আমরা বিজয়ের আনন্দোল্লাসে প্রায় ভুলতেই বসেছি— এই বিজয়ের অন্তরালে কত ভাই-বোনের রক্ত মিশ্রিত আছে। আজও রায়ের বাজারের বধ্যভূমিতে নৃশংসতার চিহ্ন বিদ্যমান— যেখানে অদ্যাবধি অনেকের পরিচয়ও মেলেনি। এই কথা ভাবতেই হৃদয় বেদনার্ত হয়ে ওঠে— অশ্রু জমে চোখের কোণে। ডিসেম্বর মাস আসলেই যেন আমরা একটু নড়েচরে বসি— বেশি বেশি মনে করতে থাকি আমাদের বীর সন্তানদের যাদের জীবনের বিনিময়ে এই স্বাধীন সার্বভৌমত্ত্ব অর্জিত হয়েছে। স্বাধীনতা যুদ্ধ আমাদের পূর্ব-পরিকল্পনার কোনো বিষয় না, এটি আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তার প্রমাণ মেলে পাকিস্তানি বাহিনী প্রথম থেকেই এদেশের নিরিহ বাঙালির ওপর নির্বিচারে গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। যে কারণে বলা যেতে পারে এদেশের সাধারণ মানুষকে তারা এক ধরণের বাধ্যই করেছিল এই প্রতিরোধ যুদ্ধ গড়ে তুলতে। বাদ যায়নি ঝিনাইদহ— এ সময় নিরস্ত্র ঝিনাইদহের মানুষও তাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিল। তারা শত্রুর অস্ত্রের সামনে বুক পেতে দিতেও দ্বিধা করেননি। প্রতিটি মানুষের এই দুর্বার প্রতিবাদই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অতি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। আমরা শুধুমাত্র বুদ্ধিজীবী বলতেই মনে করে থাকি— মুনীর চৌধুরী, শহীদুল্লা কায়সার, আনোয়ার পাশা, ডাক্তার ফসলে রাব্বী, মোফাজ্জল হায়দার চেীধুরী, গোবিন্দ চন্দ্র দেব, অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা-এই বুদ্ধিজীবীদের নাম। কেন না এদের নামই বার বার আমাদের সামনে এসে কিন্তু আমরা জানি এদের বাইরেও প্রান্তিক জেলা শহর-উপজেলা-গ্রাম পর্যায়েও হত্যা করা হয়েছে অনেক বুদ্ধিজীবীকে। যাদের নাম আমরা কেউই জানি না। তেমনি কয়েকজন প্রান্তিক বুদ্ধিজীবীর কথা বলার চেষ্টা করেছি আমার এই ক্ষুদ্রকায় লেখায়। শত্রুবাহিনী ঝিনাইদহে প্রবেশ করে (১৬ এপ্রিল, ১৯৭১) নির্বিচারে এখানে গণহত্যা চালায়। শত্রুবাহিনি ও তাদের দোসরদের কবল থেকে নিরীহ বুদ্ধিজীবীরাও রেহাই পাননি। সেসময় শত্রুরা ঝিনাইদহের ১১ জন বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেছিল। নিম্নে তাদের নাম ও পিতার নামসহ ঠিকানা দেওয়া হলো- গোলাম মহিউদ্দিন আহমেদ, বদরউদ্দিন আহমেদ (পিতা), ভায়না, হরিণাকুণ্ডু। আনছার উদ্দিন, হাজী সবুর আলী (পিতা), ভুটিয়ারগাতি, ঝিনাইদহ। মো. মুনসুর আলী মল্লিক, আহাম্মদ আলী মল্লিক (পিতা), পার্বতীপুর, হরিণাকুণ্ডু। শহীদ শেখ হাবিবুর রহমান, শেখ আবদুল খালেক (পিতা), ঝিনাইদহ পৌরসভা। মায়ামায় ব্যানার্জী, দীনেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী (পিতা), খড়িখালী, ঝিনাইদহ। ডা. মনোরঞ্জন, ব্রজলাল জোয়ার্দার (পিতা), শৈলকূপা, ঝিনাইদহ। মো. শামসুদ্দোহা, মো. ওমর আলী (পিতা), কালিগঞ্জ। নূর আলী মিয়া, পিতা অজ্ঞাত, ফয়ন, ঝিনাইদহ। খো. মো. এলাহি বকস, আতস আলী খোন্দকার (পিতা), ভাদড়া, হরিণাকুণ্ডু। মো. রুস্তম আলী, মো. ওমর আলী (পিতা), কালিগঞ্জ এবং লতাফত হোসেন জোয়ার্দার, খেলাফত হোসেন জোয়ার্দার (পিতা), দক্ষিণ কাষ্টমাগরা, ঝিনাইদহ।
তিনজন বুদ্ধিজীবীর জীবনী নিম্নে আলোকপাত করা হল—
