একটি সময় ছিল, যখন সন্তান জন্মদান ছিল একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। জটিলতা দেখা দিলে অস্ত্রোপচার ছিল চিকিৎসাবিজ্ঞানের আশীর্বাদ। কিন্তু আজ সেই ব্যতিক্রমই যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। দেশে সিজারিয়ান প্রসবের হার এমনভাবে বেড়েছে, যেন প্রতিটি গর্ভধারণই একটি অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায়। এটি শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রশ্ন নয়; এটি নৈতিকতা, জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং মানবিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নও।
সম্প্রতি সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রতিটি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে স্বাভাবিক প্রসবের (নরমাল ডেলিভারি) জন্য লেবার ইউনিট বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমি আল-রাফি হাসপাতালের চেয়ারম্যান হিসেবে এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। তবে প্রশ্ন হচ্ছে এতদিন কেন এ সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করতে হলো? বহু বছর ধরেই বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে আসছিলেন যে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। অথচ কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, পর্যবেক্ষণ এবং জবাবদিহির ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
সব দোষ চিকিৎসকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়াও সঠিক হবে না। অনেক বেসরকারি হাসপাতাল ব্যবসায়িক চিন্তা থেকে সিজারিয়ানকে সহজ পথ হিসেবে বেছে নিয়েছে। কিছু চিকিৎসক সময় ব্যবস্থাপনা ও ঝুঁকি এড়ানোর কারণে অস্ত্রোপচারকে অগ্রাধিকার দেন। আবার অনেক পরিবারও ব্যথার ভয়, নির্দিষ্ট তারিখে সন্তান জন্মের ইচ্ছা কিংবা ভুল ধারণার কারণে স্বাভাবিক প্রসবের পরিবর্তে সিজারিয়ানকে বেছে নেয়। ফলে এই সংকটের দায় একক কারও নয়; এটি একটি সম্মিলিত ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।
সিজারিয়ানের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি: চিকিৎসাবিজ্ঞানের নয়, স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংকট বটে! সিজারিয়ান প্রসব চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। অসংখ্য মা ও নবজাতকের জীবন রক্ষায় এর অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু জীবন রক্ষার এই পদ্ধতি যখন অপ্রয়োজনীয়ভাবে ব্যবহার হতে শুরু করে, তখন সেটি আশীর্বাদ থেকে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশে গত এক দশকে সিজারিয়ানের হার যে গতিতে বেড়েছে, তা স্বাভাবিক নয়। এটি কোনো মহামারির মতো হঠাৎ ঘটেনি; বরং ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা একটি বাণিজ্যিক ও সামাজিক প্রবণতার ফল। চিকিৎসার প্রয়োজন ছাড়াই অস্ত্রোপচারকে সহজ সমাধান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এতে একদিকে মায়ের শরীরে অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবারের ওপর বাড়ছে আর্থিক চাপ। স্বাস্থ্যসেবা তখনই মানবিক থাকে, যখন চিকিৎসা নির্ধারিত হয় রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী; আর্থিক লাভ বা সুবিধা অনুযায়ী নয়। তাই সিজারিয়ানের অস্বাভাবিক বৃদ্ধিকে শুধু একটি চিকিৎসা-পরিসংখ্যান হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি স্বাস্থ্যব্যবস্থার নৈতিক সংকটেরও প্রতিফলন। তবে লেবার ইউনিট বাধ্যতামূলকহচ্ছে তার দেরিতে হলেও একটি সঠিক সিদ্ধান্ত। প্রতিটি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে স্বাভাবিক প্রসবের জন্য লেবার ইউনিট বাধ্যতামূলক করার সরকারি সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। এটি বহুদিনের দাবি ছিল। আমিও জাতীয় দৈনিকে আমার কলামে এমন দাবি তুলেছি বারবার।