দেশে যত্রতত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা আর এত সহজ থাকছে না। সরকারের কঠোর নীতিমালায় ব্যাঙের ছাতার মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলায় লাগাম দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
দেশের ‘শিক্ষার মানচিত্র’ অনুযায়ী প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (স্কুল-কলেজ) সংখ্যা অনেক বেশি। প্রয়োজন না থাকলেও প্রভাবশালীদের তদবিরে ও রাজনৈতিক বিবেচনায় যেখানে সেখানে গড়ে উঠেছে স্কুল-কলেজ। বর্তমানে দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু এরমধ্যে এমপিওভুক্ত (মান্থলি পেমেন্ট ওয়ার্ডার) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন দেয় সরকার। চাহিদা যাচাই না করে অপ্রয়োজনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুমতি দেওয়ায় শিক্ষা খাতে বরাদ্দের বিশাল অংক ব্যয় হচ্ছে এমপিও খাতে। আর নতুন প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন নিয়েই চাপ দেওয়া হয় এমপিও করতে। এ চাপ কমাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপন, চালুকরণ ও স্বীকৃতি প্রদানে নীতিমালা কঠোর করতে আট সদস্যের একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি করে দিয়েছে। এই কমিটি কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করে অনুমোদনের সুপারিশকরবে। তার ভিত্তিতেই কেবল অনুমোদন মিলবে।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বর্তমান নীতিমালা পর্যালোচনা, পরিমার্জন ও সংশোধন করে ‘বেসরকারি উদ্যোগে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের প্রশাসনিক আওতাধীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (স্কুল, স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও কলেজ) স্থাপন, চালুকরণ ও স্বীকৃতি প্রদানের ক্ষেত্রে অনুসরণীয় নীতিমালা (সংশোধন) ২০২১’ এর খসড়া দাখিল করবে। কমিটি প্রয়োজনে অন্যান্য সদস্য কো-অপ্ট রকতে পারবে।
মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (মাধ্যমিক-২) কে কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। সদস্য করা হয়েছে উপসচিব (কলেজ-৬), উপসচিব বেসরকারি মাধ্যমিক-১), পরিচালক (ব্যানবেইস), মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) পরিচালক (কলেজ), মাউশি পরিচালক (মাধ্যমিক), ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের কলেজ পরিদর্শক। কমিটির সদস্য সচিব করা হয়েছে ঢাকা বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শককে।
এ ব্যাপারে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (মাধ্যমিক-২) ও নীতিমালা তৈরি কমিটির আহ্বায়ক মোমিনুল রশিদ আমিন বলেন, বর্তমান যে নীতিমালাটি আছে সেটি ১৯৯৭ সালের। ফলে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের স্বীকৃতি দিতে গিয়ে নানা জটিলতায় পড়তে হচ্ছে। এতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় নীতিমালাটি যুগপোযুগী করার প্রয়োজন মনে করেছে। তাই নীতিমালাটি যুগপোযুগী করার জন্য একটি কমিটি করা হয়েছে। কমিটি শিগিগিরই বৈঠকে বসবে। দ্রুত সময়ের মধ্যে নীতিমালার খসড়া তৈরি করে জমা দেওয়া হবে। তিনি আরো বলেন, এমপিও দেওয়ার সঙ্গে যেহেতু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্থাপন, চালুকরন ও স্বীকৃতির বিষয়টি সরাসরি জড়িত তাই এটা সংশোধন ও যুগপোযুগী করা জরুরি। তাই এমপিও নীতিমালা জারির আগেই এই নীতিমালার কাজ শেষ করতে চাই।
১৯৯৭ সালের বেসরকারি উদ্যেগে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও স্বীকৃতি নীতিমালা অনুযায়ী, প্রতি ১০ হাজার জনসংখ্যার জন্য একটি নিম্ম মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা যাবে। শহরের ক্ষেত্রে একটি স্কুল থেকে আরেক স্কুলের দূরত্ব এক কিলোমিটার ও মফস্বলে তিন কিলোমিটার হতে হবে। মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপনের ক্ষেত্রে যথাক্রমে এক কিলোমিটার ও চার কিলোমিটার। উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ স্থাপনের ক্ষেত্রে জনসংখ্যা কমপক্ষে ৭৫ হাজার হতে হবে। আর দূরত্বের ক্ষেত্রে শহরে দুই কিলোমিটার ও মফস্বলের ক্ষেত্রে ছয় কিলোমিটার। সূত্র জানিয়েছে, নতুন নীতিমালায় জমির পরিমাণ নির্ধারণ করে দেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পুরনো এই নীতিমালা অনুযায়ী প্রাপ্যতা না থাকা সত্ত্বেও সারা দেশে অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। তারই একটি পঞ্চগড়ের দেবিগঞ্জ উপজেলার হাজিরহাট নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়। হাজিরজহাট নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের রাস্তার ওপর পাশে অনেক আগে স্থাপিত হয়েছে শেখ রাসেল নিম্ম মাধ্যমিক বিদ্যালয়। দুই বছর আগে স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধি হাজিরহাট নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি অনুমতির জন্য চাপ দেন। কিন্তু শিক্ষামন্ত্রণালয় চাপের মধ্যেও পাঠদানের অনুমতি দেয়নি। কিন্তু পরবর্তিতে ওই জনপ্রতিনিধি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসলে ফের চাপ দিয়ে স্কুলটির অনুমোদন করিয়ে নিয়েছেন। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, হাজিরহাট স্কুলের অনুমোদনের কারণে উভয় প্রতিষ্ঠানই শিক্ষার্থী সংকটে পড়বে।
অপরদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মানচিত্র’ অনুযায়ী রাজশাহী বিভাগে নতুন কোনো কলেজের প্রয়োজন না থাকলেও গত দুই বছরে বেশ কিছু কলেজ অনুমোদন দিয়েছে। কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রী ও এমপির চাপে অনুমোদন দিতে বাধ্য করা হয়েছে বলে মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে।
সূত্র জানিয়েছে, বিগত দিনে স্কুল-কলেজের অনুমতির চিঠি মন্ত্রালয়ের ওয়েব সাইটে দেওয়া হলেও সম্প্রতি তা দেওয়া হচ্ছে না। মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অগোচরে এক শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী অর্থের বিনিময়ে গোপনে অনুমোদন করিয়ে দিচ্ছেন। কৌশলগত কারণে তা ওয়েব সাইটে দেওয়া হচ্ছে না।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যানরা জানিয়েছেন, বিগত দিনে রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন দেওয়া স্কুল-কলেজের বেশিরভাগই মানসম্পন্ন শিক্ষা দিতে পারছে না। পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল ও ভর্তির তথ্যে সে চিত্র স্পষ্ট। অনলাইনে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি কার্যক্রম শুরু হওয়ার পরে বেড়িয়ে আসছে রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন দেওয়া কলেজগুলোর চিত্র। নতুন কলেজে শিক্ষার পরিবেশ না থাকায় শিক্ষার্থীরাও ভর্তি হতে চাইছে না। কলেজগুলো তাই শিক্ষার্থী সংকটে ধুঁকছে। একাদশ শ্রেণিতে প্রতি বছরই লাখ লাখ আসন খালি থাকছে। ২০১৬ সালে শিক্ষার্থী ভর্তি না হওয়ায় বোর্ডগুলো ১৪৩টি কলেজের পাঠদান বন্ধ করেছে। এনএমএস।