মায়াময় ব্যানার্জী : শহীদ মায়াময় ব্যানার্জীর জন্ম ১৯১৮ সালে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার খড়িখালী গ্রামে। বাবা দীনেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী। এন্ট্রাস পাস মায়াময় ব্যানার্জী ‘ব্যাকরণ কাব্যতীর্থ’ উপাধি লাভ করেছিলেন। এলাকার রামনগর কে বি বি এল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বাংলার শিক্ষক ছিলেন তিনি। তার আট সন্তানের মধ্যে এখন ছয়জন জীবিত রয়েছেন। বাংলা একাডেমি ও আগামী প্রকাশনীর শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষগ্রন্থে মায়াময় ব্যানার্জীর সংক্ষিপ্ত জীবনী রয়েছে। শিক্ষকতার পাশাপাশি অনেক সমাজকল্যাণমূলক কাজে যুক্ত ছিলেন। সাহিত্যচর্চা করতেন। গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ লিখতেন। মায়াময় ব্যানার্জীর ছেলে প্রণব জানান— মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি দশম শ্রেণিতে পড়তেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ১ এপ্রিল যশোর সেনানিবাস থেকে একদল পাকিস্তানি সেনা ঝিনাইদহের বিষয়খালী এলাকায় আসে। তারা ঝিনাইদহ শহর দখল করবে, এমন খবর পেয়ে মুক্তিপাগল জনতা তাদের প্রতিরোধ করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তার বাবাও হানাদারদের প্রতিরোধ করতে এগিয়ে যান। সবার প্রতিরোধের মুখে পাকিস্তানিরা একটা সময় ফিরে যেতে বাধ্য হয়। তবে সেই সম্মুখযুদ্ধে ২৬ জন শহীদ হন। তার বাবাকে হানাদাররা বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। ঝিনাইদ-যশোর সড়কের খড়িখালী এলাকায় শহীদের লাশগুলো পড়ে ছিল। পরদিন স্থানীয় লোকজন সেখানেই তাদের গণকবর দেন। ফিরে যাওয়ার সময় হানাদাররা অনেক বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। সেদিন যারা শহীদ হয়েছিলেন তাঁদের স্মরণে বিষয়খালী বাজারে একটি স্মারক ভাস্কর্য তৈরি করা হয়েছে। সেখানে ওই ২৬ শহীদের মধ্যে তার বাবার নামও রয়েছে।
ডা. মনোরঞ্জন জোয়ার্দ্দার : শহীদ মনোরঞ্জন জোয়ার্দ্দারের জন্ম ১৯০৭ সালে ঝিনাইদহের শৈলকুপা শহরের সরকারপাড়ায়। তিনি ব্রজলাল জোয়ার্দ্দারের একমাত্র ছেলে। মনোরঞ্জন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পাস করে চিকিৎসক হতে ভারতে চলে যান। সাধারণ মানুষকে সেবা করবেন বলে এলএমএফ পাস করেই ফিরে আসেন নিজ গ্রামে। এসময় তিনি শৈলকুপার মাঝপাড়াতে সাহা ফার্মেসিতে বসে রোগী দেখতেন। তিনি স্বদেশি আন্দোলনের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন বলে জানা যায়। আর এই স্বদেশী কবিতা লেখার কারণে দুই মাস জেলও খাটেন তিনি।
চিকিৎসক মনোরঞ্জন জোয়ার্দ্দার যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা করতেন। পাশাপাশি নিজ বাড়িতে নিয়মিত সাহিত্যের আসর বসাতেন। লেখালেখিও করতেন। কুখ্যাত রাজাকার নওশেরের দলবল তাকে একাত্তরের ২৮ অক্টোবর বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় এবং রাতে মনোরঞ্জনের গলায় সিমেন্টের বস্তা আর পায়ে ইট বেঁধে কবিরপুর সেতুর ওপর থেকে কুমার নদে ফেলে দেয়। বর্তমানে তার সম্পর্কে বিস্তৃত তথ্য জানা না গেলেও সংক্ষিপ্ত জীবনী রয়েছে বাংলা একাডেমির শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষ গ্রন্থে।
লতাফত হোসেন জোয়ার্দার : লতাফত হোসেন জোয়ার্দ্দারের বাড়ি ঝিনাইদহ জেলায়। ঝিনাইদহের কেসি কলেজে স্নাতক পর্ব শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করতে আসা লতাফত ছিলেন রাজনৈতিকভাবে ভীষণ সচেতন। কেসি কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি থাকাকালীন তৎকালীন হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে কারাবরণও করতে হয়েছিল তাকে।
