭ মিলিয়ন মানুষ খেলছে। অন্য একটি জরিপে দেখা গেছে যে কিশোর এবং তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের আট দশমিক ছয় শতাংশ ইন্টারনেট গেমিংয়ে আসক্ত। এর মধ্যে চার দশমিক আট শতাংশ কিশোর এবং এক দশমিক তিন শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক।
এই ধরনের গেমগুলোর ভয়াবহতা বিবেচনা করে, ভারত, নেপাল, জাপান, ইরান এবং আরো অনেক দেশের মতো প্রতিবেশী দেশগুলো পাবজি এবং ফ্রি ফায়ার গেমগুলোকে নিষিদ্ধ করেছে। দুঃখের বিষয়, বাংলাদেশে এ নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হলেও অদৃশ্য কারণে এটি থামানো যায়নি। তরুণ প্রজন্মকে যদি আসক্তি থেকে মুক্তি দেওয়া না যায়, তবে তাদের একটি ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।
বাচ্চাদের এ জাতীয় আসক্তি থেকে বাঁচাতে অভিভাবকদের আরো সচেতন হওয়া দরকার। আমাদের অনলাইন বিশ্বে শিক্ষার্থীদের জন্য মানবিক ও স্বাস্থ্যকর বিনোদন নিশ্চিত করতে হবে, তাদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে এবং তাদের ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষায় জড়িত হতে উৎসাহিত করতে হবে, ফেসবুকের ভালো ও শিক্ষণীয় স্টোরিজগুলো ব্যবহারে নির্দিষ্ট পদ্ধতি বের করতে হবে। সরকার ইন্টারনেটভিত্তিক এ জাতীয় বিনোদন ব্যবহারে কঠোর আইনি বিধিনিষেধ জারি করতে পারেন, এমনকি বিটিআরসি নেট গতি দুর্বল করে তাদের এ জাতীয় গেম খেলতে নিরুৎসাহিত করতে পারে। আমাদের শিক্ষার্থীদের সামাজিক সুরক্ষা নীতি বজায় রেখে খেলার মাঠে যেতে এবং খেলার ব্যবস্থা করতে দেওয়া উচিত। তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে নিয়ে যেতে এবং বিশ্বে তাদের সাফল্যের শিখরে পৌঁছানোর জন্য, মাদকের আসক্তিকে আমরা ‘না’ বলার সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল আসক্তিকে আমাদের ‘না’ বলতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, এখন ক্ষতটি ছোট, এটি ওষুধ দিয়ে নিরাময় করা যাবে, তবে ক্ষতটি বড় হয়ে গেলে তা নিরাময় করা কঠিন হবে। সুতরাং আসুন আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমাদের তরুণ প্রজন্ম শিক্ষার্থীদের আলোর পথে ফিরিয়ে আনি এবং অনলাইনভিত্তিক সব গেম ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করি। শিক্ষক, বাবা-মা এবং আপামর জনসাধারণ সবাই যদি নৈতিক দায়িত্ব নিয়ে কাজ করে তবে আমাদের শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল আসক্তি থেকে মুক্ত করা সম্ভব হবে।
লেখক : শিক্ষক, লেখক ও কলামিস্ট।
আজকালের খবর/আরইউ