কারণ যেখানে স্বাভাবিক প্রসবের জন্য পর্যাপ্ত অবকাঠামোই নেই, সেখানে রোগী ও চিকিৎসকের সামনে সিজারিয়ানই একমাত্র বাস্তব বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়। তবে কেবল নির্দেশ জারি করলেই হবে না। প্রতিটি লেবার ইউনিটে দক্ষ ধাত্রী, প্রশিক্ষিত নার্স, জরুরি সেবা, পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি এবং ২৪ ঘণ্টা কার্যকর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় এটি কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে। সরকার যদি সত্যিই মাতৃস্বাস্থ্য উন্নত করতে চায়, তবে নিয়মিত পরিদর্শন, মান নিয়ন্ত্রণ এবং লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আইন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত হয়।
প্রশ্ন বারবার ঘুরেফিরে আসে হাসপাতাল কি সেবাকেন্দ্র, নাকি মুনাফার প্রতিষ্ঠান? বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু স্বাস্থ্যসেবা যখন অতিরিক্ত মুনাফার প্রতিযোগিতায় পড়ে, তখন রোগীর স্বার্থই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে অভিযোগ রয়েছে, তার বড় অংশই এই বাণিজ্যিক মানসিকতার সঙ্গে সম্পর্কিত। স্বাভাবিক প্রসবের জন্য সময়, ধৈর্য এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। অন্যদিকে সিজারিয়ান নির্দিষ্ট সময়ে পরিকল্পনা করা যায়, দ্রুত সম্পন্ন করা যায় এবং আর্থিকভাবে অনেক ক্ষেত্রেই বেশি লাভজনক। এই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
একজন চিকিৎসকের প্রথম পরিচয় ব্যবসায়ী নয়; তিনি একজন মানবিক পেশাজীবী। হাসপাতালেরও প্রথম পরিচয় হওয়া উচিত সেবাকেন্দ্র হিসেবে। তাই চিকিৎসা সিদ্ধান্তের ভিত্তি হবে রোগীর চিকিৎসাগত প্রয়োজন, আর্থিক হিসাব নয় এই নৈতিক অবস্থান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি। শুধু চিকিৎসক কিংবা হাসপাতাল নয়, রোগীর পরিবারও দায় এড়াতে পারে না। অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ানের জন্য সব দোষ চিকিৎসক বা হাসপাতালের ওপর চাপানো সহজ, কিন্তু তা পুরো সত্য নয়। সমাজেও এ নিয়ে নানা ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে। অনেক পরিবার মনে করে নির্দিষ্ট দিন-তারিখে সন্তান জন্ম দেওয়া সুবিধাজনক। কেউ আবার প্রসববেদনার ভয়ে স্বাভাবিক প্রসব এড়িয়ে যেতে চান। অনেকেই মনে করেন সিজারিয়ান মানেই আধুনিক চিকিৎসা। এই ধারণাগুলো বৈজ্ঞানিক নয়। চিকিৎসাগত প্রয়োজন ছাড়া কোনো অস্ত্রোপচারই ঝুঁকিমুক্ত নয়। তাই গর্ভকাল থেকেই মায়েদের এবং পরিবারের সদস্যদের যথাযথ স্বাস্থ্যশিক্ষা দিতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ বোঝা, প্রশ্ন করা এবং অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় মতামত নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। স্বাস্থ্যব্যবস্থা তখনই পরিবর্তিত হবে, যখন চিকিৎসক, হাসপাতাল, সরকার এবং সাধারণ মানুষ সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হবে। কারণ মাতৃত্ব কোনো বাণিজ্যিক পণ্য নয়; এটি একটি মানবিক এবং সামাজিক দায়িত্ব।