১৯৭১ সালে তিনি চুয়াডাঙ্গার দর্শনা কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধুর ডাকে গড়ে ওঠা সংগ্রাম কমিটির স্থানীয় সভাপতি ছিলেন। ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। যুদ্ধের বিভীষিকাময় সময়ে সীমান্তের ওপারে ভারতে গিয়ে নিরাপদে থাকার সুযোগ থাকলেও, তিনি মাতৃভূমি ছাড়েননি। সাহস যুগিয়েছেন নিজের কলেজের ছাত্র ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার পর আর খোঁজ মেলেনি তার। ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে শহীদ বুদ্ধিজীবীর স্বীকৃতি দেয়। লতাফত হোসেন জোয়ার্দ্দারে স্ত্রী এক সাক্ষাৎকারে জানান— ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলার দর্শনা কলেজে দুটি পদ ফাঁকা হলে সেখানে চাকরি নিয়ে চলে আসি আমরা। ওই কলেজের প্রিন্সিপালের কোয়ার্টারেও উঠে পড়ি। ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশজুড়ে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলার আহ্বান জানালে তাতে সাড়া দেন দর্শনা কলেজের প্রিন্সিপাল লতাফত হোসেন জোয়ার্দ্দার। দর্শনায় ফিরে তিনি আবার আওয়ামী লীগের পলিটিক্স শুরু করলেন। স্থানীয় সংগ্রাম কমিটির সভাপতি হলেন। সারাদেশ তখন উত্তাল। মুক্তিযোদ্ধার তখন আসতো আমাদের বাসায়। আমি খাবার-টাবার দিতাম উনাদের। আমার স্বামীর সঙ্গে নানা বিষয়ে তারা কথা বলতো, তবে আমার সামনে কিছু বলতো না। যুদ্ধের সময় ঝিনাইদহ থেকে দর্শনা আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকতেন অধ্যক্ষ লতাফত হোসেন জোয়ার্দ্দার। ১৯৭১ সালের ৩১ জুলাই, শনিবার স্ত্রী হোসনে আরার সঙ্গে নিজ বাড়িতে দুপুরের খাবার সারেন। এরপর যাত্রা করেন দর্শনায় তার কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে। সঙ্গে নিয়ে যান নিজের স্কুলপড়ুয়া শ্যালক আলমগীর হোসেনকে। আলমগীর হোসেন এক সাক্ষাৎকারে বলেন— ওইদিন বিকেলে দর্শনা কলেজের দুজন শিক্ষকের সঙ্গে তিনি অনেককিছু নিয়ে আলাপ করলেন। পরের দিন সকালে তারা দর্শনা ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। তখনই চান্দু নামে তার কলেজের এক ছাত্র আসলো। চান্দু শান্তি কমিটির লোক (রাজাকার) ছিলো। সে বললো— ‘স্যার আপনাকে মেজর সাহেব ডেকে পাঠিয়েছেন। দুলাভাই তখন বললেন— ‘আচ্ছা আমি খেয়ে নেই, তারপর বের হচ্ছি’। কিন্তু চান্দু জোরাজুরি করায় তিনি খেতে পারেননি, অভুক্ত মানুষটাকে নিয়েই বের হয়ে গেল।’ প্রাণ বাঁচাতে ছোট্ট আলমগীরকে নিয়ে তখন দর্শনা কলেজের ওই দুই শিক্ষক বাসা থেকে বেরিয়ে পড়েন। বহুদূর হেঁটে, মিলিটারির চেকপোস্ট পেরিয়ে ঝিনাইদহ এসে বোন হোসনে আরাকে তিনি খবর দেন, মিলিটারিরা তার দুলাভাই অর্থাৎ দর্শনা কলেজের অধ্যক্ষ লতাফত হোসেন জোয়ার্দ্দারকে ধরে নিয়ে গেছে। এরপর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি তার।
এই বীরদের শুধু গ্রন্থের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না— তাদের হৃদয়ে স্থান দিতে হবে তবেই না তাদের প্রতি আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধা দেখানো হবে— তা না হলে শুধু মাত্র একটা দিনকে উপলক্ষ করে তাদের শ্রদ্ধা দেখানোর নামে তাদের সাথে মস্করা করা ছাড়া আর কিছুই করা হবে না। প্রতিটি প্রান্তিক অঞ্চল থেকে গবেষণার মাধ্যমে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের তথ্য সঠিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে— এখনও অনেক বুদ্ধিজীবী আছেন যাদের খবর আমরা কেউই জানিও না। কোনো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আটকে না থেকে— সব সময়ই এই বুদ্ধিজীবীদের দিয়ে পত্র-পত্রিকায় বিস্তৃত লেখালেখি করতে হবে এবং রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে তাদের পরিবারের খোঁজ-খবর রাখতে হবে এবং তাদের ভূমিকার কথা বারবার তরুণ সমাজের সামনে তুলে ধরতে হবে। তবেই না তাদের প্রতি সত্যিকার ভালোবাসা প্রদর্শিত হবে— এই হোক এবারের ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী দিবসে আমাদের প্রতিজ্ঞা।
বঙ্গ রাখাল : কবি।
আজকালের খবর/আরইউ