দেশের জরুরি চিকিৎসাসেবা নিরবচ্ছিন্ন, নিরাপদ ও কার্যকর রাখতে অ্যাম্বুলেন্স খাতের দীর্ঘদিনের বিভিন্ন সমস্যার দ্রুত সমাধানে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছে বাংলাদেশ অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতি। শনিবার (২৫ জুলাই ২০২৬) রাজধানীর রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সমিতির নেতৃবৃন্দ বলেন, অ্যাম্বুলেন্স কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক যানবাহন নয়; এটি মানুষের জীবন রক্ষায় নিয়োজিত একটি জরুরি জনকল্যাণমূলক বিশেষায়িত বাণিজ্যিক পরিবহন।
প্রতিদিন অসংখ্য রোগী, দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তি, প্রসূতি মা এবং সংকটাপন্ন মানুষকে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স দেশের স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। অথচ দীর্ঘদিন ধরে নিবন্ধন জটিলতা, করসংক্রান্ত বৈষম্য, প্রশাসনিক হয়রানি, মামলা, জরিমানা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং জাতীয় নীতিমালার অভাবে এ খাত চরম সংকটের মুখে রয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, একটি অ্যাম্বুলেন্সের প্রতিটি মুহূর্ত একটি মানুষের জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই অ্যাম্বুলেন্স সেবাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত, প্রশাসনিক ও নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
সংবাদ সম্মেলনে সরকারের কাছে ৯ দফা দাবি উপস্থাপন করা হয়:১. অ্যাম্বুলেন্সকে সাধারণ বাণিজ্যিক পরিবহন নয়, বরং জরুরি জনকল্যাণমূলক বিশেষায়িত বাণিজ্যিক পরিবহন হিসেবে আইনগত স্বীকৃতি প্রদান এবং সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইন ও বিধিমালা প্রণয়ন।
২. বর্তমানে অ্যাম্বুলেন্সের জন্য প্রচলিত ৫২ টাকা অগ্রিম আয়কর (AIT) দেশের সকল অ্যাম্বুলেন্সের ক্ষেত্রে সমভাবে ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা এবং এ সংক্রান্ত বিদ্যমান বৈষম্য দূর করা।
৩. অ্যাম্বুলেন্স নিবন্ধন, কর, ফিটনেস, পরিচালনা ও সেবার মান নিশ্চিত করতে জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স নীতিমালা দ্রুত চূড়ান্ত ও বাস্তবায়ন করা।
৪. জাতীয় নীতিমালা কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের বিরুদ্ধে এ সংক্রান্ত মামলা, জরিমানা ও হয়রানিমূলক প্রশাসনিক কার্যক্রম স্থগিত রাখা।
৫. অ্যাম্বুলেন্স পরিচালনার ক্ষেত্রে বিদ্যমান অযৌক্তিক কর, প্রশাসনিক জটিলতা ও বৈষম্যমূলক বিধান পুনর্বিবেচনা করে একটি বাস্তবসম্মত ও জনবান্ধব ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
৬. দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ সর্বত্র নিরবচ্ছিন্ন জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অ্যাম্বুলেন্স পরিচালনায় প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা, প্রণোদনা ও বিশেষ সুবিধা প্রদান করা।
৭. লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সের ক্ষেত্রে দেশের সকল সেতু ও টানেলে টোল সম্পূর্ণ মওকুফ করা।
৮. জরুরি চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রাখতে দেশব্যাপী অ্যাম্বুলেন্সের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা।
৯. দেশের সকল সরকারি হাসপাতাল ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে জরুরি চিকিৎসাসেবা নির্বিঘ্ন রাখতে অ্যাম্বুলেন্সের জন্য পৃথক, নির্ধারিত ও স্থায়ী পার্কিং সুবিধা নিশ্চিত করা।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা আরও বলেন, একজন রোগীর কাছে অ্যাম্বুলেন্সের মালিকানা গুরুত্বপূর্ণ নয়; গুরুত্বপূর্ণ হলো সময়মতো জীবনরক্ষাকারী সেবা নিশ্চিত করা। তাই সরকারি, বেসরকারি, হাসপাতালভিত্তিক ও জনকল্যাণমূলক সকল অ্যাম্বুলেন্সের জন্য একটি অভিন্ন, বাস্তবসম্মত ও কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, সরকারের মানবিক ও জনকল্যাণমুখী উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় অ্যাম্বুলেন্স খাতের বিদ্যমান সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান হবে।
সংবাদ সম্মেলনের শেষে বাংলাদেশ অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. বাদল হোসেন মাতবর সরকারের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, আগামী তিন দিনের মধ্যে উত্থাপিত দাবিগুলো বাস্তবায়নের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে আগামী বুধবার সকাল ৬টা থেকে সারা দেশে কোনো অ্যাম্বুলেন্স চলাচল করবে না। দাবি আদায়ে দেশব্যাপী অ্যাম্বুলেন্স পরিচালনা বন্ধ রেখে কঠোর কর্মসূচি পালন করা হবে।
এ সময় বাংলাদেশ অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি মো. দবির হোসেনসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন জেলার অ্যাম্বুলেন্স মালিক, চালক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
আজকালের খবর/কাওছার আল হাবীব