চিকিৎসকের নৈতিকতা: পেশার মর্যাদা নাকি পেশার বাণিজ্য? @চিকিৎসক সমাজের প্রতি মানুষের আস্থা অন্য যেকোনো পেশার তুলনায় অনেক বেশি। একজন রোগী যখন হাসপাতালের দরজায় দাঁড়ান, তখন তিনি তাঁর জীবন, বিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎ একজন চিকিৎসকের হাতে তুলে দেন। সেই বিশ্বাসের প্রতিদান হওয়া উচিত বৈজ্ঞানিক, মানবিক ও নৈতিক চিকিৎসা। কিন্তু যখন চিকিৎসাবিজ্ঞানের সিদ্ধান্তের সঙ্গে আর্থিক স্বার্থ, সময়ের সুবিধা কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক চাপ যুক্ত হয়ে যায়, তখন চিকিৎসার নৈতিক ভিত্তিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে বাংলাদেশের অসংখ্য চিকিৎসক নিষ্ঠা, সততা ও পেশাগত দক্ষতার সঙ্গে প্রতিদিন হাজারো মা ও নবজাতকের জীবন রক্ষা করছেন। তাঁদের অবদান জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য, কিছু অসাধু চিকিৎসক ও কিছু বাণিজ্যিক স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানের কারণে পুরো চিকিৎসক সমাজকে সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে। একজনের অনৈতিক আচরণ হাজারো সৎ চিকিৎসকের সম্মানকে ম্লান করে দেয়। চিকিৎসকের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর জ্ঞান নয়, তাঁর বিবেক। রোগীর প্রয়োজন না থাকলে সিজারিয়ান করার সিদ্ধান্ত কোনো চিকিৎসাগত সাফল্য নয়; বরং পেশাগত নৈতিকতার পরাজয়। চিকিৎসক যদি রোগীর সর্বোত্তম স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেন, তবে স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। তাই চিকিৎসা পেশাকে আবারও মানবিকতার মূল দর্শনে ফিরিয়ে আনাই আজকের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
হারিয়ে যাচ্ছে ধাত্রীবিদ্যা, সংকুচিত হচ্ছে স্বাভাবিক প্রসবের সংস্কৃতি। একটি সময় ছিল, যখন প্রশিক্ষিত ধাত্রীদের তত্ত্বাবধানে অধিকাংশ স্বাভাবিক প্রসব নিরাপদভাবেই সম্পন্ন হতো। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানও বলে, জটিলতা না থাকলে স্বাভাবিক প্রসবই মা ও নবজাতকের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও উপকারী। অথচ বাস্তবে আমরা এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছি, যেখানে অনেক হাসপাতালেই স্বাভাবিক প্রসব পরিচালনার পর্যাপ্ত পরিবেশ, প্রশিক্ষিত ধাত্রী কিংবা নিবেদিত লেবার কেয়ার টিম নেই। এর ফলে প্রসবব্যথা শুরু হওয়ার কিছু সময় পরই অনেক ক্ষেত্রে সিজারিয়ানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কারণ স্বাভাবিক প্রসব পরিচালনার জন্য যে ধৈর্য, সময় এবং দক্ষতা প্রয়োজন, তা অনেক প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত। এটি শুধু অবকাঠামোর ঘাটতি নয়; এটি স্বাস্থ্যনীতি পরিকল্পনারও দুর্বলতা।
সরকারের উচিত প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ধাত্রীবিদ্যা শিক্ষার প্রসার ঘটানো, আধুনিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা এবং সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে দক্ষ মিডওয়াইফ নিয়োগ বাধ্যতামূলক করা। একজন দক্ষ ধাত্রী অনেক ক্ষেত্রেই অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান প্রতিরোধ করতে পারেন। মাতৃস্বাস্থ্য রক্ষার এই নীরব শক্তিকে অবহেলা করার সুযোগ আর নেই।
