বঙ্গোপসাগরে অবৈধ ট্রলিং, নিষিদ্ধ জাল এবং আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহারের কারণে সমুদ্রের মৎস্যসম্পদ দিন দিন ধংস হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন মহিপুর উপকূলীয় অঞ্চলের সাধারণ জেলেরা।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সকালে মহিপুর প্রেসক্লাবের হলরুমে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ধ্বংসাত্মক অবৈধ ট্রলিং বন্ধে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন জেলে মো. বেলাল মাঝি। তিনি অভিযোগ করে বলেন, গভীর সমুদ্রে বটম ট্রলিংয়ের মাধ্যমে সমুদ্রের তলদেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে প্রবাল, সামুদ্রিক ঘাস ও বিভিন্ন জলজ প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে। একইসঙ্গে ফিশ ফাইন্ডার, জিপিএস ও রাডারের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাছের ঝাঁক শনাক্ত করে নির্বিচারে মাছ শিকার করা হচ্ছে। এছাড়া বেহুন্দি জালসহ ছোট ফাঁসের নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারের ফলে ডিমওয়ালা ও পোনা মাছ নিধন হচ্ছে। যা ভবিষ্যৎ মৎস্য উৎপাদনের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অবৈধ ট্রলিং বোটগুলো প্রায়ই সাধারণ জেলেদের জাল কেটে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এসব ঘটনায় অনেক সময় প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়ে সহযোগিতা পাননি তারা। প্রশাসনের কিছু অসাধু ব্যক্তিকে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে নীরব থাকতে দেখা যায় বলেও দাবি করেন তিনি।
এ সময় আরেক জেলে হানিফ মাঝি বলেন, আগে অল্প সময় সমুদ্রে গেলেই পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া যেত, কিন্তু বর্তমানে দিনের পর দিন সাগরে অবস্থান করেও কাঙ্ক্ষিত মাছ মিলছে না। অবৈধ ট্রলিংয়ের কারণে মাছের প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস হওয়ায় সাধারণ জেলেরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। দ্রুত অবৈধ ট্রলিং বন্ধ না হলে উপকূলীয় হাজারো জেলে পরিবার চরম সংকটে পড়বে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, মহিপুর-আলীপুরসহ উপকূলীয় মৎস্য বন্দরে আগের মতো কর্মচাঞ্চল্য নেই। দীর্ঘ সময় সমুদ্রে অবস্থান করেও জেলেরা পর্যাপ্ত মাছ পাচ্ছেন না। ফলে হাজারো জেলে পরিবার অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। জেলে পরিবারগুলো ভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে শোধ করতে না পাড়ায় মামলা ও ঘরের আসবাবপত্র তুলে নেয়ার হুমকি পাচ্ছেন। অনেক জেলে সমুদ্রে মাছ না পেয়ে পেশা পরিবর্তন করে কাজের সন্ধানে ঢাকায় পারি জমিয়েছেন। অনেক অর্থের অভাবে খাদ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষার অভাবে ভুগছেন।
অন্যদিকে প্রভাবশালী কিছু ট্রলিং মালিক ও অসাধু চক্র স্থানীয় ভাবে রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় আইনের তোয়াক্কা না করে অবৈধ ট্রলিং চালিয়ে রাতারাতি কোটি পতি বনে যাচ্ছেন।
সংবাদ সম্মেলন থেকে অবৈধ ট্রলিং বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ, গভীর সমুদ্রে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা, নিষিদ্ধ জাল জব্দ, দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা ও কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণের দাবি জানানো হয়।
জেলেদের মতে, দেশের প্রাণিজ আমিষের একটি বড় অংশ সামুদ্রিক মাছ থেকে আসে। তাই মৎস্যসম্পদ রক্ষা করা না গেলে শুধু জেলেদের জীবন-জীবিকাই নয়, দেশের সুনীল অর্থনীতিও মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বঙ্গোপসাগরের সম্পদ সংরক্ষণে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান অন্যথায় প্রশাসনের বিরুদ্ধে মহিপুর উপকূলীয় অঞ্চলের জেলেদের নিয়ে বৃহত্তর কর্মসূচি পালনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
এবিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা সিনিয়র কর্মকর্তা অপু সাহ্ আজকালের খবরকে জানান ট্রলিং বন্ধে মৎস্য আইন সংশোধন করা প্রয়োজন । এ পর্যন্ত আমরা কলাপাড়া উপজেলায় ট্রলিংয়ের বিরুদ্ধে ১৭টি মামলা দায়ের করেছি, কিন্তু তারা ৭-১০ দিনের মধ্যে জামিন নিয়ে পূর্ন রায় সমুদ্রে মাছ শিকারে চলে যায়। তা ছাড়া জনবল ও অর্থসংকট থাকার কারনে সঠিক সময় অভিযান পরিচালনা করা যাচ্ছে না।
আমরা মোবাইল কোর্ট আইনের আওতায় অভিযান পরিচালনা করতে পারলে ট্রলিংয়ের বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেত।
আজকালের খবর/রাশেদুল মিলন