আইন নয়, কার্যকর তদারকিই হবে প্রকৃত সমাধান। বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে আইন, নীতিমালা ও নির্দেশনার অভাব নেই। অভাব রয়েছে তার কার্যকর বাস্তবায়নে। বহু হাসপাতাল ও ক্লিনিক কাগজে-কলমে নিয়ম মেনে চললেও বাস্তবে রোগীর অধিকার, সেবার মান কিংবা চিকিৎসা-নৈতিকতার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি থেকে যায়। ফলে ভালো উদ্যোগও অনেক সময় প্রত্যাশিত ফল দেয় না। প্রতিটি হাসপাতালে লেবার ইউনিট স্থাপনের নির্দেশ অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু এর সঙ্গে নিয়মিত পরিদর্শন, তথ্য সংগ্রহ, সিজারিয়ানের হার প্রকাশ, চিকিৎসার যৌক্তিকতা মূল্যায়ন এবং জবাবদিহির ব্যবস্থা না থাকলে এই উদ্যোগও কেবল প্রশাসনিক নির্দেশ হিসেবেই থেকে যাবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং পেশাজীবী সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগে একটি স্বচ্ছ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কোন হাসপাতালে কতটি প্রসব হয়েছে, তার মধ্যে কতটি স্বাভাবিক এবং কতটি সিজারিয়ান এই তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত থাকলে প্রতিযোগিতা হবে সেবার মানে, অস্ত্রোপচারের সংখ্যায় নয়। জবাবদিহি যত বাড়বে, অনিয়মের সুযোগ তত কমবে।
সচেতন পরিবারই পারে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান কমাতে। মাতৃত্ব কেবল একজন মায়ের একার বিষয় নয়; এটি একটি পরিবারের, একটি সমাজের এবং শেষ পর্যন্ত একটি রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, চিকিৎসাগত প্রয়োজনের আগেই পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তার অজুহাতে সিজারিয়ানের জন্য চাপ দেন। আবার কেউ কেউ শুভ দিন-তারিখ, পারিবারিক সুবিধা কিংবা ভয়ের কারণে স্বাভাবিক প্রসবের সুযোগই দিতে চান না। এই মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। গর্ভাবস্থার শুরু থেকেই মা ও পরিবারের সদস্যদের সঠিক স্বাস্থ্যশিক্ষা দিতে হবে। জানতে হবে স্বাভাবিক প্রসব কোনো কষ্টের প্রতীক নয়; বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি প্রকৃতির সবচেয়ে নিরাপদ প্রক্রিয়া। অবশ্যই জটিলতা দেখা দিলে সিজারিয়ান জীবনরক্ষাকারী সিদ্ধান্ত, কিন্তু সেটিকে কখনোই প্রথম পছন্দে পরিণত করা উচিত নয়। স্বাস্থ্যসচেতন সমাজ গড়ে তোলার জন্য গণমাধ্যম, চিকিৎসক, ধাত্রী, স্বাস্থ্যকর্মী এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সবার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। একটি সচেতন পরিবার অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার এড়াতে পারে, চিকিৎসকের কাছে প্রশ্ন করতে পারে এবং প্রয়োজনে দ্বিতীয় মতামত নিতে পারে। স্বাস্থ্যব্যবস্থার স্থায়ী পরিবর্তন কেবল নীতিমালায় নয়; মানুষের সচেতনতা ও অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই সম্ভব।
মাতৃত্ব কোনো ব্যবসা নয়, এটি একটি মানবিক দায়িত্ব। একটি শিশুর জন্ম যেমন একটি পরিবারের আনন্দের মুহূর্ত, তেমনি রাষ্ট্রের জন্যও এটি ভবিষ্যৎ নাগরিককে স্বাগত জানানোর ঘটনা। অথচ এই পবিত্র মুহূর্তটি যখন অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণের শিকার হয়, তখন স্বাস্থ্যসেবার মৌলিক দর্শনই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। মাতৃত্ব কখনো বাজারের পণ্য হতে পারে না; এটি একটি মানবিক, সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব। অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান কেবল একটি অস্ত্রোপচার নয়; এটি অনেক সময় একটি পরিবারের আর্থিক সংকট, মায়ের অপ্রয়োজনীয় শারীরিক কষ্ট এবং ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রসবসেবা এমন হওয়া উচিত, যেখানে চিকিৎসার ধরন নির্ধারিত হবে মায়ের শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে, হাসপাতালের আর্থিক হিসাবের ভিত্তিতে নয়। আজ সময় এসেছে স্বাস্থ্যখাতে সেই মানবিক দর্শনকে ফিরিয়ে আনার। চিকিৎসক, হাসপাতাল ও সরকার সবার মনে রাখতে হবে, একজন মা কোনো ‘কেস’ নন; তিনি একজন মানুষ। তাঁর নিরাপত্তা, সম্মান ও সুস্থতাই চিকিৎসার প্রথম শর্ত।
সিজারিয়ান নয়, নিরাপদ মাতৃত্বই হোক সাফল্যের মানদণ্ড। অনেক হাসপাতাল নিজেদের আধুনিকতার পরিচয় দিতে প্রযুক্তি, অবকাঠামো কিংবা অস্ত্রোপচারের সক্ষমতার কথা তুলে ধরে। কিন্তু একটি হাসপাতালের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হওয়া উচিত কতটি সফল ও নিরাপদ স্বাভাবিক প্রসব নিশ্চিত করা গেছে, কতজন মা ও নবজাতক সুস্থভাবে বাড়ি ফিরেছেন তার মাধ্যমে। স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূল্যায়নের সূচকও পরিবর্তন করতে হবে। কেবল অস্ত্রোপচারের সংখ্যা বা আয় নয়; মাতৃমৃত্যু, নবজাতকের স্বাস্থ্য, স্বাভাবিক প্রসবের হার এবং রোগীর সন্তুষ্টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। হাসপাতালগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা হোক সেবার মানে, অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারে নয়। সরকার চাইলে জাতীয় পর্যায়ে এমন একটি মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করতে পারে, যেখানে ভালো মাতৃস্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকারী হাসপাতালকে বিশেষ স্বীকৃতি দেওয়া হবে। এতে স্বাস্থ্যসেবার গুণগত মান বাড়বে এবং অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ানের প্রবণতাও কমবে। স্বাস্থ্যনীতি সফল হবে তখনই, যখন জবাবদিহি নিশ্চিত হবে। নীতি প্রণয়ন তুলনামূলক সহজ; কঠিন হলো তার সৎ ও ধারাবাহিক বাস্তবায়ন। স্বাস্থ্যখাতে অতীতে অনেক ভালো উদ্যোগ নেওয়া হলেও দুর্বল তদারকি ও জবাবদিহির অভাবে সেগুলোর সুফল পুরোপুরি পাওয়া যায়নি।
প্রতিটি হাসপাতালের সিজারিয়ানের হার নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে। চিকিৎসাগত কারণ ছাড়া অতিরিক্ত অস্ত্রোপচার হলে তার ব্যাখ্যা চাইতে হবে। একই সঙ্গে যেসব হাসপাতাল নিরাপদ স্বাভাবিক প্রসব নিশ্চিত করছে, তাদের উৎসাহিত করতে হবে। শাস্তি ও প্রণোদনা দুই ব্যবস্থাই সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে।জবাবদিহি শুধু হাসপাতালের নয়; নিয়ন্ত্রক সংস্থারও। যারা তদারকি করবে, তাদের কাজও মূল্যায়নের আওতায় আনতে হবে। কারণ জবাবদিহি একমুখী হলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসে না; এটি হতে হয় সর্বস্তরে। একটি সচেতন সমাজই পারে এই প্রবণতা বদলে দিতে।
কোনো স্বাস্থ্যনীতি একা সরকার বাস্তবায়ন করতে পারে না। জনগণের সচেতন অংশগ্রহণ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন অসম্ভব। গর্ভধারণের শুরু থেকেই মা ও পরিবারের সদস্যদের সঠিক তথ্য দিতে হবে। জানতে হবে কখন স্বাভাবিক প্রসব নিরাপদ, কখন সিজারিয়ান অপরিহার্য এবং কখন অপ্রয়োজনীয়।
গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন এবং চিকিৎসক সমাজকে একযোগে জনসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক প্রচার বাড়াতে হবে। কারণ ভয়, গুজব ও ভুল ধারণা অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা সিদ্ধান্তকে উৎসাহিত করে। যখন মানুষ সচেতন হবে, তখন তারা প্রশ্ন করবে, যুক্তি চাইবে এবং প্রয়োজনে দ্বিতীয় মতামত নেবে। সেই সচেতনতাই স্বাস্থ্যখাতে ইতিবাচক পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শক্তি।
১৩. এখনই সময় স্বাভাবিক প্রসবকে তার প্রাপ্য মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর প্রতিটি হাসপাতালে লেবার ইউনিট বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী। তবে এটি যেন কেবল একটি প্রশাসনিক নির্দেশে সীমাবদ্ধ না থাকে। এর সঙ্গে যুক্ত হতে হবে অবকাঠামো উন্নয়ন, দক্ষ জনবল, আধুনিক প্রশিক্ষণ, কঠোর তদারকি এবং সর্বোপরি নৈতিক চিকিৎসা সংস্কৃতি। আজ যে শিশু জন্ম নিচ্ছে, সে আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়বে। তার পৃথিবীতে আগমনের প্রথম মুহূর্তটি যেন অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা-বাণিজ্যের শিকার না হয়। স্বাভাবিক প্রসবকে উৎসাহিত করা মানে সিজারিয়ানের বিরোধিতা করা নয়; বরং যেখানে সত্যিই প্রয়োজন, সেখানেই অস্ত্রোপচারকে সীমাবদ্ধ রাখা। এই পরিবর্তন যদি আমরা এখনই শুরু করতে পারি, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য স্মরণ করবে, যেখানে চিকিৎসার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মানুষ মুনাফা নয়।
উপসংহার: একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় তার সুউচ্চ ভবন, আধুনিক যন্ত্রপাতি কিংবা ব্যয়বহুল হাসপাতাল দিয়ে নির্ধারিত হয় না; নির্ধারিত হয় সেই রাষ্ট্র কতটা নিরাপদ ও সম্মানজনক মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে পারে তার মাধ্যমে। অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ানের লাগাম টানতে লেবার ইউনিট বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত একটি সাহসী ও ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু এই উদ্যোগের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে তার বাস্তবায়নের ওপর। এখন প্রয়োজন চিকিৎসকের পেশাগত সততা, হাসপাতালের সামাজিক দায়বদ্ধতা, সরকারের কঠোর তদারকি এবং জনগণের সচেতন অংশগ্রহণ। মনে রাখতে হবে, স্বাভাবিক প্রসব কোনো পশ্চাৎপদ পদ্ধতি নয়; বরং চিকিৎসাবিজ্ঞানের স্বীকৃত ও নিরাপদ প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। সিজারিয়ান জীবন রক্ষার জন্য জীবনকে অকারণে অস্ত্রোপচারের ওপর নির্ভরশীল করে তোলার জন্য নয়।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই মুহূর্তে যদি আমরা মানবিকতা, বিজ্ঞান এবং জবাবদিহিকে সমান গুরুত্ব দিয়ে এগোতে পারি, তবে কেবল সিজারিয়ানের হারই কমবে না; স্বাস্থ্যসেবার প্রতি মানুষের আস্থা, মাতৃত্বের মর্যাদা এবং চিকিৎসা পেশার সম্মানও নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। সেটিই হবে একটি সুস্থ, দায়িত্বশীল ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের সত্যিকারের পরিচয়।
মীর আব্দুল আলীম
সাংবাদিক, কলামিস্ট।
চেয়ারম্যান- আল-রাফি হাসপাতাল লি.
আজকালের খবর/বিএস